বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনা তৈরির লক্ষ্যে ‘বিগ-বি’ (BIG-B) উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত কৌশলগত সহযোগিতার কাঠামোয় উন্নীত করতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও জাপান। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও এই উদ্যোগকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যপথে বাংলাদেশের অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
২৭ অক্টোবর টোকিওতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠকের পর দুই দেশ ‘BIG-B for Shared Prosperity’ বা ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ উদ্যোগ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়। জাপান ও বাংলাদেশের যৌথ বিবৃতিতে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সরবরাহব্যবস্থার উন্নতি এবং যোগাযোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিগ-বি উদ্যোগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র বাংলাদেশের কক্সবাজারের মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চল। গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে এখানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিকাঠামো, শিল্পাঞ্চল, বন্দর-সংশ্লিষ্ট পরিষেবা এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা (JICA) এই অঞ্চলের পরিকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করে আসছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প এখনও নির্মাণাধীন। বন্দরটি কার্যকর হলে বড় জাহাজে পণ্য পরিবহণ, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ এবং বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জাইকার সহযোগিতায় মাতারবাড়ী-মহেশখালী সমন্বিত পরিকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগের পাশাপাশি ঢাকার গণপরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়নেও সহযোগিতার কথা জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ তৈরি করে। উপযুক্ত সড়ক, রেল, নৌপথ ও সীমান্ত বাণিজ্য পরিকাঠামো গড়ে তোলা গেলে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করে পণ্য পরিবহণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। একইভাবে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়লেও আঞ্চলিক বাণিজ্য উপকৃত হতে পারে।
ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘নর্থ ইস্ট নিউজ’-এর একটি প্রতিবেদনে বিগ-বি উদ্যোগের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করার সম্ভাবনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে মাতারবাড়ী বন্দরের উন্নয়ন এবং বাংলাদেশকে উত্তর-পূর্ব ভারতের বাণিজ্যিক করিডরের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টিকে উদ্যোগটির বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করার সম্ভাবনাকে দুই প্রধানমন্ত্রীর যৌথ বিবৃতিতে ঘোষিত কোনও নির্দিষ্ট আন্তদেশীয় করিডর চুক্তির সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। বাস্তব সংযোগের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলির মধ্যে পরিবহণ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিক পরিকাঠামো নিয়ে পৃথক সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
নতুন কাঠামোয় বিগ-বি উদ্যোগকে চারটি প্রধান স্তম্ভের ওপর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এগুলি হল—আঞ্চলিক যোগাযোগ শক্তিশালী করা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহযোগিতা।
এর অর্থ, উদ্যোগটি আর শুধু বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা শিল্পাঞ্চল নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সরবরাহব্যবস্থা, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকেও একই কাঠামোয় আনার চেষ্টা হচ্ছে।
বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে জাপানি সংস্থাগুলির বেসরকারি বিনিয়োগ এক লক্ষ কোটি ইয়েন পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলে বৈঠকের পর জানানো হয়েছে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় দুই লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটি ঘোষিত বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার হিসাব; বাস্তবে কতটা বিনিয়োগ হবে এবং কত কর্মসংস্থান তৈরি হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতির ওপর।
উৎপাদনশিল্প, কৃষি ও খাদ্য, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ওষুধশিল্পকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি দ্রুত কার্যকর করার বিষয়েও দুই পক্ষ গুরুত্ব দিয়েছে।
বিগ-বি উদ্যোগের ধারণাটি জাপানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে প্রস্তাব করেছিলেন। বর্তমানে তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির নতুন অঙ্গীকারের মাধ্যমে সেই পরিকল্পনাকে আরও বিস্তৃত কৌশলগত কাঠামোয় এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
তবে উদ্যোগটির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে কার্যকর পরিবহণ সংযোগ স্থাপন জরুরি। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ পেলে তা বাংলাদেশ ও ভারতের পাশাপাশি নেপাল ও ভুটানের বাণিজ্যিক সুযোগও বাড়াতে পারে।
এখন দুই দেশের ঘোষিত অঙ্গীকার কত দ্রুত বাস্তব প্রকল্প, বিনিয়োগ ও কার্যকর আঞ্চলিক যোগাযোগে রূপ নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ সাফল্য।