চাঁদে ‘মুন বেস’ গড়তে ভারতকে আমন্ত্রণ নাসার, আরও গভীর হচ্ছে ভারত-মার্কিন মহাকাশ সহযোগিতা
নয়াদিল্লি:
চাঁদের মাটিতে দীর্ঘমেয়াদি মানব উপস্থিতির লক্ষ্যে আরও এক ধাপ এগোল ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সহযোগিতা। নাসা ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোকে তার ‘মুন বেস’ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ৫ ও ৬ আগস্ট বেঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত নবম ভারত-মার্কিন অসামরিক মহাকাশ যৌথ কর্মগোষ্ঠীর বৈঠকের পর এই আমন্ত্রণের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, আর্টেমিস অ্যাকর্ডসের আওতায় দুই দেশের অংশীদারিত্বকে আরও এগিয়ে নিয়েই ইসরোকে মুন বেস কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে নাসা। একই সঙ্গে মহাকাশবিজ্ঞান সংক্রান্ত উন্মুক্ত তথ্য আদানপ্রদানের বিষয়ে সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারেও দুই দেশ সম্মত হয়েছে।
নাসার পরিকল্পিত মুন বেস কর্মসূচির লক্ষ্য চাঁদের দক্ষিণ মেরুকে কেন্দ্র করে ধাপে ধাপে দীর্ঘস্থায়ী মানব উপস্থিতির ভিত্তি তৈরি করা। প্রথম পর্যায়ে রোবোটিক অভিযান ও নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষা, পরবর্তী পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি এবং ভবিষ্যতে এমন একটি স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে নভোচারীরা দীর্ঘ সময় অবস্থান করে গবেষণা করতে পারবেন।
এই চন্দ্রঘাঁটি শুধু চাঁদে গবেষণার জন্যই নয়, ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযান এবং আরও দূরবর্তী মহাকাশ অভিযানের প্রস্তুতিকেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ভারতের সাফল্যই এই সহযোগিতায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২৩ সালের চন্দ্রযান-৩ মিশনের বিক্রম ল্যান্ডার চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি সফল অবতরণ করে, যা ভারতকে এই দুর্গম অঞ্চলে বিশেষ অভিজ্ঞতা এনে দেয়। নাসার ভবিষ্যৎ চন্দ্রঘাঁটির পরিকল্পনাও একই অঞ্চলের দিকে কেন্দ্রীভূত।
ফলে চাঁদের দুর্গম এলাকায় অবতরণ, বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ এবং চন্দ্রপৃষ্ঠের পরিবেশ নিয়ে ভারতের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক চন্দ্র অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারত ২০২৩ সালের ২১ জুন আর্টেমিস অ্যাকর্ডসে যোগ দিয়ে ২৭তম স্বাক্ষরকারী দেশ হয়েছিল। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য চাঁদ ও অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও টেকসই অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নীতি তৈরি করা। বর্তমানে ৭০টি দেশ এই চুক্তির অংশ।
তবে আর্টেমিস অ্যাকর্ডসে স্বাক্ষর করলেই নাসার নির্দিষ্ট অভিযানগুলিতে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয় না। সেই জায়গা থেকেই মুন বেস কর্মসূচিতে ইসরোকে সরাসরি আমন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতও মানব মহাকাশ অভিযানের ক্ষেত্রে বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। ইসরোর গগনযান কর্মসূচি, ভবিষ্যতের ভারতীয় মহাকাশ স্টেশন এবং ২০৪০ সালের মধ্যে চাঁদে ভারতীয় নভোচারী পাঠানোর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য—সব মিলিয়ে মুন বেস প্রকল্পে নাসার সঙ্গে সহযোগিতা ভারতের নিজস্ব মহাকাশ কর্মসূচিকেও নতুন অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান দিতে পারে।
এর আগে নাসা-ইসরোর যৌথ নিসার উপগ্রহ অভিযান দুই দেশের মহাকাশ সহযোগিতার একটি বড় উদাহরণ তৈরি করেছে। বেঙ্গালুরুর বৈঠকে ভবিষ্যতের চন্দ্র অভিযান, মানব মহাকাশযাত্রা, মহাকাশবিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
চন্দ্রযান-৩-এর সাফল্যের পর এবার চাঁদের ভবিষ্যৎ ঘাঁটি তৈরির আন্তর্জাতিক পরিকল্পনায় ভারতের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ—বিশ্ব মহাকাশ গবেষণায় ভারতের গুরুত্ব যে দ্রুত বাড়ছে, নাসার এই আমন্ত্রণ তারই বড় ইঙ্গিত।