ফুটবলের এক সোনালি যুগের অবসানঃ আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর লিওনেল মেসির; অনুরাগীদের লিখলেন আবেগঘন চিঠি

Story by  Nikunja Nath | Posted by  Aparna Das • 39 m ago
ফুটবলের এক সোনালি যুগের অবসানঃ আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর লিওনেল মেসির; অনুরাগীদের লিখলেন আবেগঘন চিঠি
ফুটবলের এক সোনালি যুগের অবসানঃ আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর লিওনেল মেসির; অনুরাগীদের লিখলেন আবেগঘন চিঠি
 
নিকুঞ্জ নাথ / গুয়াহাটি

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক বর্ণময় ও অনন্য যুগের অবসান ঘটল। সবুজ গালিচায় নীল-সাদা জার্সি পরে যে জাদুকর কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, যার দুই পায়ের জাদুতে সময় যেন থমকে যেত, সেই কিংবদন্তি লিওনেল মেসি অবশেষে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করলেন।
 
২০২০ সালে মারাদোনার আকস্মিক মৃত্যু সমগ্র ফুটবল বিশ্বকে যে গভীর শোকে নিমজ্জিত করেছিল, তার পর মেসিই ছিলেন অনুরাগীদের কাছে জীবন্ত কিংবদন্তি তথা সান্ত্বনার উৎস। এখন মেসির এই অবসর ঘোষণাকে সমর্থকদের কাছে দ্বিতীয় বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
 
৩৯ বছর বয়সি বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক সামাজিক মাধ্যমে নিজের হাতে লেখা একটি আবেগঘন চিঠির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আনায় বিশ্বজুড়ে ফুটবল অনুরাগীদের হৃদয়ে গভীর আঘাত হেনেছে। যদিও সকলেই স্বীকার করেছেন যে, এক গৌরবোজ্জ্বল যাত্রার এটাই যথার্থ সমাপ্তি।
 
লিওনেল মেসি
 
আর্জেন্টিনার ফুটবলে ‘১০ নম্বর’ জার্সিটি শুধু একটি সংখ্যা বা খেলোয়াড়ের পরিচয় নয়, এটি এক জাতীয় আবেগ, এক জীবন্ত ইতিহাস এবং কোটি কোটি অনুরাগীর কাছে এক পবিত্র প্রতীক। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে দিয়েগো মারাদোনা এই ১০ নম্বর জার্সি পরে যে ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদু প্রদর্শন করেছিলেন এবং একক প্রচেষ্টায় দেশকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন, তা বিশ্ব ফুটবলের এক অমর গাঁথা। মারাদোনার সেই বিশাল ও ভারী উত্তরাধিকার কাঁধে নিয়েই লিওনেল মেসি নিজের যাত্রা শুরু করেছিলেন।
 
আর্জেন্টিনার নীল-সাদা শিবিরে এখন আর কোনও মারাদোনা বা মেসি নেই, যিনি মাঠে নামলেই অনুরাগীরা জয়ের নিশ্চয়তা পেতেন। এই শূন্যতা শুধু আর্জেন্টিনার জন্য নয়, সমগ্র ফুটবল বিশ্বের জন্য এক গভীর শূন্যতা, যা প্রতিটি অনুরাগীর হৃদয়ে এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী বিষাদের ছায়া ফেলে যাবে।
 
১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। একটি সাধারণ শ্রমিক পরিবারে জন্ম নেওয়া মেসির ফুটবলের প্রতি ছিল জন্মগত আকর্ষণ। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই স্থানীয় ক্লাব গ্র্যান্ডোলির হয়ে তিনি ফুটবল খেলা শুরু করেন। কিন্তু ১১ বছর বয়সে তাঁর জীবনে নেমে আসে এক বড় চ্যালেঞ্জ, তাঁর শরীরে ‘গ্রোথ হরমোনের অভাব’ ধরা পড়ে। চিকিৎসার বিপুল খরচ বহন করা তাঁর পরিবারের পক্ষে অসম্ভব ছিল।
 
