দলবদলের খেলায় প্রথম বড় নায়ক অরুণ ঘোষ!তাঁকে ঘিরেই ১৯৬০-এ ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের লড়াই পৌঁছেছিল অন্য মাত্রায়।

Story by  Shanti Roy Chowdhury | Posted by  Aparna Das • 6 h ago
দলবদলের খেলায় প্রথম বড় নায়ক অরুণ ঘোষ!তাঁকে ঘিরেই ১৯৬০-এ ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের লড়াই পৌঁছেছিল অন্য মাত্রায়।
দলবদলের খেলায় প্রথম বড় নায়ক অরুণ ঘোষ!তাঁকে ঘিরেই ১৯৬০-এ ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের লড়াই পৌঁছেছিল অন্য মাত্রায়।
 
শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী

বদলে গিয়েছে ভারতীয় ফুটবল। বদলে গিয়েছে কলকাতা ময়দানের ফুটবলের চরিত্রও। হারিয়ে গিয়েছে ৬০ পয়সার গ্যালারি, হারিয়ে গিয়েছে সেই উন্মাদনা, সেই দিনগুলির দলবদলের রোমাঞ্চ। কিন্তু ইতিহাস হারায়নি। ময়দানের ঘাসে, ক্লাব তাঁবুতে, চায়ের দোকানের আড্ডায় আর প্রবীণদের স্মৃতিতে আজও বেঁচে রয়েছে সেইসব অবিশ্বাস্য গল্প।
 
ষাট-সত্তরের দশকের কলকাতা ফুটবলের দলবদল মানেই ছিল অন্য এক পৃথিবী। একজন ফুটবলারকে নিয়ে দুই প্রধানের টানাটানি কখনও কখনও পৌঁছে যেত নাটকের চূড়ান্ত পর্যায়ে।সেই যুগের এমনই এক বিস্ময়কর কাহিনি শুনিয়েছেন বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক ও ধারাভাষ্যকার বিপ্লব দাশগুপ্ত।
 
অরুণ ঘোষ: ভারতীয় ফুটবলের ‘ভদ্র প্রাচীর’ তিনি কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ
 
গল্পের নায়ক, তরুণ ডিফেন্ডার অরুণ ঘোষ। আর সালটা ১৯৬০।আগে দলবদল ছিল, কিন্তু এমন যুদ্ধ ছিল না।পঞ্চাশের দশকে ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে পদ্মনাভ ভেঙ্কটেশ মোহনবাগানে গিয়েছিলেন। ধনরাজ চন্দন সিং খেলেছিলেন রাজস্থান ক্লাবে। ১৯৫৬ সালে অলিম্পিকে নজরকাড়া মিডফিল্ডার মারিয়াম্মা কেম্পিয়াও বেশি অর্থের প্রস্তাবে যোগ দিয়েছিলেন মোহনবাগানে।
 
ফুটবলার দল বদলেছেন, ক্লাব বদলেছে। কিন্তু একজন ফুটবলারকে নিয়ে দুই বড় ক্লাবের মধ্যে এমন মরিয়া লড়াই তখনও দেখা যায়নি।সেই ছবিটাই বদলে দিলেন অরুণ ঘোষ।মোহনবাগানে সুযোগের অপেক্ষায়তখন অরুণ ছিলেন মোহনবাগানের তরুণ ডিফেন্ডার। আগের মরশুমে নিয়মিত প্রথম একাদশে জায়গা হয়নি তাঁর। লিগে খেলেছিলেন মাত্র দু’টি ম্যাচ। শিল্ডের দলেও সুযোগ পাননি।
 
