সোনার সূতায় গাঁথা বারাণসীর জারডোজি এমব্রয়ডারির গাঁথা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 h ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
মুজিব আল-রহমান

বিশ্বের প্রাচীনতম এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে জনবসতিপূর্ণ নগরীগুলোর অন্যতম বারাণসীর অন্তরে লুকিয়ে আছে এক বিরল ও অনন্য শিল্পধারা, যেখানে নিখুঁততা, ধৈর্য ও সৌন্দর্য মিলেমিশে জন্ম দেয় এক চিরকালীন শিল্পরূপ। সোনা ও রুপোর সূতো দিয়ে কাপড়ে বোনা এই জারদৌজি সূচিকর্ম শুধু অলঙ্করণ নয়, বরং এক জীবন্ত ঐতিহ্য, যেখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং স্মৃতিরা সুতোয় সুতোয় গাঁথা হয়ে থাকে।
 
এ শুধু অলঙ্করণ নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্মৃতির এক জীবন্ত ভাষা। জারদৌজি সূচিকর্ম যেন বারাণসীর আত্মারই প্রতিচ্ছবি, এক এমন শহর, যা যুগ যুগ ধরে আধ্যাত্মিকতা, নন্দনচেতন ও মানব সৃজনশীলতাকে একত্রে ধারণ করে এসেছে। এই শিল্প সময়ের গতিতে বিলীন হয় না; রাজপ্রাসাদের জাঁকজমক থেকে সরু গলির উষ্ণতা পর্যন্ত, সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্য থেকে স্থানীয় ঐতিহ্যের মাটিমাখা স্মৃতি পর্যন্ত, সময়কে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলে।
 

জারদৌজির শিকড় প্রাচীন ভারতে, তবে এর সোনালি যুগ শুরু হয় মোগল আমলে। বিশেষত আকবর মহান (১৫৪২–১৬০৫)–এর পৃষ্ঠপোষকতায়। ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও কারুশিল্পকে তিনি রাজকীয় মর্যাদা দিয়েছিলেন, আর জারদৌজিকে রূপান্তরিত করেছিলেন রাজকীয় কৌশলে। পারস্য ও মধ্য এশিয়া থেকে দক্ষ কারিগরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি বারাণসী, দিল্লি ও লাহোরে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে স্থানীয় শিল্পীরা এই শিল্পে দক্ষ হয়ে ওঠে।
 
সময়ের প্রবাহে পারস্যের নকশা ভারতীয় নান্দনিকতার সঙ্গে মিশে সৃষ্টি করেছিল এক অনন্য শৈলী, যার পরিচয় ভারতীয় হলেও আত্মা ছিল বিশ্বজনীন। সেই থেকেই বেনারস হয়ে ওঠে জারদৌজির প্রধান কেন্দ্র, যেখানে রাজকীয় ঐতিহ্য ও স্থানীয় সংবেদনশীলতার মিলনে শিল্পটি পৌঁছে যায় নতুন উচ্চতায়।
 
তখন জারদৌজিকে বলা হতো, "রাজকীয় মহিমার ভাষা"। রাজাদের পোশাক, দরবারের পর্দা, সিংহাসনের কুশন কিংবা আনুষ্ঠানিক বস্ত্র, সবই সোনা-রুপোর সূতোয় সজ্জিত হতো। এসব শোভা শুধু চোখ ধাঁধিয়ে দিত না, বরং ক্ষমতা, মর্যাদা ও ঐশ্বর্যের প্রতীক হয়ে উঠত। পরে এই শিল্প প্রাসাদের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় সাধারণ ঘর, পাড়া ও কারুশালায়, যেখানে আজও এটি অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
 
প্রতীকী ছবি
 
জারদৌজির কৌশল হলো কঠোর অনুশীলন ও ভক্তির এক রূপ। প্রথমে কয়লার সাহায্যে নকশা অঙ্কন করা হয় কাপড়ে। তারপর কাপড়টি টানটান করে বাঁধা হয় আড্ডা নামে পরিচিত কাঠের ফ্রেমে। সোনা বা রুপোর সূতো- যা সাধারণত তামার সুতোয় সোনা বা রুপোর প্রলেপ দিয়ে তৈরি, আরী নামে সূক্ষ্ম বঁচি দিয়ে কাপড়ে বসানো হয়। কারিগররা ফ্রেম ঘিরে বসেন, প্রত্যেকে কাজ করেন নকশার আলাদা অংশে। বাইরের দিক থেকে ভেতরের দিকে এগোতে এগোতে নকশা ভরে ওঠে রঙিন সূতা, পাথর, মুক্তা আর কখনো সূক্ষ্ম আয়নায়। এই প্রক্রিয়ায় লাগে দক্ষতা, লয়, ধৈর্য আর কল্পনার অদ্ভুত মিশ্রণ। প্রতিটি সুতোর বিনুনি যেন হয়ে ওঠে বারাণসীর রাস্তাঘাটের রূপের নিবিড় টুকরো।
 