লিওনেল মেসি
 
এমন সময় স্পেনের বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব এফসি বার্সেলোনার স্পোর্টিং ডিরেক্টর কার্লোস রেক্সাচের নজরে পড়ে মেসির অসাধারণ প্রতিভা। রেক্সাচ একটি সাধারণ টিস্যু পেপারে চুক্তিবদ্ধ হয়ে মেসির চিকিৎসার সমস্ত দায়িত্ব নেন। এরপর মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেসি পরিবারের সঙ্গে স্পেনে পাড়ি জমান এবং বার্সেলোনার বিখ্যাত অ্যাকাডেমি ‘লা মাসিয়া’-তে যোগ দিয়ে বিশ্বজয়ের প্রস্তুতি শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে বার্সেলোনা, পিএসজি এবং বর্তমানে ইন্টার মায়ামির হয়ে তিনি যে রেকর্ড ও সাফল্য অর্জন করেছেন, তা ক্রীড়া ইতিহাসের এক সোনালি অধ্যায়।
 
নীল ও সাদা জার্সিতে দুই দশক ধরে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়ার পর মেসি তাঁর আর্জেন্টিনা-যাত্রার শেষ পৃষ্ঠাটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার কথা নিশ্চিত করে এই আর্জেন্টাইন সুপারস্টার জানান, তাঁর কেরিয়ারের অনন্য পরিচয় হয়ে ওঠা জাতীয় দলের জার্সিটি তিনি আর পরবেন না।
 
তিনি প্রকাশ করেছেন, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের মাত্র দু’দিন পরেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। চলতি মাসের শুরুতে তাঁর বাবা জর্জ মেসির আকস্মিক প্রয়াণ তাঁকে গভীরভাবে মর্মাহত করে। বাবার মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে আসার এই সিদ্ধান্ত আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত বলে তিনি জানান।
 
মাঠে ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসি
 
তবে জাতীয় দল থেকে বিদায় নেওয়ার অর্থ এই নয় যে তিনি সম্পূর্ণভাবে ফুটবল খেলা ছেড়ে দিয়েছেন। ২০২৫ সালে তিনি ‘ইন্টার মায়ামি সিএফ’-এর সঙ্গে নিজের চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়েছিলেন, যা ২০২৮ সালের ‘মেজর লিগ সকার’ (এমএলএস) মরশুমের শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
 
অনুরাগীদের উদ্দেশে মেসির আবেগঘন বার্তা
 
ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করা চিঠিতে মেসি লিখেছেনঃ “হাতে সময় খুব কম এবং অধ্যায়গুলি বন্ধ হতে শুরু করেছে; এটি এমন একটি অধ্যায়, যা আমাকে অত্যন্ত কষ্ট দিয়েছে। জাতীয় দলের অংশ হয়ে থাকা আমি ভালোবাসি, ভালোবেসেছি এবং সবসময় ভালোবাসব। আমার যা ছিল, সবকিছু আমি উজাড় করে দিয়েছি; এখন দেওয়ার মতো আমার কাছে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। এর পাশাপাশি অনেক প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড় উঠে আসছে, যারা সুযোগ পাওয়ার সম্পূর্ণ যোগ্য।”
 
“গত ২০ বছর ধরে আপনারা যে সমস্ত ভালোবাসা ও সমর্থন দিয়েছেন, তার জন্য ধন্যবাদ। স্টেডিয়ামের ভিতর থেকে আপনাদের জয়ধ্বনি শোনা আমি খুব মিস করব। এখন থেকে আমি আপনাদেরই একজন হয়ে যাব এবং বাইরে থেকেই সবসময় দলকে সমর্থন ও উৎসাহিত করে যাব, ভালো ও খারাপ, উভয় সময়েই, বিশেষ করে কঠিন সময়গুলিতে আরও বেশি।”
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

A post shared by Leo Messi (@leomessi)

 
“এই সুন্দর অথচ কঠিন যাত্রায় সবসময় আমার পাশে থাকার এবং সঙ্গ দেওয়ার জন্য আমার পরিবারকে ধন্যবাদ। যাত্রার অংশীদার হওয়া প্রত্যেক কোচ, সতীর্থ খেলোয়াড় এবং কর্মকর্তাকে অশেষ ধন্যবাদ। আমি আমার সঙ্গে কখনও ভুলতে না-পারা স্মৃতি ও মুহূর্তগুলি নিয়ে চলে যাব।”
 
“আমার সতীর্থদের সঙ্গে মিলিত হয়ে আপনাদের এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দেওয়ার মানসিক শান্তি ও গর্ব নিয়ে আমি বিদায় নিচ্ছি, যেগুলি আমরা কেবল স্বপ্নেই ভাবতে পারতাম। আপনাদের সকলের সঙ্গে এই সবকিছু অনুভব করা ছিল অপূর্ব ও উন্মাদনাপূর্ণ। আমি আপনাদের ভালোবাসি!”
 
“আমাকে আর্জেন্টাইন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। এগিয়ে চলো, আর্জেন্টিনা!”
 
