নয়াদিল্লি
উন্নত ভারত ও মিশন ২০৪৭–এর ভাবনাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত মুসলিম মহিলা মেধাবী সম্মেলন সাধারণ কোনও সেমিনারের গণ্ডি ছাড়িয়ে পরিণত হয় ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র, সমাজ ও নতুন প্রজন্ম নিয়ে গভীর আত্মবিশ্লেষণ ও সংলাপের এক অনন্য মঞ্চে। নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রায় একশো জন শিক্ষিত, সচেতন ও আত্মবিশ্বাসী মুসলিম নারী, ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সমাজকর্মীরা, তাদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন এবং জাতি গঠনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন আরএসএস–এর জাতীয় কার্যকরী সদস্য ও মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চের পৃষ্ঠপোষক ড. ইন্দ্রেশ কুমার। উপস্থিত ছিলেন আরও বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, শিক্ষামন্ত্রকের এনসিএমইআই–এর নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. শাহিদ আখতার, জামিয়া হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কর্নেল তাহির মুস্তাফা, প্রবীণ সাংবাদিক নাগমা সাহার, সমাজকর্মী ড. শালিনি আলি, ওয়াক্ফ বোর্ড সদস্য সাবিহা নাজ, ড. শায়েস্তা ও ড. আসরা আখতার। তাঁদের অংশগ্রহণ আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
মুসলিম মহিলা মেধাবী সম্মেলন
সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে ড. ইন্দ্রেশ কুমার স্পষ্ট বার্তা দেন, “ভারতের মুসলিমরা ভাড়াটে নন, এই ভূমিরই প্রকৃত মালিক।” তিনি বলেন, ১৯৪৭–এর পরে যারা ভারতকে নিজেদের দেশেরূপে বেছে নিয়েছিলেন, তারা তখনও ভারতীয় ছিলেন, আজও ভারতীয়, ভবিষ্যতেও ভারতীয়ই থাকবেন। ভারতের সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্পর্ক শুধুই বসবাসের নয়, এটি ভালোবাসা, দায়িত্ব ও আত্মীয়তার বন্ধন। তিনি স্বীকার করেন, বিভাজন সৃষ্টিকারী কিছু শক্তি সমাজে রয়েছে, কিন্তু “অল্প সংখ্যকের বিভেদমূলক আচরণকে কখনোই দেশের প্রধান স্রোত বলা যায় না।”
ড. কুমারের জোর দেওয়া বার্তা, “আমাদের মনোযোগ হতে হবে সন্তানদের দিকে, তাদের ভবিষ্যতের দিকে, এবং দেশের আগামী দিনের দিকে।”
শিক্ষাই উন্নত ভারতের প্রধান ভিত্তি- নারী তার সর্বশক্তিমান স্তম্ভ
নারীর ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারতের ভাগ্য নির্ভর করে শিশুদের শিক্ষার ওপর, আর সেই শিক্ষার মূল ভিত্তি নারীরা। তাই ছেলেমেয়েদের মধ্যে সমান সুযোগ ও সমান মর্যাদা দেওয়া জরুরি। প্রয়োজন হলে পরিবারের ব্যক্তিগত আরাম–আয়েশ কমিয়ে হলেও শিক্ষা অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর কথায়, ধর্মীয় শিক্ষা মানুষকে মানবিকতা, নৈতিকতা ও ভ্রাতৃত্ব শেখায়; আর আধুনিক secular শিক্ষা দক্ষতা ও কাজের সামর্থ্য তৈরি করে যা জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ক্ষমতা অনুযায়ী সৎ অবদানই উন্নত ভারতের নিশ্চয়তা।
নাগমা সাহার: “শিক্ষার কোনও বিকল্প নেই- মেধাই উন্নতির মাপকাঠি”
সাংবাদিক নাগমা সাহার বলেন, শিক্ষাই জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি। তিনি লক্ষ্য করেছেন, আজ অনেক ক্ষেত্রেই মুসলিম নারীরা অধ্যবসায় ও নিষ্ঠায় পুরুষদের ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। উচ্চশিক্ষিত নারীদের বিয়ের সুযোগ কমে যাওয়ার যে ভীতি সমাজে রয়েছে, সে ধারণাকে তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। “সমাধান হলো আরও পড়াশোনা, শিক্ষাকে কমানো নয়,” বলেন তিনি। ধর্ম নয়, প্রকৃত মাপকাঠি হবে যোগ্যতা।
ড. ইন্দ্রেশ কুমার
ড. শালিনি আলি: “নারী জন্মগতভাবেই বহুমুখী শক্তির অধিকারী”
সমাজকর্মী ড. শালিনি আলি বলেন, নারীরা জন্মগতভাবে অসামান্য শক্তিসম্পন্ন। মেয়েরূপে তারা মূল্যবোধ গ্রহণ করে, শিক্ষার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়, মায়েরূপে সন্তানের প্রথম শিক্ষক হয়ে ওঠে, এবং পরিবারের ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই হয়ে ওঠে দক্ষ ব্যবস্থাপক, হিসাবরক্ষক ও পথপ্রদর্শক। শক্তিশালী শিক্ষা পেলে এই নারীরাই সমাজ ও দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি, ঘৃণা ও হিংসা–উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়ানোর প্রবণতাকে বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেন। নারীদের তিনি আহ্বান জানান, অপ্রমাণিত তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে উদ্যোগী হতে।
সাবিহা নাজ: “শিক্ষাই প্রকৃত স্বনির্ভরতার ভিত্তি”
ওয়াক্ফ বোর্ড সদস্য সাবিহা নাজ বলেন, সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার ও সচেতনতার প্রসার এখন জরুরি। শিক্ষা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক ক্ষমতায়নের প্রধান পথ, এবং প্রকৃত স্বনির্ভরতার মজবুত ভিত্তি।
সম্মেলনের সারবত্তা
সম্মেলন শেষ হয় শিক্ষা, দেশপ্রেম, সামাজিক সম্প্রীতি ও নারীর ক্ষমতায়নকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী, অনুপ্রেরণাদায়ী বার্তার মধ্য দিয়ে। একথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ভারতের উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণে মুসলিম নারীরা দায়িত্ব, আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগোতে প্রস্তুত।