বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখল পুরুলিয়ার নবম শ্রেণির ছাত্রী আয়েশা ফতেমা, কিন্ত অর্থের কারণে অধরা থাকল লন্ডনের মঞ্চে সম্মানপ্রাপ্তি

Story by  Tarun Nandi | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 47 m ago
বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখল পুরুলিয়ার নবম শ্রেণির ছাত্রী আয়েশা ফতেমা
বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখল পুরুলিয়ার নবম শ্রেণির ছাত্রী আয়েশা ফতেমা
 
তরুণ নন্দী, কলকাতাঃ

বিশ্বের মধ্যে ১৮৩টি দেশের এক লক্ষেরও বেশি প্রতিযোগীর ভিড়ে নবম শ্রেণির পড়ুয়ার নজরকাড়া সাফল্য। পুরুলিয়ার আয়েশা ফতেমা সেরা লেখার ১৭.৫ শতাংশের তালিকায় জায়গা করে নিয়ে গর্বিত করল বাংলার মাটিকে। কথায় বলে, স্বপ্নের যেমন কোনও সীমানা হয় না তেমনি প্রতিভা কখনও ভৌগোলিক গণ্ডিতে আটকে থাকে না। আবার প্রতিভা থাকলেও তাকে প্রতিভাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার সুযোগও সব সময় সবার ভাগ্যে জোটে না।
 

কখনও কখনও সাফল্যের দরজায় পৌঁছেও অর্থের অভাবে থমকে যেতে হয় স্বপ্নের পথচলা। পুরুলিয়ার আয়েশা ফাতিমা আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্যের আলো জ্বালালেও,  রয়ে গেল একরাশ আক্ষেপ। লন্ডনের মর্যাদাপূর্ণ প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় নিজের লেখনীর জোরে নজর কেড়েছে ঠিকই কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থার কারণে সেই সাফল্যের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া হল না তার।
 
পুরুলিয়ার পাড়ার ফেলিক্স স্কুল অফ এডুকেশনের নবম শ্রেণিতে পড়ে আয়েশা ফাতিমা। বয়সে কিশোরী হলেও  তার ভাবনায় পরিণত ছাপ রয়েছে। আর সেই ভাবনারই প্রতিফলন ঘটেছে তার লেখায়। লন্ডনের ‘জন লক ইনস্টিটিউট জুনিয়র গ্লোবাল এসে’ প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতায় মনস্তত্ত্ববিদ্যা বিভাগে অংশ নিয়ে শর্টলিস্টেড হয়েছে বাংলার মেয়ে আয়েশা।
 
 
 
জানা গেছে,  বিশ্বের নানা প্রান্তের ১৮৩টি দেশের এক লক্ষেরও বেশি প্রতিযোগীর মধ্যে মাত্র ১৭.৫ শতাংশ নির্বাচিত লেখার তালিকায় আয়েশার প্রবন্ধ জায়গা করে নিয়েছে। ক্লাস নাইনে পড়া মেয়েটির এমন সাফল্যে উচ্ছ্বসিত পরিবার থেকে স্কুলের শিক্ষক ও সহপাঠীরা। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন নেটিজেনরাও।
 
আয়েশার প্রবন্ধের বিষয়টিও ছিল বেশ ব্যতিক্রমী। ‘মৃত্যুর পরে দেহ নিয়ে কী করা হবে, তা নিয়ে চিন্তা কীসের!’ আপাতদৃষ্টিতে এক কঠিন ভাবনাকে নিজের ভাবনা সাজিয়েছে এই কিশারী ছাত্রী। মৃত্যুর পর মানুষের দেহের প্রতি সম্মান, বিভিন্ন দেশের শেষকৃত্যের রীতি এবং মৃত্যুকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাস, নানান বিষয়গুলো যেন উঠে এসেছে তার লেখার প্রতিটি অক্ষরে। জানা গেছে, মাত্র এক সপ্তাহের প্রস্তুতিতে তৈরি করা প্রবন্ধে চিন্তার গভীরতা ও সংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছে সে। যে লেখা আজ তাকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উল্লেখযোগ্য সাফল্যের তালিকায় পৌঁছে দিয়েছে।
 
