দিল্লি থেকে সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার গ্রেফতার, কোচবিহার পারেক গুপ্তচর-চক্রের তদন্তে নতুন মোড়
নয়াদিল্লি/কোচবিহার:
পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ এবং সীমান্তপারের একটি সন্দেহভাজন নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকার অভিযোগে তদন্ত আরও জটিল মোড় নিল। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF) দিল্লি থেকে এক সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার-টেকনিশিয়ানকে গ্রেফতার করেছে। ধৃতের নাম প্রদীপ্ত বসু। তিনি শিলিগুড়ির বাসিন্দা বলে তদন্তকারীদের দাবি। বুধবার দিল্লিতে তাঁকে গ্রেফতারের পর বৃহস্পতিবার কোচবিহারে এনে দিনহাটা মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়। আদালত তাঁকে আট দিনের STF হেফাজতে পাঠিয়েছে।
তদন্তকারীদের সূত্রে খবর, স্বাধীনতা দিবসের দিন কোচবিহারের সাহেবগঞ্জ এলাকা থেকে পাক গুপ্তচর সন্দেহে তিনজনকে গ্রেফতারের পর তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদেই প্রদীপ্ত বসুর নাম সামনে আসে। রশিদুল হক, নূর নাসিরুদ্দিন আলি এবং শফিকুল ইসলাম—এই তিনজনের সঙ্গে প্রদীপ্তের যোগাযোগ ছিল কি না, কী ধরনের লেনদেন চলত এবং সেই যোগাযোগের পিছনে সীমান্তপারের কোনও সংগঠিত নেটওয়ার্ক ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
রানা রউফকে ঘিরেই কি খুলছে নেটওয়ার্কের দরজা?
এই তদন্তের সূত্র আরও পিছিয়ে যাচ্ছে উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়া পর্যন্ত। স্বাধীনতা দিবসের আগে সেখানে পাকিস্তানি নাগরিক রানা রউফকে গ্রেফতার করেছিল STF। তদন্তকারীদের দাবি, রউফ দীর্ঘদিন ভারতে ভুয়ো পরিচয়ে অবস্থান করছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ISI-এর যোগাযোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর কাছ থেকে ফোর্ট উইলিয়ামের ছবি ও মানচিত্র উদ্ধারের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পেয়েছে।
রউফকে গ্রেফতারের পর কলকাতার তপসিয়া এলাকা থেকেও তাঁর একাধিক সহযোগীকে পাকড়াও করে STF। তদন্তকারীদের অনুমান, এই সূত্র ধরেই উত্তরবঙ্গের সাহেবগঞ্জে থাকা সন্দেহভাজনদের কাছে পৌঁছনো সম্ভব হয়েছে। ফলে এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য—এই ব্যক্তিদের মধ্যে যোগাযোগের প্রকৃতি এবং তাঁদের পিছনে আরও কোনও বড় নেটওয়ার্ক রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করা।
হাওয়ালা, জাল নোট ও ভারতীয় সিম পাচারের অভিযোগ
প্রদীপ্ত বসুকে ঘিরে তদন্তে উঠে আসছে আরও গুরুতর অভিযোগ। STF সূত্রের দাবি, তিনি বিদেশি মুদ্রা লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এমনকি হাওয়ালা লেনদেন, জাল ভারতীয় নোটের কারবার এবং ভারতীয় মোবাইল সিম বাংলাদেশ হয়ে পাকিস্তানে পাঠানোর মতো কর্মকাণ্ডে তাঁর ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
এর আগে কোচবিহারে গ্রেফতার তিন সন্দেহভাজনের কাছ থেকেও বাংলাদেশি সিম এবং জাল নোট সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছিল বিভিন্ন তদন্তসূত্র। একটি সিম পাকিস্তান পর্যন্ত পৌঁছেছিল এবং সেটিকে কেন্দ্র করে একাধিক ব্যক্তির যোগাযোগের তথ্য তদন্তকারীদের হাতে এসেছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রদীপ্ত বা অন্য ধৃতদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ ও ফরেনসিক তদন্তের ফলেই প্রকৃত ভূমিকা স্পষ্ট হবে।
ইসলামপুরেও STF-এর অভিযান
একই তদন্তের সূত্র ধরে উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর থেকেও একজনকে আটক করেছে STF। তাঁর নাম ফজলে রাব্বি সিদ্দিকি। তিনি স্থানীয় তৃণমূল ব্লক সভাপতি জাকির হোসেনের ভাই বলে জানা যাচ্ছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, কোচবিহার থেকে গ্রেফতার হওয়া তিন সন্দেহভাজনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের সূত্র থাকতে পারে। সেই যোগসূত্রের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
অর্থাৎ, তদন্তের পরিধি এখন শুধু কোচবিহার বা শিলিগুড়িতে সীমাবদ্ধ নেই। উত্তর দিনাজপুর, কলকাতা, দিল্লি এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চল—একাধিক জায়গায় যোগাযোগের সম্ভাব্য সূত্র খতিয়ে দেখছে STF।
সীমান্তপথই কি ছিল যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম?
তদন্তকারীদের নজরে এসেছে বাংলাদেশ-নেপাল-ভারতকে ঘিরে সম্ভাব্য যোগাযোগপথও। রানা রউফ নেপাল হয়ে ভারতে ঢুকেছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। অন্যদিকে, ভারতীয় সিম বাংলাদেশ হয়ে পাকিস্তানে পৌঁছনোর অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে গোটা ঘটনায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত, নেপাল রুট এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ—তিনটি দিকই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
মোট সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
সাহেবগঞ্জ থানায় এই তদন্তকে কেন্দ্র করে মোট সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশ ও নেপালের নাগরিক থাকার কথাও তদন্তসূত্রে সামনে এসেছে। STF এখন ধৃতদের জেরা করে এই নেটওয়ার্কের আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগব্যবস্থা, সীমান্তপারের সহযোগী এবং সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে।
স্বাধীনতা দিবসের আগে পাকিস্তানি নাগরিক রানা রউফের গ্রেফতারি থেকে শুরু করে কোচবিহারে তিন সন্দেহভাজন, দিল্লি থেকে সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার প্রদীপ্ত বসু এবং ইসলামপুরে নতুন করে আটক—পরপর ঘটনাগুলিতে একটি সম্ভাব্য আন্তঃরাজ্য ও সীমান্তপারের নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত মিলছে। যদিও এখনও তদন্তাধীন কোনও ব্যক্তিকে আদালতের চূড়ান্ত রায় ছাড়া ‘পাক গুপ্তচর’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না, তদন্তকারীদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদ ও ডিজিটাল-আর্থিক প্রমাণ বিশ্লেষণ করেই এই চক্রের প্রকৃত চরিত্র সামনে আসবে।
তদন্ত এখন যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে: এই নেটওয়ার্ক কি শুধুই সিম ও জাল নোট পাচারের সঙ্গে যুক্ত, নাকি এর পিছনে আরও বড় কোনও গুপ্তচরবৃত্তির কাঠামো রয়েছে? উত্তর মিলতে পারে ধৃতদের হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ এবং উদ্ধার হওয়া ডিজিটাল ও আর্থিক নথির বিশ্লেষণেই।