দেবকিশোর চক্রবর্তী
দক্ষিণ কলকাতার নাকতলা, রামগড় এবং বাঘাযতীন এলাকার সরু গলিতে প্রায়শই এক ভবঘুরে যুবককে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। এলোমেলো চুল, লম্বা দাড়ি ও ময়লা পোশাকে ঢাকা সেই যুবককে দেখলে স্বাভাবিকভাবেই পথচারীরা এড়িয়ে চলেন। এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দার কাছে তিনি পরিচিত শুধুমাত্র একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ হিসেবেই। অথচ তাঁর নেপথ্যে যে এক করুণ ও বিস্ময়কর জীবনকাহিনি লুকিয়ে রয়েছে, তা প্রকাশ্যে আসতেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের অনেকেই লক্ষ্য করেছেন, কখনও যদি কেউ ওই যুবককে একটি ডায়েরি বা নোটবুক ও কলম দেন, তখন তাঁর মুখে অদ্ভুত এক আনন্দের ছাপ ফুটে ওঠে। সারাদিন ধরে তিনি সেই নোটবুকের পাতায় একের পর এক ওষুধের নাম লিখে যান। কেউ যদি কোনও অসুস্থতার কথা জানতে চান, সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিভিন্ন ট্যাবলেট, ইনজেকশন ও চিকিৎসা পদ্ধতির নাম লিখতে শুরু করেন।
আশ্চর্যের বিষয়, প্রতিটি পৃষ্ঠার শেষে তিনি নিজের ডিগ্রি এবং একটি রেজিস্ট্রেশন নম্বর লিখে দিতেও ভোলেন না। এই দৃশ্য দেখে বহু মানুষই অবাক হয়েছেন, একজন তথাকথিত মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি কীভাবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এমন বিস্তৃত জ্ঞান রাখেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই পৌঁছে যাই ওই যুবকের পাড়ায়। খোঁজখবর নিতেই সামনে আসে এক মর্মান্তিক সত্য। আজ যাঁকে নাকতলার গলিতে ভবঘুরে হিসেবে দেখা যায়, তিনি দুই দশক আগে ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক। তাঁর নাম ডাঃ সৌরভ ঘোষ। ২০০৩ সালের আশেপাশে তিনি কলকাতার বিখ্যাত নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।
শৈশব থেকেই সৌরভ ঘোষ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। মধ্যবিত্ত পরিবারের সৎ, ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের ছেলে হিসেবে পাড়ায় তাঁর যথেষ্ট সম্মান ছিল। তাঁর বাবা রেলে চাকরি করতেন এবং পাশাপাশি প্রাইভেট টিউটরও ছিলেন। পরিবারে মা-বাবার সঙ্গে ছিলেন তাঁর এক দিদি ও এক ছোট ভাই। তিন ভাইবোনই পড়াশোনায় ভালো ছিলেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতেন।
কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ধীরে ধীরে তিন ভাইবোনের মধ্যেই মানসিক সমস্যার লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। সৌরভের দিদি সাথী ঘোষও মেডিকেল নিয়ে পড়াশোনা করেন। তবে পরবর্তীকালে গুরুতর মানসিক অসুস্থতা তাঁর জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর কয়েক বছর আগে তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় সৌরভ মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন।
ডাঃ সৌরভ ঘোষ
পরিবারে একের পর এক মানসিক বিপর্যয়, চিকিৎসার অভাব এবং সামাজিক অবহেলা, সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে সৌরভ নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসক হয়েও নিজের চিকিৎসা আর হয়ে ওঠেনি। একসময় পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি রাস্তায় চলে আসেন। সেই থেকেই নাকতলা ও সংলগ্ন এলাকাই হয়ে ওঠে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা।
আজও ডাঃ সৌরভ ঘোষ যখন নোটবুকের পাতায় ওষুধের নাম লেখেন, তখন যেন ফিরে যান তাঁর অতীত জীবনে, যেখানে তিনি ছিলেন সাদা অ্যাপ্রন পরা একজন চিকিৎসক, মানুষের ভরসা। এই গল্প শুধু একজন মানুষের পতনের নয়, এটি আমাদের সমাজেরও ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। মানসিক অসুস্থতাকে আমরা এখনও ভয়, লজ্জা ও অবহেলার চোখে দেখি। অথচ একটু সহানুভূতি, সময়মতো চিকিৎসা আর মানবিক স্পর্শ হয়তো ডাঃ সৌরভ ঘোষের মতো বহু মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরিয়ে আনতে পারত।
নাকতলার সেই সরু গলিতে আজও তিনি হাঁটেন। হাতে যদি একটি নোটবুক থাকে, তবে তাঁর চোখে ভেসে ওঠে হারিয়ে যাওয়া পরিচয়, একজন চিকিৎসক, যিনি এখনও নিজের সত্তা ভুলে যাননি।