বিশ্বের দরবারে এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে লন্ডনের মেফেয়ারের পার্ক লেনে অবস্থিত লন্ডন হিলটনে আয়োজিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে দেওয়ার আমন্ত্রণ যে কোনও পড়ুয়ার কাছেই স্বপ্নের মতো। কারণ, আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের সাফল্য উদ্‌যাপনের পাশাপাশি বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রতিভাবানদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এক স্মরনীয় মুহুর্ত। কিন্তু আয়েশার স্বপ্নের সেই সফরের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা।
 
আয়েশার মা নিগার সুলতানার কথায়, লন্ডনে যাওয়া যথেষ্ট ব্যয়বহুল। তাই আমাদের মত সাধারণ পরিবারের পক্ষে লন্ডন যাতায়াতের খরচ বহন করা সম্ভব নয়। তাই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েও উপস্থিত থাকা হল না মেয়ের। পরিবারের আক্ষেপটা এখানেই। প্রতিভার আলো ছড়িয়েও উদ্‌যাপনের মঞ্চে পৌঁছনোর সুযোগ মিলল না শুধুমাত্র পারিবারিক আর্থিক অবস্থার কারণে। আয়েশার বাবা মহম্মদ রাজিউদ্দিন রঘুনাথপুর-২ ব্লকের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বিদেশের সেই জমকালো অনুষ্ঠানে যোগ দিতে না পারলেও ইনস্টিটিউটের পাঠানো শংসাপত্র হাতে পেয়ে খুশি থাকছে আয়েশা ও তার পরিবার। কারণ, লন্ডনের মঞ্চে সশরীরে উপস্থিত হতে পারলেও আন্তর্জাতিক পরিসরে তার লেখার স্বীকৃতি পৌঁছে গিয়েছে।
 
পুরুলিয়ার আয়েশা ফাতিমা
 
 
নিজের লেখার ভাবনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আয়েশা জানিয়েছে, অনেকেই মৃত্যুর পরেও জীবনের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন। বিভিন্ন দেশের শেষকৃত্য-সংক্রান্ত নানা পর্ব ও রীতির মধ্যেও সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। তার মতে, মৃত্যুর পরেও একজন মানুষের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা বজায় রাখা উচিত। কেউ পুনর্জন্মে বিশ্বাস করুন বা নাই করুন, শেষকৃত্য যেন মর্যাদার সঙ্গেই সম্পন্ন হয়, এই মানবিক ভাবনা যেন উঠে এসেছে তার লেখায়। আয়েশার এই সাফল্যে গর্বিত স্কুলের শিক্ষিকা প্রিয়াঙ্কা ঘোষও।তিনি গর্বের সঙ্গে জানালেন, এর আগেও এই স্কুলের পড়ুয়ারা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জিতে স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করেছে। এবার আয়েশা স্কুলের এই সাফল্যের ধারাকেই আরও সমৃদ্ধ করল।
 
বহু শিক্ষাবিদ মনে করেন, মেধার বিকাশের জন্য প্রয়োজন গভীর অধ্যবসায়, সুযোগ আর উৎসাহ। যা আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছনোর পথে অনেক সময় বড় ভূমিকা নেয়। আয়েশার মতো প্রতিভাবান পড়ুয়াদের পাশে যদি আরও বেশি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে হয়তো আগামী দিনে আর কোনও স্বপ্নকে অর্থের অভাবে থমকে যেতে হবে না। লন্ডনের অনুষ্ঠানে আয়েশার যাওয়া হল না ঠিকই, কিন্তু আয়েশার কলমে উঠে আসা প্রবন্ধ গোটা বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছে।  পুরুলিয়ার এই মেয়েই একদিন হয়ত নিজের প্রতিভার জোরে পৌঁছে যাবে আরও বড় কোনও মঞ্চে। তখন তার এই আক্ষেপের চেয়ে অনেক বেশি জায়গা করে নেবে প্রাপ্তির আনন্দ।


শেহতীয়া খবৰ