কিন্তু ডুরান্ড কাপে রহমান অসুস্থ হয়ে পড়ায় সুযোগ এল অরুণের সামনে।আর সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেন তিনি।সেমিফাইনালে মহমেডানকে ৫-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল মোহনবাগান। ফাইনালেও দুর্দান্ত খেললেন অরুণ। শক্তিশালী মহমেডানের বিরুদ্ধে তাঁর রক্ষণ ছিল প্রায় দুর্ভেদ্য। মোহনবাগান জিতল ৩-১ গোলে। কিন্তু অরুণের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সও তাঁকে দলে পাকাপাকি জায়গা এনে দিল না। রহমান সুস্থ হয়ে ফিরতেই রোভার্স কাপের দল থেকে বাদ পড়লেন অরুণ। তখনই বুঝলেন, রহমান থাকলে মোহনবাগানে নিয়মিত খেলার সুযোগ তাঁর নেই। আর ঠিক সেই সময়েই তাঁর দরজায় কড়া নাড়ল ইস্টবেঙ্গল।
 
মুম্বইয়ের মেরিন ড্রাইভে প্রথম কথা
 
রোভার্স কাপ চলাকালীন মুম্বইয়ের মেরিন ড্রাইভে অরুণের সঙ্গে প্রথম কথা বলেন ইস্টবেঙ্গলের কর্মকর্তা সুজন ব্যানার্জি। অরুণের শর্তও ছিল পরিষ্কার। “রহমান থাকলে আমি মোহনবাগান ছাড়ব না।” কিন্তু ইস্টবেঙ্গলেরও রহমানকে নিয়ে পরিকল্পনা ছিল। তাঁর সঙ্গে কথাবার্তাও অনেক দূর এগিয়েছিল।খবরটি অরুণের কানে পৌঁছেছিল।
 
অন্যদিকে মোহনবাগানও বুঝতে পেরেছিল, রহমানকে ধরে রাখা জরুরি। শৈলেন মান্না নিজে কেরালায় রহমানের বাড়িতে গিয়ে বকেয়া টাকা মিটিয়ে দেন, সঙ্গে দেন পরের মরশুমের অ্যাডভান্স। অর্থাৎ রহমান মোহনবাগানেই থাকছেন। কিন্তু ইস্টবেঙ্গল তখনও হাল ছাড়েনি।ওষুধের দোকানে হঠাৎ ইস্টবেঙ্গল
 
অরুণের বাড়ি শিবপুরে। অসুস্থ বাবার জন্য ওষুধ কিনতে একদিন পি. কুমার মেডিকেলে গিয়েছিলেন তিনি।হঠাৎ সেখানে হাজির ইস্টবেঙ্গলের তিন পরিচিত মুখ, মন্টু বসু, সুজন ব্যানার্জি এবং গোলরক্ষক রবিন গুহ।কথা হল। অরুণের প্রশ্ন একটাই, “রহমান কি ইস্টবেঙ্গলে আসছেন?”ইস্টবেঙ্গল কর্তারা তাঁকে আশ্বস্ত করলেন, রহমান আসছেন না।অরুণ বললেন, তাহলে সমস্যা নেই।পরক্ষণেই ইস্টবেঙ্গলের গাড়িতে উঠে বসলেন তিনি।
 
অরুণ ঘোষ: ভারতীয় ফুটবলের ‘ভদ্র প্রাচীর’ তিনি কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ
 
অসুস্থ বাবার দেখাশোনার দায়িত্ব পি. কুমারকে দিয়ে অরুণ পৌঁছে গেলেন ইস্টবেঙ্গলের ডেরা বসুশ্রীতে। যে ঘরে একসময় থাকতেন আমেদ খান। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬০, একটি ফোন, বদলে গেল কলকাতা ফুটবল।দিনটি ছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬০। সকাল ১০টা ১৫ মিনিট। আইএফএ অফিসে ফোন করলেন সুজন ব্যানার্জি। প্রশ্ন, এখনও কোনও ফুটবলার দলবদল করেছেন কি?
 
