অনিকা মাহেশ্বরী / নয়াদিল্লি
“আমার পরিবারে আমিই প্রথম সন্তান, যে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। আমার বাবা একজন কৃষক। ছোটবেলার সেই অভিজ্ঞতাই আমাকে বুঝিয়েছিল, শিক্ষার সুযোগ থেকে কোনও শিশুকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।” নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই এমন সংকল্প করেছিলেন কাশ্মীরের সমাজকর্মী কিফায়তুল্লাহ মালিক। শিক্ষা ও সমাজসেবায় তাঁর নিরলস কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২১-২২ সালে ন্যাশনাল সোশ্যাল সার্ভিসের জন্য তিনি পেয়েছেন মর্যাদাপূর্ণ প্রেসিডেন্টস অ্যাওয়ার্ড।
বান্দিপোরার একটি ছোট গ্রামের বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সি কিফায়তুল্লাহ মালিক আজ আর কোনও পরিচয়ের অপেক্ষা রাখেন না। তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী ও পর্বতারোহী, যিনি শিক্ষা এবং যুবসমাজকে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সমাজে পরিবর্তন আনার জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ‘আওয়াজ-দ্য ভয়েস’-এর সঙ্গে কথোপকথনে তিনি বলেন, “পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী শিশুদের স্কুলে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করাই তাঁর কাজ। পাশাপাশি তিনি তাদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের জন্যও উৎসাহ দেন, কারণ বঞ্চিত শিশুদের উন্নয়নই তাঁর মূল লক্ষ্য।”
কিফায়তুল্লাহ মালিক
সংগ্রামে ভরা শুরুর পথ এবং শিক্ষার সফর
কিফায়তুল্লাহ লভেপোরার বয়েজ মিডল স্কুল থেকে প্রাথমিক পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। এরপর শ্রীনগরের অমর সিং কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সোশ্যাল ওয়ার্কে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। নিজের ছাত্রজীবনের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, “তিনি সবসময় দলগত কার্যকলাপে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন। খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন, তাঁর অধিকাংশ সহপাঠী আর্থিক সংকট অথবা পারিবারিক বাধ্যবাধকতার কারণে স্কুল ছেড়ে দিয়েছিল।” এই অভিজ্ঞতাগুলিই তাঁর মধ্যে সমাজের জন্য কিছু করার ভিত্তি তৈরি করে।
কলেজজীবনে স্কুলছুট পড়ুয়াদের আবার মূলধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য একই ভাবনায় বিশ্বাসী তরুণদের নিয়ে একটি শক্তিশালী দল গড়ে তোলেন তিনি। ক্রাউড-ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে নিজের এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে কিফায়তুল্লাহ আর কখনও পিছনে ফিরে তাকাননি। যেহেতু তিনি বান্দিপোরার প্রথম পেশাদার পর্বতারোহী, তাই তিনি পড়ুয়াদের ট্রেকিংয়ে নিয়ে গিয়ে তাঁদের কাউন্সেলিং করতেন এবং পড়াশোনায় উৎসাহিত করতেন। শুরুর দিকে বন্ধুদের কাছ থেকে পুরনো বই সংগ্রহ করে সেগুলি এমন শিশুদের মধ্যে বিতরণ করতেন, যারা বই কিনতে পারত না।
প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষার আলো: উইন্টার কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার
নিজের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলির অগ্রগতি সম্পর্কে কিফায়তুল্লাহ বলেন, “সাম্প্রতিক কিছু উন্নয়নের মধ্যে প্রথমটি হল ঈদ ফুড কিট বিতরণ। এর মাধ্যমে আমরা কাশ্মীরের ছয়টি জেলার ২০৫টি পরিবারের মধ্যে ঈদের খাদ্যসামগ্রীর কিট বিতরণ করেছি। আর তার থেকেও বড় উদ্যোগ ছিল উইন্টার কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার। এই উইন্টার কমিউনিটি লার্নিং সেন্টারগুলি আমরা এমন তিনটি এলাকায় স্থাপন করেছি, যেগুলি শীতকালে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং যেখানে শিশুরা এর আগে কখনও শীতের সময় টিউশন পড়ার সুযোগ পায়নি।”
কিফায়তুল্লাহ মালিক শিশুদের সঙ্গে
তিনি আরও জানান, এই দীর্ঘ বিরতি পরবর্তীকালে শিশুদের স্কুলছুট হওয়ার অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়াত। কারণ ৩ থেকে ৪ মাস পর্যন্ত পড়াশোনা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে অনেক শিশু স্কুল ছেড়ে দিত। এই সমস্যার মোকাবিলায় সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে ছাঁদাজি, কেতসন এবং রেশওয়ারিতে তিনটি টিউশন ও উইন্টার কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার স্থাপন করেন তিনি। এর মাধ্যমে শীতের সময় ৪০০ শিশুর পড়াশোনা অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে।