রেশম, ভেলভেট, ভেল্যোর এই সব বিলাসী কাপড়ই জারদৌজির জন্য বেছে নেওয়া হয়। তাতে জুড়ে দেওয়া হয় মূল্যবান পাথর ও মুক্তা, যা সৃষ্টিকে জীবন্ত করে তোলে। কাপড় তখন শুধু কাপড় থাকে না, চলমান শিল্পকর্মে পরিণত হয়। মদনপুরা, লালাবুড়ার মতো পুরোনো পাড়ায় আজও ভেসে আসে সূতার ছন্দময় শব্দ, যে শব্দ পিতা থেকে পুত্রে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত। এখানে জারদৌজি শুধু জীবিকার উপায় নয়-এ এক পরিচয়, এক ঐতিহ্য-রক্ষার প্রতিশ্রুতি, এক সাধনা।
 
প্রতীকী অর্থে জারদৌজি বিলাসিতা, সম্মান এবং আধ্যাত্মিকতার মিলন। ভারতীয় সংস্কৃতিতে সোনা বিশুদ্ধতা, শাশ্বততা ও সমৃদ্ধির প্রতীক, তাই ধর্মীয় আচার ও বিবাহে জারদৌজি বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। নববধূর পোশাকে বোনা সোনালি সুতো যেন সৌন্দর্য, পবিত্রতা ও শুভকামনার আশীর্বাদ হয়ে ওঠে। ইসলামি শিল্পেও জারদৌজি জ্যামিতিক নকশা ও উদ্ভিদমূর্তির মাধ্যমে প্রকাশ করে অসীমতা ও সম্প্রীতির ধারণা; সৌন্দর্যকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যায়, যা দৃশ্যমানতার বাইরে গিয়ে গভীর অর্থ বহন করে।
 

ঐতিহাসিকভাবে এই শিল্প উত্থান-পতন উভয়ই দেখেছে। ব্রিটিশ আমলে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা হ্রাস পাওয়ায় শিল্পটি প্রায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। তবু হারিয়ে যায়নি। বিংশ শতাব্দীতে ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রের প্রতি বিশ্বব্যাপী আগ্রহের ফলে জারদৌজি আবার প্রাণ ফিরে পায়। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কারুশিল্প সংগঠনগুলো প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করে, তরুণ-তরুণীদের এই শিল্প শেখায় এবং এটিকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করে।
 
আজ বেনারস (বর্তমান বারাণসী), বিশ্বের জারদৌজি রাজধানী হিসেবে পরিচিত। এখানকার শিল্প ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকায় রপ্তানি হয়; আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে ভারতের নন্দনশৈলী ও কারুকার্যের গৌরব বহন করে।
 
যন্ত্রের আধুনিক যুগেও জারদৌজি তার হস্তনির্মিত আত্মাকে রক্ষা করে চলেছে। এক অভিজ্ঞ শিল্পীর কথাতেই এর সারমর্ম প্রকাশ পায়, “জারদৌজি কাজ নয়, এ এক প্রার্থনা; প্রতিটি সুতোর সঙ্গে আমরা পড়ি আমাদের পূর্বপুরুষদের গল্প।” এই ভাবনাই জারদৌজিকে অতীত ও বর্তমানের সেতুবন্ধনে পরিণত করেছে, যেখানে দক্ষতা মিশে যায় প্রেরণায়, আর শিল্প ছুঁয়ে যায় মানুষের আত্মাকে।
 
অর্থনৈতিক দিক থেকেও জারদৌজি বারাণসীর জীবনরেখা। হাজার হাজার কারিগর, অধিকাংশই প্রজন্মধারী পরিবার, এই শিল্পে যুক্ত। বছরে এখানকার সূচিকর্ম শিল্পের মূল্য ৪০০ কোটিরও বেশি বলে অনুমান করা হয়, যার বড় অংশই আসে রপ্তানি থেকে। ভারতের মোট সূচিকর্ম উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি আসে এখান থেকে, আর শহরের হস্তশিল্প আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই জারদৌজিভিত্তিক।
 
কিন্তু এর গুরুত্ব শুধু সংখ্যায় মাপা যায় না। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের উৎসব, বিবাহ, ধর্মীয় আচার, সবেতেই জারদৌজি সমানভাবে ব্যবহৃত হয়। এটি শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বুননের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ছোট কারখানায় জ্ঞান ভাগাভাগি হয়, ঐতিহ্য অর্পণ করা হয় শিশুর হাতে। বারাণসীতে জারদৌজি কেবল কারুশিল্প নয়, এ এক জীবনধারা। যা প্রজন্মকে যুক্ত করে, ভারতীয় সংস্কৃতির ঐক্যকে প্রতিফলিত করে এবং এই শহরের আধ্যাত্মিকতা, সৌন্দর্য ও সৃজনশীলতার গভীর আবেগকে প্রকাশ করে।