ওপার থেকে উত্তর এল, না। তবে রহমান মোহনবাগানের হয়ে সই প্রত্যাহার করেছেন। অর্থাৎ অরুণের আর কোনও বাধা নেই। আবার ফোন গেল অরুণের কাছে। আর দেরি হল না। ইস্টবেঙ্গলে সই করলেন অরুণ ঘোষ।কিন্তু সেই সইয়ের পরই শুরু হল আসল নাটক।
 
বসুশ্রীতে রাতের ‘অভিযান’
 
অরুণ ইস্টবেঙ্গলে সই করেছেন, খবর ছড়িয়ে পড়তেই মোহনবাগান শিবিরে উত্তেজনা।সন্ধ্যার পর বসুশ্রীতে হাজির মোহনবাগানের লোকজন। সঙ্গে অরুণের দুই দাদা। ছিলেন ধীরেন দে, শৈলেন মান্না, শঙ্করী ঘোষাল-সহ ক্লাবের ঘনিষ্ঠরা। তখন বসুশ্রীর নাইট শো শেষ হয়েছে। সিনেমা হল থেকে দর্শকরা বেরিয়ে আসছেন। সেই ভিড়ের মধ্যেই অরুণের দুই দাদা চিৎকার করছেন, “অরুণ, বাবা গুরুতর অসুস্থ। বেরিয়ে আয়!”কিন্তু অরুণ?তিনি তখন গভীর ঘুমে। কিছুই শুনছেন না!
 
ময়দানের ফুটবলযুদ্ধে এমন ঘটনাও যে ঘটতে পারে, সেদিন হয়তো কেউ ভাবেননি। পরিস্থিতি বুঝে ইস্টবেঙ্গল কর্মকর্তারা পিছনের দরজা দিয়ে অরুণকে বের করে আনলেন। ভৈরব গাঙ্গুলী ও রবিন গুহ তাঁকে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন। গন্তব্য, নাকতলা। ক্লাবের ডিফেন্ডার শুভাশিস ঘোষের বাড়ি।
 
ঘুম ভাঙার পর অরুণ প্রথমেই জানতে চাইলেন, “বাবা কেমন আছেন?”তাঁকে জানানো হল, বাবা ভালো আছেন। বসুশ্রীতে লোকজন এসেছিল বলেই তাঁকে সরিয়ে আনা হয়েছে। আশ্বস্ত হয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন অরুণ। তিনি যে একটু ঘুমকাতুরে ছিলেন, সেই গল্পও তখন ময়দানে বেশ পরিচিত!
 
এবার কলকাতা ছেড়ে পালানোর পালা
 
ইস্টবেঙ্গল বুঝল, অরুণকে কলকাতায় রাখা আর নিরাপদ নয়।পরিকল্পনা হল, তাঁকে জলপাইগুড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ইস্টবেঙ্গলের আজীবন সদস্য তুষার রাউথ সেখানে ছিলেন। পরদিন ভোর ৪টে। গাড়ি চালাচ্ছেন রবিন গুহ। পিছনের সিটে অরুণ ও সুজন ব্যানার্জি। বিমানবন্দরের পথে একবারই গাড়ি থামল, ভবানীপুরের জগুবাবুর বাজারের কাছে রাধুবাবুর চায়ের দোকানে। চা খেয়ে ফের রওনা। কিন্তু খবর গোপন থাকেনি।
 
বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিল মোহনবাগান
 
অরুণকে জলপাইগুড়ি পাঠানো হচ্ছে, এই খবর পৌঁছে গিয়েছে মোহনবাগান শিবিরে। তখন মোহনবাগানের তাঁবু ছিল বর্তমান এরিয়ান তাঁবুর জায়গায়। হাওড়ার ছেলে অরুণ ইস্টবেঙ্গলে চলে যাবেন, এটা মেনে নিতে পারেননি অনেক মোহনবাগান সমর্থক। সকালেই বিমানবন্দরে হাজির অরুণের দুই দাদা, মাসিওর মন্মথ রায় এবং আরও অনেকে। বিমানবন্দরের কাছে তাঁদের দেখেই সুজনরা গাড়ি ঘুরিয়ে দিলেন। যশোর রোড ধরে বারাসাত। তারপর টাকি রোড। গন্তব্য বসিরহাট।
 
জীবন্ত কিংবদন্তি ফুটবলার অরুন ঘোষ আজ শেষ দিনটা কাটাচ্ছেন এই ভাবেই
 
পিছনে মোহনবাগানের গাড়িও ছুটছে!
 
