বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতকে কোনও ট্রানজিট করিডর দেওয়ার উদ্যোগের বিরোধিতা করলেন সে দেশের বিরোধী রাজনৈতিক নেতা নাহিদ ইসলাম। একইসঙ্গে গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তি ন্যায্য শর্তে নবীকরণের দাবি তুললেন তিনি। আগামী ডিসেম্বরেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। তার আগেই এই চুক্তি নিয়ে নতুন করে সরব হলেন বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র আহ্বায়ক।
শুক্রবার ঢাকায় আয়োজিত এক জনসভায় কয়েকশো সমর্থকের উপস্থিতিতে এই মন্তব্য করেন নাহিদ। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর পদত্যাগের দাবিতে মূলত এই সভার আয়োজন করা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে তাঁদের পদত্যাগ দাবি করেন আন্দোলনকারীরা।
সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলেন নাহিদ। তাঁর দাবি, বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতকে ট্রানজিট করিডর দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। বাংলাদেশের জনগণ এমন কোনও ‘অবৈধ করিডর’ মেনে নেবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাহিদ বলেন, জাপান আবারও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে একটি করিডর তৈরির চেষ্টা করছে। সরকার সেই করিডর ভারতের হাতে তুলে দিতে চাইছে। এই ধরনের কোনও উদ্যোগের বিরুদ্ধে ফের আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফরে ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেই সফরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক যোগাযোগ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে বাংলাদেশের কেন্দ্র করে যৌথ সমৃদ্ধির অঞ্চলে পরিণত করার বিষয়েও দুই দেশ একমত হয়।
এছাড়া, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। জাপানের বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগাযোগ পরিকল্পনায় এই বন্দরকে কেন্দ্র করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে শিল্প ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ গড়ে তোলার ভাবনাও রয়েছে।
তবে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির শুক্রবার জানিয়েছেন, তারেক রহমানের জাপান সফরে কোনও তৃতীয় দেশকে নিয়ে আলোচনা হয়নি। তাঁর বক্তব্য, সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা। অন্য কোনও দেশকে নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন হলে সেই দেশের প্রতিনিধিদেরও বৈঠকে উপস্থিত থাকতে হবে।
এদিকে, ২৮ অক্টোবর ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, জাপানের সঙ্গে ভারতের অংশীদারিত্ব আরও মজবুত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রকল্পও রয়েছে। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে আঞ্চলিক যোগাযোগ নিয়ে সমঝোতার পর ভারতের এই মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নাহিদের বক্তব্যে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে—গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তি। আগামী ১২ ডিসেম্বর এই চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নাহিদের হুঁশিয়ারি, বাংলাদেশের স্বার্থ ও ন্যায্য জলপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিয়ে চুক্তি নবীকরণ না হলে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামবে। বিডিনিউজ২৪-কে তিনি বলেন, গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তিতে বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার থেকে এবার এক ইঞ্চিও ছাড় দেওয়া হবে না।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা ব্যারাজে শুষ্ক মরসুমে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত গঙ্গার জল দুই দেশের মধ্যে কীভাবে ভাগ হবে, তা এই চুক্তিতে নির্ধারিত রয়েছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি নতুন বা সংশোধিত চুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে। বিশেষ করে শুষ্ক মরসুমে গঙ্গার জলে বাংলাদেশের প্রাপ্য অংশ নিশ্চিত করতে চুক্তিতে সুরক্ষামূলক শর্ত রাখার দাবি রয়েছে ঢাকার।
অন্যদিকে, ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, জলবণ্টন-সহ দুই দেশের মধ্যে প্রবাহিত ৫৪টি অভিন্ন নদী সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে আলোচনা করা হয়। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত সেপ্টেম্বরেও জানিয়েছিলেন, গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তি নিয়ে প্রযুক্তিগত স্তরে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের উদ্যোগে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠিত হয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন এই দলের নেতারা। এবার ভারত-বাংলাদেশের ট্রানজিট ও গঙ্গার জলবণ্টন ইস্যুতে নাহিদ ইসলামের মন্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।