শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
রাজ্যের যুব সমাজের মধ্যে ‘যুব সাথী’ প্রকল্প ঘিরে আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সি যুবক-যুবতীদের আর্থিক সহায়তা ও স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শাসকদলের বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ভাবনায় গড়ে ওঠা এই প্রকল্প তরুণ প্রজন্মের বাস্তব প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়েই তৈরি। পশ্চিমবঙ্গ-এর বিভিন্ন জেলা, পৌরসভা ও পঞ্চায়েত এলাকায় ইতিমধ্যেই আবেদনকারীদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিশেষ করে ২১ বছর বয়সে পৌঁছনো তরুণ-তরুণীদের কাছে এই প্রকল্প নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। এই সময়ে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী স্নাতক স্তর শেষ করে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা, পেশাদার কোর্স বা বিশেষ দক্ষতা অর্জনের পথে এগিয়ে যান। কিন্তু উচ্চশিক্ষার খরচ—ভর্তি ফি, সেমেস্টার ফি, বইপত্র, প্রজেক্ট, অনলাইন কোর্স, যাতায়াত—সব মিলিয়ে আর্থিক চাপ অনেক পরিবারের পক্ষেই সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কলকাতার ২১ বছর বয়সি এক স্নাতক ছাত্রী বলেন,“আমার ইচ্ছে এমএ পড়ার। কিন্তু বাড়িতে বাবা একাই রোজগার করেন। সব খরচ বহন করা ওনার পক্ষে কঠিন। যদি এই প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা পাই, তাহলে অন্তত পড়াশোনার খরচের একটা অংশ নিজেই বহন করতে পারব। এতে নিজের ওপর ভরসাও বাড়বে।”বাঁকুড়ার এক ছাত্র জানান,“পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের পাশাপাশি কম্পিউটার কোর্স করতে চাই। কোর্স ফি জোগাড় করাই বড় সমস্যা। এই প্রকল্পের টাকা পেলে সেই সুযোগটা তৈরি হতে পারে।”
শিক্ষাবিদদের মতে, ২১ বছর এমন একটি বয়স যখন একজন তরুণ বা তরুণী ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন। আর্থিক সহায়তা থাকলে উচ্চশিক্ষায় ঝরে পড়ার প্রবণতা কমতে পারে। এক অধ্যাপক বলেন,“ছাত্রছাত্রীরা যখন বুঝতে পারে যে তাদের পাশে একটি সরকারি সহায়তা রয়েছে, তখন তারা আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরিকল্পনা করতে পারে। স্বাবলম্বিতা মানসিক দৃঢ়তাও বাড়ায়।”
অন্যদিকে, গ্রাজুয়েশন শেষ করে যারা বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক চাকরির পরীক্ষার জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের কাছেও এই প্রকল্প বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি চাকরির পরীক্ষার জন্য আলাদা ফি, কোচিং খরচ, মক টেস্ট সিরিজ, অনলাইন সাবস্ক্রিপশন এবং যাতায়াতের ব্যয় রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হয়।
হাওড়ার এক স্নাতক যুবক বলেন,“চাকরির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে বুঝেছি খরচ কতটা বেশি। ফর্ম ফিল-আপ, বই, কোচিং—সব মিলিয়ে বড় অঙ্কের টাকা লাগে। যদি এই প্রকল্প থেকে আর্থিক সহায়তা পাই, তাহলে অন্তত পরীক্ষার ফি আর পড়ার খরচটা নিজেই সামলাতে পারব।”
মালদার এক চাকরিপ্রার্থী তরুণীর কথায়,“বছরে একাধিক পরীক্ষার ফর্ম ভরতে হয়। প্রতিটা ফি বাড়ির কাছে চাইতে খারাপ লাগে। নিজের নামে যদি কিছু আর্থিক সহায়তা আসে, তাহলে প্রস্তুতিতে আরও মন দিতে পারব।”কোচিং সেন্টারের এক শিক্ষক জানান,“অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রী শুধুমাত্র অর্থের অভাবে নিয়মিত মক টেস্ট বা বিশেষ ক্লাসে অংশ নিতে পারে না। সামান্য আর্থিক সাপোর্টও তাদের ধারাবাহিক প্রস্তুতিতে বড় ভূমিকা নিতে পারে।”
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যুব সমাজে সরাসরি আর্থিক বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সের মধ্যে যখন শিক্ষাজীবন থেকে কর্মজীবনের দিকে উত্তরণ ঘটে, তখন এই ধরনের সহায়তা আত্মনির্ভরতার বোধ জাগিয়ে তোলে। তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশ বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক বণ্টন এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, ‘যুব সাথী’ প্রকল্প ঘিরে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা যথেষ্ট উঁচুতে। উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যাওয়া হোক বা চাকরির পরীক্ষার কঠিন প্রস্তুতির পথ—আর্থিক সহায়তা যদি কার্যকরভাবে পৌঁছায়, তাহলে বহু যুবক-যুবতীর সংগ্রাম কিছুটা হলেও সহজ হতে পারে।