একসময় মোহনবাগানের গাড়ি ফিরে গেল। কিন্তু জেসপ গেটের কাছে গিয়ে নতুন বিপদ। সেখানে দাঁড়িয়ে অরুণের দুই দাদা এবং প্রায় ৪০-৫০ জন মোহনবাগান সমর্থক। আর এগোনো যাবে না। জেসপ গেটের আগে গ্রামোফোন কোম্পানির চত্বরে ঢুকে পড়লেন তাঁরা। সেখানে চাকরি করতেন ইস্টবেঙ্গলের ক্রিকেট সচিব জ্ঞানরঞ্জন দাশগুপ্ত।অরুণকে তাঁর হেফাজতে রেখে কলকাতায় ফিরে এলেন সুজন। কিন্তু সমস্যা মেটেনি।কলকাতায় রাখাও যাবে না। আবার জলপাইগুড়ির পথও নিরাপদ নয়।
 
শেষরক্ষা হল পাইলটদের হাত ধরে
 
বসুশ্রীতে ফিরে দুশ্চিন্তায় বসে আছেন সুজন ব্যানার্জি। ঠিক তখনই এক কর্মী তাঁকে একটি খবর দিলেন। সন্ধ্যায় বসুশ্রীতে প্রায়ই কয়েকজন পাইলট আসেন। সেদিনও এসেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তাঁদের মধ্যে দু’জন পরদিন সকালে বাগডোগরা যাবেন। তাঁরা আবার ইস্টবেঙ্গল সমর্থক। সমাধান মিলল। পরদিন ভোরে পাইলটদের গাড়িতে অরুণকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়া হল। তারপর বিমানে বাগডোগরা। সেখানে তাঁকে গ্রহণ করলেন তুষার রাউথ। কিন্তু জলপাইগুড়িতেও ঝুঁকি রয়েছে। তাই অরুণকে একা পাঠানো হল না। তাঁর সঙ্গী হলেন শুভাশিস গুহ। দু’জনকে পাঠানো হল সিকিম সীমান্তের রাউথদের চা-বাগানে।দশ দিন উত্তরবঙ্গের নিরিবিলি চা-বাগানে কাটিয়ে অবশেষে কলকাতায় ফিরলেন অরুণ ঘোষ।
 
দলবদলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়
 
একজন তরুণ ফুটবলারকে দলে নেওয়ার জন্য এমন লড়াই কলকাতা ময়দানে তার আগে দেখা যায়নি।মেরিন ড্রাইভে প্রস্তাব, শিবপুরে গিয়ে সই করানো, বসুশ্রী থেকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া, বিমানবন্দর এড়িয়ে যশোর রোড-টাকি-বসিরহাটের দিকে ছুটে যাওয়া, জেসপ গেটে লুকিয়ে রাখা, শেষে পাইলটের গাড়িতে বাগডোগরা হয়ে সিকিম সীমান্তের চা-বাগানে আশ্রয়।
 
আজকের দিনে শুনলে গল্প মনে হতে পারে।কিন্তু ষাটের দশকের কলকাতা ময়দানে এটাই ছিল দলবদলের বাস্তব রোমাঞ্চ। আর সেই রোমাঞ্চের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন অরুণ ঘোষ। তাই কলকাতা ফুটবলে দলবদলের প্রথম বড় নায়ক হিসেবে অরুণ ঘোষের নাম আজও আলাদা করে মনে রাখার মতো।


শেহতীয়া খবৰ