মন্দিরের আঙিনায় রোজা, মানবতার আসল ‘কেরালা স্টোরি’

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 8 d ago
মুসলিম মাহুত পাপ্পান সাইনুদ্দিন
মুসলিম মাহুত পাপ্পান সাইনুদ্দিন
 
মালিক আসগর হাশমি / নয়াদিল্লি

সংবাদশিরোনাম যেখানে প্রায়ই শব্দের ঝড়, বিভাজন আর অবিশ্বাসে ভরা থাকে, সেখানে দক্ষিণ ভারতের একটি মন্দিরের নিঃশব্দ মুহূর্ত যেন কোনও স্লোগানের চেয়েও জোরালো বার্তা দিয়েছে। কেরালার একটি সাধারণ দৃশ্য দেশজুড়ে হৃদয় ছুঁয়েছে, স্মরণ করিয়েছে, সহমর্মিতা এখনও প্রতিদিনের আচরণের মধ্যেই বেঁচে আছে।
 
এটি কোনও বক্তৃতার গল্প নয়, কোনও উপদেশের নয়; এটি মাত্র একটি মুহূর্তের গল্প- যা সোশ্যাল মিডিয়ায় লক্ষাধিক মানুষের মন জয় করেছে। ঘটনাটি ঘটেছে ত্রিশূরের পুথুকাভু দেবী মন্দিরে, যেখানে বিশ্বাস আর মানবতা মিলেছিল এক হাতির ছায়াতলে। অনেকে এটিকেই এখন বলছেন “দ্য রিয়েল কেরালা স্টোরি।”
 
মুসলিম মাহুত পাপ্পান সাইনুদ্দিন
 
কেরালার উৎসব মানেই আড়ম্বর, ছন্দ, আর দুর্দান্ত হাতির শোভাযাত্রা। পুথুকাভু দেবী মন্দিরেও ছিল তেমনই উৎসবের আবহ, ঢাক-ঢোলের তালে তালে চলছিল ঐতিহ্যবাহী হাতি প্রদর্শন। সন্ধ্যা নামতেই মুসলিম মাহুত পাপ্পান সাইনুদ্দিনকে পালন করতে হলো তার ধর্মীয় দায়িত্ব। পবিত্র রমজান মাসে রোজা রেখে তিনি মন্দিরে দায়িত্বে ছিলেন, ফলে বাইরে যাওয়ার উপায় ছিল না। তাই তিনি নীরবে হাতির পায়ের কাছে বসে রোজা ভাঙতে শুরু করলেন।
 
সাইনুদ্দিন নিশ্চয়ই চেয়েছিলেন চুপচাপ, কোনও প্রকাশ্য নজর ছাড়াই ইফতার সারতে। কিন্তু মন্দির কমিটির সদস্যরা বিষয়টি দেখে মুহূর্তটি অন্যরকম দিকে মোড় নেয়। তারা শুধু রোজা ভাঙার অনুমতি দেননি, বরং তাকে খাবার ও ফলের ব্যবস্থাও করে দেন। একটি হিন্দু মন্দিরের উৎসবমুখর পরিবেশে, মন্দিরের দেওয়া খাবারে এক মুসলিম মাহুত ইফতার করছেন, এই দৃশ্যটি শুধু একটি সৌজন্য নয়, বরং সেই ভারতবর্ষের প্রতিচ্ছবি, যাকে মানুষ হৃদয়ে লালন করে।
 
ইনস্টাগ্রামের "গিভ ইন্ডিয়া" (Give India) হ্যান্ডল থেকে শেয়ার হওয়া ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়, একদিনের মধ্যেই এক লক্ষের বেশি লাইক। সম্মানিত মালয়ালম দৈনিক "মাতৃভূমি" (Mathrubhumi)–ও ঘটনাটিকে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করে। ভিডিওটির ক্যাপশন বলেছিল, “যেখানে বিভেদের কথা বেশি শোনা যায়, সেখানে এই মুহূর্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের একত্রে রাখার শক্তি এখনও বেঁচে আছে।”
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় উষ্ণ মন্তব্যের স্রোত দেখা যায়। এক্স-এ (আগের টুইটার) মনজার নামে একজন লিখেছেন, “মন্দিরের ছায়ায় যখন রোজা ভাঙা হয়, তখন দেশ প্রকৃত ঐক্যের অর্থ দেখে। এটি শুধু ইফতার নয়, এটি মানবতার সবচেয়ে সুন্দর রূপ।”
 
