ডোকলাম নিয়ে সম্ভাব্য সমঝোতার প্রভাব পড়তে পারে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায়, সতর্ক নজর নয়াদিল্লির

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 d ago
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
 
নয়াদিল্লি: 
 
চিন ও ভুটানের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ মেটানোর আলোচনা নতুন করে গতি পাওয়ায় ভারতের কৌশলগত মহলে গুরুত্ব পাচ্ছে ডোকলাম ও শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তার প্রশ্ন। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যকে যুক্ত করা এই সরু ভূখণ্ডটি দেশের প্রতিরক্ষা, পণ্য পরিবহণ ও সামরিক যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে চিন-ভুটান সীমান্ত আলোচনায় কী ধরনের অগ্রগতি হচ্ছে, তার ওপর নজর রাখছে ভারত।

গত ১৫ অক্টোবর ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে চিন ও ভুটানের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ১৬তম বৈঠক শেষ হয়। দুই দেশ সীমান্ত আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে। পাশাপাশি সীমান্ত নির্ধারণ ও চিহ্নিতকরণ সংক্রান্ত যৌথ কারিগরি দলের চতুর্থ বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার রূপরেখা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ইতিবাচক বোঝাপড়া হয়েছে বলে যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়। তবে সীমান্ত বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। সূত্র: দ্য প্রিন্ট, ১৫ অক্টোবর ২০২৬।

ডোকলাম মালভূমি ভারত, ভুটান ও চিনের সীমান্তবর্তী একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এই এলাকার কাছেই রয়েছে চিনের চুম্বি উপত্যকা এবং ভারতের শিলিগুড়ি করিডর। ডোকলাম অঞ্চলে চিনের পরিকাঠামো নির্মাণের সম্ভাবনা নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। কারণ, ওই অঞ্চলে চিনের অবস্থান শক্তিশালী হলে শিলিগুড়ি করিডরের ওপর নজরদারি ও সামরিক কৌশলের ক্ষেত্রে বেজিং সুবিধা পেতে পারে বলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন।

২০১৭ সালে ডোকলাম মালভূমিতে চিনের সড়ক নির্মাণের চেষ্টা ঘিরে ভারত ও চিনের সেনাবাহিনীর মধ্যে দীর্ঘ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। ভুটানের দাবি করা অঞ্চলে চিনের নির্মাণকাজ ভারতের নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এই যুক্তিতেই নয়াদিল্লি আপত্তি জানিয়েছিল। পরে ওই অচলাবস্থার অবসান ঘটে।

ডোকলাম নিয়ে চিন ও ভুটানের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনও সমঝোতা হলে তার প্রভাব ভারতের নিরাপত্তার ওপর কীভাবে পড়বে, তা নির্ভর করবে সমঝোতার শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বাস্তব পরিস্থিতির ওপর।

পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির কাছে অবস্থিত সরু ভূখণ্ডটি ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত। এই করিডর দিয়েই দেশের বাকি অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থল যোগাযোগের প্রধান পথ গিয়েছে। সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে এর প্রস্থ আনুমানিক ২০–২২ কিলোমিটার।

এই অঞ্চলের দু’পাশে নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের অবস্থান এবং উত্তরে চিনের নৈকট্য করিডরটিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। সড়ক ও রেল যোগাযোগের পাশাপাশি সেনা এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবহণেও এই পথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

করিডরে কোনও বড় ধরনের যোগাযোগ বিঘ্নিত হলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের স্থলপথে যাতায়াত ও পণ্য সরবরাহে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই এই অঞ্চলের সড়ক, রেল, সীমান্ত নজরদারি এবং বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

২০২৬ সালের ২২ অগস্ট কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা পর্যালোচনা করেন। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের আধিকারিকদের পাশাপাশি সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিনিধিরা ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, করিডরের নিরাপত্তা জোরদার করা, গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। করিডরের চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য বিভিন্ন সংস্থার উপস্থিতি বাড়ানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।

এই উদ্যোগ থেকে স্পষ্ট, চিন-ভুটান সীমান্ত আলোচনার বাইরে থেকেও শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা ও পরিকাঠামো পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সূত্র: ভারত সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো, ২২ অগস্ট ২০২৬।

চিন ও ভুটানের মধ্যে এখনও আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চালাচ্ছে। ২০২৩ সালে সীমান্ত বিরোধ দ্রুত মেটাতে তিন ধাপের একটি রূপরেখা বাস্তবায়নে সম্মত হয়েছিল তারা।

ভুটানের সঙ্গে সীমান্ত সমঝোতা হলে চিনের সঙ্গে তার সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। কিন্তু ভারতের জন্য মূল প্রশ্ন হবে, সম্ভাব্য সমঝোতা ডোকলাম ও তার আশপাশের স্থিতাবস্থায় কোনও পরিবর্তন আনে কি না এবং তার ফলে শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কীভাবে প্রভাবিত হয়।

একই সঙ্গে ভুটানের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং চিনের সঙ্গে তার দ্বিপাক্ষিক সীমান্ত আলোচনাকেও বিবেচনায় রাখা জরুরি। সম্ভাব্য কোনও চুক্তির প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণের জন্য তার সুনির্দিষ্ট শর্ত ও বাস্তবায়নের বিবরণ জানা প্রয়োজন।

চিন-ভুটান সীমান্ত আলোচনায় অগ্রগতির বার্তা এলেও ডোকলাম নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতার কোনও ঘোষণা হয়নি। তাই এখনই ভারতের নিরাপত্তার ওপর আসন্ন কোনও নির্দিষ্ট হুমকির সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যুক্তিযুক্ত নয়।

তবে ডোকলামের ভৌগোলিক অবস্থান এবং শিলিগুড়ি করিডরের গুরুত্বের কারণে সীমান্ত আলোচনার প্রতিটি অগ্রগতি ভারতের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ। ভবিষ্যতে চিন ও ভুটান কী ধরনের সমঝোতায় পৌঁছয়, সীমান্তবর্তী এলাকায় পরিকাঠামো নির্মাণের গতিপ্রকৃতি কী হয় এবং ভারত কীভাবে নিজের যোগাযোগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করে—এই তিনটি বিষয়ই আগামী দিনে আঞ্চলিক কৌশলগত পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।


শেহতীয়া খবৰ