আবার কি ছুটবে দুই বাংলার রেল? রাজনীতির কাঁটাতার পেরিয়ে ফিরছে মৈত্রীর সুর

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 d ago
আবার কি ছুটবে দুই বাংলার রেল? রাজনীতির কাঁটাতার পেরিয়ে ফিরছে মৈত্রীর সুর
আবার কি ছুটবে দুই বাংলার রেল? রাজনীতির কাঁটাতার পেরিয়ে ফিরছে মৈত্রীর সুর
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

একটা ট্রেন শুধু লোহার চাকা, ইঞ্জিন আর কামরার সমষ্টি নয়। কখনও কখনও একটি ট্রেন হয়ে ওঠে ইতিহাসের চলমান দলিল। তার জানলার ওপারে দেখা যায় নদী, মাঠ, শহর—আর তার ভিতরে বসে থাকে মানুষের সম্পর্ক, আবেগ, স্মৃতি। কলকাতা থেকে ঢাকা কিংবা খুলনা থেকে কলকাতা—এই যাত্রাপথে তাই মিশে আছে দুই বাংলার বহু মানুষের ব্যক্তিগত গল্প।

রাজনীতির টানাপোড়েনে সেই যাত্রাপথ যখন থমকে যায়, তখন শুধু রেললাইনই নীরব হয় না, থমকে যায় বহু মানুষের অপেক্ষাও।দীর্ঘ বিরতির পর সেই অপেক্ষার অবসানের সম্ভাবনা ফের উঁকি দিচ্ছে। ভারত-বাংলাদেশ রেল কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মৈত্রী, মিতালি ও বন্ধন এক্সপ্রেস পুনরায় চালুর বিষয়টি আলোচনায় আসতে চলেছে। শুধু পুরনো ট্রেন চালু করাই নয়, রাজশাহী-কলকাতার মধ্যে নতুন একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর প্রস্তাবও দিতে চলেছে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে ঢাকা-কলকাতার মৈত্রী এক্সপ্রেসকে পদ্মা সেতু হয়ে চালানোর বিষয়েও আগ্রহ দেখানো হয়েছে।
 
অর্থাৎ, রাজনৈতিক সম্পর্কের ওঠাপড়ার মাঝেও রেলপথের দরজা আবার খুলে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে।ভারত-বাংলাদেশ রেল কর্তৃপক্ষের এই বৈঠকটি আন্তঃসরকার রেলওয়ে বৈঠক বা ইন্টার গভর্নমেন্টাল রেলওয়ে মিটিং—আইজিআরএম। বৈঠকে দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি বিদেশ, স্বরাষ্ট্র-সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত থাকবেন। ফলে বিষয়টি নিছক রেল পরিষেবা চালুর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দুই দেশের বৃহত্তর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক।
 
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রাজশাহী-কলকাতার মধ্যে আরও একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর প্রস্তাব বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ রাজশাহী ও কলকাতার মধ্যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী মানুষের আত্মীয়তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে এই যোগাযোগের গুরুত্ব যথেষ্ট।
 
মৈত্রী এক্সপ্রেসের পথ পরিবর্তনের প্রস্তাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এতদিন ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেস যমুনা সেতু হয়ে চলাচল করেছে। এবার পদ্মা সেতু হয়ে ট্রেনটি চালানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। পদ্মা সেতুর সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের একটি বড় অধ্যায় জড়িয়ে রয়েছে। ফলে মৈত্রী এক্সপ্রেসের সম্ভাব্য নতুন রুট যেন সেই নতুন পরিকাঠামোর সঙ্গেও দুই বাংলার যোগাযোগকে আরও নিবিড় করার বার্তা বহন করছে।কিন্তু এই গল্পের পিছনে রয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক ক্ষত।
 
২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল, পয়লা বৈশাখের দিন ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে চালু হয়েছিল মৈত্রী এক্সপ্রেস। নামের মধ্যেই ছিল বার্তা—মৈত্রী। ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর খুলনা-কলকাতা রুটে শুরু হয় বন্ধন এক্সপ্রেস। এরপর ২০২২ সালের ১ জুন ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ির মধ্যে যাত্রা শুরু করে মিতালি এক্সপ্রেস। তিনটি ট্রেন যেন ধীরে ধীরে দুই বাংলার মানুষের যাতায়াতকে নতুন স্বাভাবিকতায় ফিরিয়ে এনেছিল।
 
তারপর ২০২৪ সালের জুলাই। বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলন, শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং দ্রুত রাজনৈতিক পালাবদলের অভিঘাত এসে পড়ে রেল যোগাযোগেও। ১৯ জুলাই থেকে মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালি এক্সপ্রেসের চলাচল স্থগিত হয়ে যায়।সেই থেমে থাকা চাকা এখনও দুই বাংলার মানুষের মনে প্রশ্ন হয়ে আছে—কবে আবার ছুটবে মৈত্রী?
 
এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি বাস্তবতা। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকাল এবং ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে ভারতের ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির একটি অংশে ভারতবিরোধী মনোভাবও প্রকাশ্যে এসেছে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গেও রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে নতুন ধরনের আবেগ ও রাজনৈতিক ভাষ্য সামনে এসেছে। বিজেপির উত্থানের পর পশ্চিমবঙ্গের একাংশের মধ্যে বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু অধিকার এবং সীমান্তপারের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ যেমন বেড়েছে, তেমনই আর একাংশের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি ক্ষোভ ও দূরত্বের মনোভাবও স্পষ্ট হয়েছে।এই দুই বিপরীত আবেগের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে রেললাইন।
 
রাজনীতি যেখানে বিভাজনের ভাষা খুঁজে নেয়, রেল সেখানে মানুষের প্রয়োজনের ভাষা বোঝে। একজন যাত্রী কেন সীমান্ত পার হচ্ছেন, তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় কী—রেল তা জানতে চায় না। কেউ যাচ্ছেন মায়ের কাছে, কেউ চিকিৎসার জন্য, কেউ ব্যবসার কাজে, কেউ বহুদিন পর নিজের শিকড় দেখতে। সেই কারণেই মৈত্রী এক্সপ্রেসের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন শুধু একটি ট্রেন পরিষেবা পুনরুদ্ধারের খবর নয়; এটি মানুষের স্বাভাবিক যোগাযোগ ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনাও।
 
তবে বাস্তবতা সহজ নয়। তিনটি ট্রেন পুনরায় চালুর বিষয়ে রেল কর্তৃপক্ষের আগ্রহ থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র রেলের হাতে নেই। দুই দেশের বিদেশ, স্বরাষ্ট্র-সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের মতামত গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।তাই মঙ্গলবারের বৈঠক নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আলোচনার টেবিলে শুধু রেলের সময়সূচি বা রুট থাকবে না—থাকবে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও একাধিক প্রশ্ন।
 
মৈত্রী, মিতালি, বন্ধন—নাম তিনটি যেন তিনটি প্রতীক। মৈত্রী বন্ধুত্বের, বন্ধন সম্পর্কের, আর মিতালি আত্মীয়তার। রাজনৈতিক উত্তাপ যতই বাড়ুক, সাধারণ মানুষের সম্পর্ক যে একদিনে মুছে যায় না, এই ট্রেনগুলিই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।দুই বাংলার ইতিহাসে সীমান্ত এসেছে, রাষ্ট্র এসেছে, রাজনীতি এসেছে। কিন্তু ভাষা, গান, সাহিত্য, সংস্কৃতি আর পারিবারিক স্মৃতি কাঁটাতারের হিসাব মানেনি কখনও।
 
তাই প্রশ্নটা শুধু ‘ট্রেন কবে চালু হবে’ নয়।প্রশ্নটা আরও বড়—রাজনীতির উত্তাপ পেরিয়ে কি আবার মানুষের কাছে মানুষ পৌঁছবে?যদি মৈত্রী আবার কলকাতার পথে ছুটে আসে, যদি বন্ধন ফের খুলনার সঙ্গে কলকাতাকে জুড়ে দেয়, যদি মিতালি আবার উত্তরবঙ্গের পথে ঢাকা থেকে আসে—তাহলে সেই শব্দ শুধু রেলের চাকার শব্দ হবে না।
 
হয়তো তা হবে থেমে থাকা এক সম্পর্কের আবার চলতে শুরু করার শব্দ।কাঁটাতার থাকবে। সীমান্ত থাকবে। রাজনীতি থাকবে। মতপার্থক্যও থাকবে।
তবু তার মাঝখান দিয়ে যদি একটি ট্রেন এগিয়ে যায়, জানলার কাঁচে যদি আবার ভেসে ওঠে দুই বাংলার মাঠ-নদী-শহর, তাহলে মনে করিয়ে দেবে—রাষ্ট্রের সীমারেখা মানুষের প্রয়োজনকে চিরকাল আটকে রাখতে পারে না।মৈত্রী ফিরুক। বন্ধন জুড়ুক। মিতালির পথ খুলুক—রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে দুই বাংলার সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক যোগাযোগের জন্য।


শেহতীয়া খবৰ