অনেকেই রাজনীতির দৃষ্টিতে নয়, মানবতার দৃষ্টিতে ঘটনা দেখেছেন। অনিল কুমার নামে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “এটি কোনও মুসলিমের গল্প নয়, এটি এক মালয়ালির গল্প।” আরেকটি মন্তব্য আরও গভীর ছিল, “মন্দির কমিটি একজন মুসলিম মাহুতের জন্য খাবারের বন্দোবস্ত করেছে। কারও কাছে এটি অবাক লাগতে পারে, কিন্তু আমাদের কাছে নয়। আমরা বড় হয়েছি এমন পরিবেশে, যেখানে আজানের ধ্বনি শোনা যায় মন্দিরের প্রদীপ জ্বলার সময়। এটাই আসল কেরালা স্টোরি।”
 
অনেকেই মন্তব্য করেছেন, এই ভিডিও যেন কেরালাকে নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করা চলচ্চিত্র ও গল্পের প্রতি নীরব জবাব। বহুজন লিখেছেন, “দ্য রিয়েল কেরালা স্টোরি।” কেউ বলেছেন, “মানবতার প্রকৃত অর্থ দেখাল কেরালা,” আবার কেউ বলেছে, “এটাই ঈশ্বরের নিজের দেশ হওয়ার প্রমাণ।”
 
প্রশংসা থ্রিশূর বা কেরালার মধ্যেই থেমে থাকেনি, সারা দেশ থেকে এসেছে। নেহা সাক্সেনা, শোভা বিষ্ণুনাথের মতো জনমান্য ব্যক্তিরাও এর প্রশংসা করেছেন। অনেকেই জানিয়েছেন, এই মুহূর্তটিকে বিশেষ করেছে একটাই বিষয়: এখানে কোনও প্রচার নেই, কোনও প্রদর্শন নেই। মন্দির কমিটির এই আচরণ ছিল তাদের স্বাভাবিক মানবিকতা, ক্যামেরার জন্য নয়।
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

A post shared by Give (@give_india)

 
ধর্ম নিয়ে দেশে যত বিতর্কই হোক, পুথুকাভু দেবী মন্দিরের এই দৃশ্য দেখায়, মাটির কাছের মানুষ এখনও একে অপরের বিশ্বাসকে সম্মান করে চলে। মাহুত পাপ্পান সাইনুদ্দিনের কাছে এটি হয়তো দায়িত্বের আরেকটি দিন মাত্র। কিন্তু মন্দির কমিটির একটি ছোট মানবিক পদক্ষেপ লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে আশার আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে।
 
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটির লাইক পৌঁছে গেছে ১.৭৫ লক্ষের কাছাকাছি, আর হাজার হাজার মানুষ নিজেদের অনুভূতি জানিয়েছেন। কারও কাছে এটি দক্ষিণ ভারতের সংস্কৃতির সারাংশ, কারও কাছে পরিবর্তনশীল ভারতের আশা। হয়তো সত্যিটা লুকিয়ে আছে এই সরল ভাবনায়: যখন মন্দিরের পুরোহিত আর মসজিদের আজানধ্বনিতে বড় হওয়া মানুষ একে অপরকে সম্মান করে দাঁড়ায়, তখনই তিরঙ্গার মর্যাদা রক্ষা পায়।
 
এই ভিডিও যেন আয়না তাদের জন্য, যারা ধর্মের বিভেদ নিয়ে মতবিরোধ বাড়াতে চান। ত্রিশূরের সেই মন্দির দেখিয়ে দিয়েছে, পুজোর ধরন আলাদা হলেও মানবতার ভাষা একই। সাইনুদ্দিনের রোজা আর মন্দিরের খাবার, এই মিলনবিন্দুই ভারতকে সবচেয়ে সুন্দর করে তোলে। জয় হিন্দ।