নেপাল বিপর্যয়: প্রাণে বাঁচলেও কৈলাস দর্শন অধরা, চিনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উত্তরপাড়ার অঞ্জনা স্যান্যালের
কলকাতা:
হিমবাহ হ্রদ ভেঙে জলস্রোত নেমে আসা এবং মেঘভাঙা বৃষ্টির জেরে ভয়াবহ হড়পা বানে বিপর্যস্ত নেপাল। ঘটনার ছ’দিন পরও বহু এলাকায় ধ্বংসস্তূপের চিত্র বদলায়নি। সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়েছে এবং এখনও বহু মানুষের কোনও সন্ধান নেই। এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যেই প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন বাংলার একাধিক পর্যটক ও তীর্থযাত্রী। তাঁদেরই একজন উত্তরপাড়ার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা ৬৯ বছরের অঞ্জনা স্যান্যাল। তবে বিপর্যয়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি চিনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
কলকাতার একটি পর্যটন সংস্থার সঙ্গে গত ২১ আগস্ট কাঠমান্ডু হয়ে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় রওনা হয়েছিলেন অঞ্জনা স্যান্যাল। ২৫ আগস্ট রাতে চিনের ভিসা পাওয়ার পর ২৬ আগস্ট সকালে গাড়িতে করে কৈলাসের উদ্দেশে রওনা দেন তাঁরা। অঞ্জনার বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিন প্রথমদিকে আবহাওয়া ছিল বেশ পরিষ্কার। কিন্তু কিছুটা এগোনোর পর পাহাড়ের গা বেয়ে ধোঁয়ার মতো কিছু নেমে আসতে দেখেন তাঁরা। সঙ্গে ছিল প্রবল শব্দ। উলটো দিক থেকে আসা মানুষজন তাঁদের সতর্ক করেন, পাহাড়ের উপর থেকে ভয়াবহ জলস্রোত নেমে আসছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে তাঁদের নেপালি চালক দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে নিরাপদ জায়গার দিকে ফিরে আসেন। চালকের সতর্কতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্তের কারণেই তাঁরা বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন বলে মনে করছেন অঞ্জনা। প্রাণে বাঁচলেও তাঁর কৈলাস দর্শনের স্বপ্ন এবার পূরণ হয়নি। দুর্গম ওই এলাকায় আবার কবে যেতে পারবেন, তা ভেবেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি। যদিও চিনা দূতাবাসের তরফে সেপ্টেম্বর নাগাদ ফের যাত্রার সুযোগ পাওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অঞ্জনা।
তবে বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা থেকেই চিনের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন তিনি। অঞ্জনার দাবি, হিমবাহ ভাঙনের খবর পাওয়ার পর নেপালকে দ্রুত সতর্ক করা হলে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সকাল প্রায় ৭টা ১০ মিনিট নাগাদ হিমবাহ ভাঙনের ঘটনা ঘটে এবং নেপালে বসে তাঁরা প্রায় ৮টা ৪০ মিনিট নাগাদ বিপর্যয়ের খবর জানতে পারেন। তাঁর অভিযোগ, এই সময়ের ব্যবধানের মধ্যে আগাম সতর্কতা জারি করা গেলে দুর্গত এলাকার মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যেত।
অঞ্জনা স্যান্যালের আরও দাবি, বিপর্যয়ের প্রায় তিন মাস আগে নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে হিমবাহ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেই তথ্য সময়মতো পাওয়া যায়নি। তাঁর মতে, ওই তথ্য আগে হাতে এলে সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হতে পারত।
তবে চিন ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন করেছে বা দেরি করেছে—অঞ্জনার এই অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি। হিমবাহ ভাঙন, আকস্মিক বন্যা এবং বিপর্যয়ের পূর্বাভাস সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে নেপাল ও চিনের মধ্যে কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছিল, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে এবং বিষয়টি নিয়ে আরও তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।
নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয় তাই শুধু উদ্ধার ও ত্রাণের সংকট নয়, সামনে এনেছে সীমান্তবর্তী দেশগুলির মধ্যে দুর্যোগ-সংক্রান্ত তথ্য আদানপ্রদান এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার গুরুত্বও। অঞ্জনা স্যান্যালের মতো প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিজ্ঞতা সেই প্রশ্নকেই আরও জোরালো করে তুলছে—প্রকৃতির ভয়াবহ শক্তির সামনে কয়েক মিনিটের আগাম সতর্কতাও কি বহু প্রাণ বাঁচাতে পারত?