স্থানীয় পিজি বা স্নাতক যুবকদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি ‘সানডে ফর সোসাইটি’-র অধীনে বিভিন্ন অ্যাকাডেমির বেসরকারি শিক্ষকদেরও যুক্ত করে শিশুদের যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বের দক্ষতা, আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশের দক্ষতা উন্নত করা হয়।
স্টেশনারি বিতরণ থেকে বিবাহে সহায়তা ও দক্ষতা উন্নয়ন
পাহাড়ি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে শীতকালে জীবিকার সুযোগ না থাকায় বহু পরিবারের পক্ষে শিশুদের স্টেশনারির খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে হতাশ হয়ে অনেকেই সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ করে দেন। এই ব্যবধান দূর করতে কিফায়তুল্লাহর দল এখনও পর্যন্ত ৫৪০-রও বেশি প্রয়োজনীয়তাসম্পন্ন শিশুর কাছে স্টেশনারি পৌঁছে দিয়েছে। এর পাশাপাশি কয়েকটি বিবাহে সহায়তার ক্ষেত্রে তহবিল সংগ্রহ করে সাহায্য করেছেন তাঁরা। মেডিক্যাল বা নার্সিং কোর্সে পড়াশোনা করা মেধাবী শিশুদের ফি প্রদান করেও তাঁদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করেছেন।
কিফায়তুল্লাহ মালিক শিশুদের সঙ্গে
গ্রামীণ মহিলা এবং মহিলা উদ্যোক্তাদের জন্য তিনি দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করেছেন। প্রত্যন্ত আদিবাসী এলাকার মহিলা উদ্যোক্তাদের তৈরি পণ্যগুলির বিপণন ও প্রচার তিনি নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে করেন, যাতে অন্য মেয়েরাও অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
সচেতনতা শিবির ও বহুমুখী সমাজসেবা
কিফায়তুল্লাহ তাঁর দলের সঙ্গে কেতসন, ডাখি, ডংরনার এবং চিনচার-এর মতো প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতেও ব্যাপক সচেতনতা শিবির আয়োজন করেছেন। এইসব অভিযানের মাধ্যমে তাঁরা মহিলাদের সঙ্গে তাঁদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন, সরকারি প্রকল্প সম্পর্কে তাঁদের অবহিত করেছেন, পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা দিয়েছেন এবং মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে যুবসমাজকে সচেতন করেছেন।
তাঁর এই কর্মকাণ্ড আজ পরিবেশ সংরক্ষণ, শিক্ষা, নেশামুক্তি, পর্যটনের প্রসার এবং মানবিক সহায়তার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে তিনি REACHA (রিসার্চ অ্যান্ড এক্সটেনশন অ্যাসোসিয়েশন ফর কনজারভেশন অফ হর্টিকালচার অ্যান্ড অ্যাগ্রো-ফরেস্ট্রি)-এর স্মার্টপুর প্রকল্পের সঙ্গে ডিস্ট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটর হিসেবেও কাজ করছেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে কাশ্মীরের প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে ডিজিটাল ব্যবধান দূর করার কাজ করে চলেছেন তিনি।
কিফায়তুল্লাহ মালিক শিশুদের সঙ্গে
সম্মান ও অদম্য সংকল্প
কিফায়তুল্লাহ মালিকের নিরলস প্রচেষ্টা এবং সমাজসেবার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা জাতীয় স্তরে স্বীকৃতি পায়, যখন দেশের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি পুরস্কারে সম্মানিত করেন। এছাড়াও জম্মু-কাশ্মীরের সোশ্যাল ফরেস্ট্রি বিভাগের পক্ষ থেকে ‘বেস্ট ফরেস্ট ফ্রেন্ড অ্যাওয়ার্ড’, ‘অ্যাম্বাসাডর অফ হিউম্যানিটি অ্যাওয়ার্ড ২০২৪’ (যা সারা ভারত থেকে ১০টি ভিন্ন ক্ষেত্রে ১০ জনকে দেওয়া হয়), সমাজসেবার জন্য ২০২৪ সালের পুরস্কার, ‘গ্লোবাল হিউম্যান রাইটস অ্যাওয়ার্ড’ এবং ‘ADG-এর অ্যাপ্রিসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড ২০১৯’-সহ একাধিক মর্যাদাপূর্ণ সম্মান তিনি পেয়েছেন।
কিফায়তুল্লাহ দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, “যখন আপনার উদ্দেশ্য সৎ থাকে, তখন প্রত্যেকেই আপনাকে সাহায্য করে।” তিনি আরও বলেন, “আমি স্কুলছুট শিশুদের সমস্যাগুলি বুঝতে এবং তার সমাধান খুঁজে বের করতে চাই। আমাদের দলের সমস্ত সদস্য অত্যন্ত উৎসাহী। তাঁদের বিশ্বাস, তরুণরাই যে কোনও দেশের ভবিষ্যৎ। আর যখন তাঁরা নিজেদের চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করবেন এবং নিজেদের জীবনকে আরও উন্নত করবেন, তখনই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে।”