বক্তব্যে তিনি আরও উল্লেখ করেন, “ফাইনালের দু’দিন পর, ২১ জুলাইতেই আমি এই কথাগুলি লিখেছিলাম। আজ আমার বাবার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর আমি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছি।”
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

A post shared by Leo Messi (@leomessi)

 
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির কেরিয়ার
 
২০৭টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১২৫টি গোল করে লিওনেল মেসি নিজেকে আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং দেশের হয়ে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
 
২০০৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে জাতীয় সিনিয়র দলে অভিষেকের মাধ্যমে মেসির আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ২০০৬ সালের বিশ্বকাপের দলে তিনি অন্তর্ভুক্ত হন, যা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের সূচনা করেছিল। সেই প্রতিযোগিতাতেই তিনি চমকপ্রদ প্রভাব ফেলেছিলেন এবং সেই সময় বিশ্বকাপ খেলা আর্জেন্টিনার সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় তথা সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হিসেবে পরিগণিত হয়েছিলেন। সার্বিয়া অ্যান্ড মন্টেনেগ্রোর বিরুদ্ধে খেলা প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচেই মেসি গোল করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
 
তবে কেরিয়ারের প্রাথমিক পর্যায়ে আর্জেন্টিনার হয়ে সাফল্য অর্জন করা সহজ ছিল না। ২০১০ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ায় তিনি হতাশায় ডুবে যান। এর চার বছর পর, ২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা পৌঁছেছিল, যদিও জার্মানির কাছে পরাজিত হয়। দু’বছর পর, ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিরুদ্ধে ফের হৃদয়বিদারক পরাজয়ের মুখোমুখি হওয়ায় তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের কথাও ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু পরে দেশবাসীর অনুরোধে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে তিনি ফের জাতীয় দলে ফিরে আসেন।
 
অবশেষে ২০২১ সালে তাঁর আন্তর্জাতিক ট্রফির দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে। মারাকানায় অনুষ্ঠিত ফাইনালে ব্রাজিলকে পরাজিত করে মেসি আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকা জয়ের পথে এগিয়ে দেন। সমগ্র টুর্নামেন্টে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন; আর্জেন্টিনার করা ১২টি গোলের মধ্যে ৯টিতেই তিনি হয় নিজে গোল করেছিলেন, নয়তো সহায়তা (অ্যাসিস্ট) করেছিলেন।
 
লিওনেল মেসি
 
কিন্তু মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় আসে ২০২২ সালে। কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক ধারাবাহিকভাবে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে ১৯৮৬ সালের পর দেশকে প্রথম বিশ্বকাপ খেতাব জয়ে নেতৃত্ব দেন। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত রোমাঞ্চকর ফাইনালে মেসি দুটি গোল করেন এবং পেনাল্টি শুটআউটে আর্জেন্টিনা ঐতিহাসিক জয় অর্জন করে। তিনি সাতটি গোল ও তিনটি অ্যাসিস্ট করে গোল্ডেন বল লাভ করেন এবং সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে নিজের দাবিকে চিরস্থায়ী করেন।
 
বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির পরিসংখ্যান
 
মোট প্রতিযোগিতা: ৬টি (২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬)
 
মোট ম্যাচ: ৩৪টি
 
মাঠে কাটানো সময়: ৩,০৫৪ মিনিট
 
গোল: ২১টি
 
অ্যাসিস্ট (সহায়তা): ১২টি
 
লিওনেল মেসির এই অবসর শুধু আর্জেন্টিনাতেই নয়, বিশ্বজুড়ে সমগ্র ক্রীড়াজগতেই এক গভীর ও অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করবে। তিনি শুধু একজন খেলোয়াড়ই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ফুটবলের এক জীবন্ত কবিতা। গত দুই দশক ধরে সবুজ মাঠে তিনি যে ফুটবলের জাদু সৃষ্টি করে গিয়েছেন, যে স্বপ্নগুলিকে বাস্তবে পরিণত করে দেখিয়েছেন, তা ফুটবলের ইতিহাসে সোনালি অক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে। জাতীয় দলের ১০ নম্বর জার্সিতে তাঁকে আর দেখা যাবে না, সত্যি; কিন্তু তাঁর সেই অনুপম শৈলী, নম্রতা এবং অদম্য লড়াকু মানসিকতা চিরদিন বিশ্ববাসীর হৃদয়ে এবং ফুটবলের পাতায় অমলিন হয়ে জ্বলজ্বল করবে।


শেহতীয়া খবৰ