আওয়াজ-দ্য-ভয়েস, অসম ব্যুরো
যে সময়ে সমাজে ঘৃণা ও উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, ঠিক সেই সময়েই কিছু মানুষ মানবতা, সহানুভূতি ও সাহসের নীরব ভাষায় সবার হৃদয় জয় করে নিচ্ছেন। তেমনই একজন মানুষ হলেন দীপক কুমার, যিনি স্বীকৃতির চেয়ে মানবতাকেই বেছে নিয়ে আজ দেশজুড়ে প্রশংসার পাত্র হয়ে উঠেছেন।
সম্প্রতি তিনি ৭০ বছর বয়সি এক দোকানদারকে আক্রমণ করতে আসা একদল দুষ্কৃতীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। ওই দুষ্কৃতীরা দোকানদারকে তার দোকানের নাম পরিবর্তন করতে চাপ দিচ্ছিল।
এই ঘটনা জাতীয় স্তরে আলোচনায় আসার পর ঝাড়খণ্ডের স্বাস্থ্যমন্ত্রী দীপকের সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে ২ লক্ষ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেন। কিন্তু দীপক বিনীতভাবে সেই অর্থ গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন।
দীপক বলেন, “২ লক্ষ টাকা একটি বড় অঙ্ক। তাই যদি মাননীয় মন্ত্রী এই অর্থ কোনও বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি বা অন্য কোনও অসহায় মানুষের জন্য ব্যবহার করেন, তাহলে সেটাই হবে সত্যিকারের প্রশংসনীয় কাজ। যাঁদের সত্যিই এই অর্থের প্রয়োজন, তাঁদেরই এই টাকা দেওয়া হোক।”
যে সময়ে সহানুভূতির চেয়ে ক্ষোভ, হিংসা ও বিদ্বেষ বেশি ছড়িয়ে পড়ে, সেই সময়ে একজন মানুষ সম্মান, সহমর্মিতা ও শান্ত সাহসের পথ বেছে নেন—আর সেই সিদ্ধান্তই আজ লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।
উল্লেখ্য, কিছুদিন আগে উত্তরাখণ্ডের স্থানীয় কয়েকজন যুবক কোটদ্বারের বাজারে একটি দোকানের মুসলিম মালিককে হেনস্থা করতে শুরু করলে দীপক সেখানে হস্তক্ষেপ করেন। দোকানটির নামের মধ্যে ‘বাবা’ শব্দটি ব্যবহারের কারণেই এই বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। দোকানদার ও তাঁর ছেলে যখন ওই আক্রমণাত্মক যুবকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই দীপক কথোপকথনের মধ্যে হস্তক্ষেপ করেন।
যখন ওই দলটি দীপককে প্রশ্ন করে—তিনি কেন দোকানদারকে রক্ষা করতে এসেছেন এবং তিনি কে—তখন দীপক শান্তভাবে উত্তর দেন, “আমার নাম দীপক মহম্মদ।” এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। এক্স (আগের টুইটার)-এ ভিডিওটি পোস্ট হওয়ার পর হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ দীপকের সাহস এবং তাঁর ভারতীয় পরিচয়ের প্রতি দৃঢ় অবস্থানের জন্য প্রশংসা করেন।
এই আবেগঘন ঘটনাটি ঘটে ‘বাবা স্কুল ড্রেস অ্যান্ড ম্যাচিং সেন্টার’-এ, যা বহু দশক ধরে চলে আসা একটি ছোট দোকান। উত্তরাখণ্ডের কোটদ্বারে শোয়েব আহমেদের পরিবার এই দোকানটি পরিচালনা করে আসছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ডানপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত একটি দল দোকানের নামে ‘বাবা’ শব্দ ব্যবহারের বিরোধিতা করে দোকানটিতে হামলা চালায়। তারা প্রশ্ন তোলে—মুসলিম সম্প্রদায়ের কোনও দোকান কি এই শব্দটি ব্যবহার করতে পারে?
দীপকের হস্তক্ষেপ স্থানীয় বাসিন্দাদের উৎসাহিত করে, যাদের অনেকেই আহমেদ পরিবারকে বহু বছর ধরে চেনে। যদিও পরিস্থিতি কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, তবুও ধর্মীয় পরিচয়ের বদলে দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোয় পরিবেশ বদলে যায়। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং কোনও ধরনের হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেনি।
কথা দিয়ে আৰম্ভ হোৱা তর্কটি দ্রুতই দোকানির বৃদ্ধ পিতা ওয়েকেল আহমেদের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। তাঁর কাছে দোকানের নাম এবং সেই নাম ব্যবহারের অধিকার—দু’টোরই যুক্তি দিতে বলা হয়। কথার সুর আরও চড়া হতে থাকে, ভিড়ও বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে যেকোনো মুহূর্তে তা হিংসাত্মক রূপ নিতে পারত।
ঠিক সেই সময়েই স্থানীয় হিন্দু বাসিন্দা দীপক কুমার এগিয়ে আসেন। তিনি নীরব দর্শক হয়ে না থেকে ওই দলের যুক্তির বিরোধিতা করেন। তিনি তাঁদের স্মরণ করিয়ে দেন যে মুসলিমরাও ভারতের সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক। যখন তাঁর পরিচয় জানতে চাওয়া হয়, তিনি শান্তভাবে উত্তর দেন—“আমার নাম মহম্মদ দীপক।” তাঁর এই বক্তব্য সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে, যেখানে ধর্ম বা নামের ভিত্তিতেই একজন মানুষের নাগরিক পরিচয় নির্ধারণ করা হয়।
এরপর দীপক কুমার একটি ভিডিও বার্তা শেয়ার করে মানুষকে ঘৃণা পরিত্যাগ করে ঐক্যের পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ধর্মের নামে মানুষকে টার্গেট করা দেশের সামাজিক সম্প্রীতির জন্য ক্ষতিকর। তিনি সকলকে মনে করিয়ে দেন যে পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানবতাই সর্বাগ্রে স্থান পাওয়া উচিত।
যে সময় উত্তরাখণ্ডসহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধর্মীয় ভীতি ও হুমকির ঘটনা সামনে আসছে, সেই সময় কোটদ্বারের ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে—সংঘাতের জন্য নয়, বরং এজন্য যে এক সাধারণ নাগরিক নীরবতার বদলে সাহস, ভয়ের বদলে সহানুভূতি এবং বিভাজনের বদলে ঐক্যকে বেছে নিয়েছেন।