আওয়াজ-দ্য ভয়েস ব্যুরো
বরফে ঢাকা পাহাড়, নীল রঙের হ্রদ আর মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য কাশ্মীরকে পৃথিবীর ‘ভূ-স্বর্গ’ বলা হয়। কিন্তু এই অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালে আজ বহু কাশ্মীরির মন ভরে উঠছে এক অজানা অশান্তিতে। সৌন্দর্যের আধার কাশ্মীরে মানুষের মনে এখন যেন শুধু নীরব উদ্বেগের ঢেউ…।
এই প্রকৃতির স্বর্গরাজ্যে দিন দিন বাড়ছে হতাশা (Depression) এবং অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা ওভারথিঙ্কিং (Overthinking)-এর সমস্যা, যা ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এই গুরুতর বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনপ্রিয় মনোবিজ্ঞানী জাসিন্ধা মীর। তাঁর মতে, বাইরের দৃশ্য যতই সুন্দর হোক না কেন, যদি মানুষের ভেতরের মন অশান্ত থাকে, তবে সেই জীবন কখনও সুখের হতে পারে না।
মনোবিজ্ঞানীর কাছে যাওয়া মানেই যে কেউ মানসিক রোগী—এমনটা নয়। কাশ্মীরের জনপ্রিয় মনোবিজ্ঞানী জাসিন্ধা মীরের মতে, জীবনের যেকোনো সময়ে, যেকোনো মানুষের মানসিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।
শ্রীনগরের বাসিন্দা জাসিন্ধা মীর কাশ্মীরে দিন দিন বেড়ে চলা হতাশা (Depression) ও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা ওভারথিঙ্কিং (Overthinking)-এর প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বিশেষ করে যুবসমাজ এই সমস্যার দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হচ্ছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন—মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা, শিক্ষাগত চাপ, বেকারত্বের সমস্যা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। তিনি সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার ও সামাজিক লজ্জা বা স্টিগমা দূর করার আহ্বান জানান এবং সময়মতো বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়ার উপর জোর দেন।
মনোবিজ্ঞানী জাসিন্ধা মীর স্পষ্ট করে বলেন, কাউন্সেলিং গ্রহণ করা মানেই কেউ ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’—এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বিষয়টি বোঝাতে তিনি একটি সুন্দর উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “যেমন একটি ফ্রেমের ভেতরে থাকা মানুষ পুরো ছবিটি দেখতে পারে না, ঠিক তেমনই একজন ব্যক্তি নিজের জীবনের সমস্যাগুলিকে নিরপেক্ষভাবে বিচার করতে পারে না।” সেই কারণেই একজন বাইরের বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন হয়, আর এটাই একজন কাউন্সেলরের আসল ভূমিকা।
মনোবিজ্ঞানী জাসিন্ধা মীর
তিনি আরও বলেন, সাধারণত মহিলারা নিজেদের আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন, কিন্তু অনেক পুরুষই সমাজের চাপে নিজেদের অনুভূতি চেপে রাখেন। এর ফলে তাদের উপর মানসিক চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকে, যা পরবর্তীতে মানসিক সমস্যার পাশাপাশি শারীরিক অসুস্থতারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
জাসিন্ধা মীরের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং পেশাদার সহায়তা গ্রহণই হতে পারে এই নীরব সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে কার্যকর পথ।
যুবসমাজের মধ্যে হতাশার একটি বড় কারণ হলো প্রেমের বিচ্ছেদ। বিশেষজ্ঞের মতে, সম্পর্ক জীবনের একটি অংশ মাত্র, পুরো জীবন নয়। জীবনের অন্যান্য দিকগুলোর মধ্যেও ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কোনো ব্যক্তি যদি একটি মাত্র সম্পর্কের মধ্যে নিজের সব আবেগিক শক্তি বিনিয়োগ করে, তবে সেই সম্পর্ক ভেঙে গেলে তা গুরুতর মানসিক সমস্যার জন্ম দিতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, লাগাতার নেতিবাচক বিষয়বস্তু দেখলে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। তিনি সোশ্যাল মিডিয়াকে ‘মনের খাদ্য’-এর সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর কথায়, সোশ্যাল মিডিয়া মনের জন্য খাবারের মতো—যেমন আমরা যা খাই তার প্রভাব শরীরে পড়ে, তেমনই আমরা যা দেখি ও গ্রহণ করি তার প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলনা করার প্রবণতা এবং আসক্তি উদ্বেগ ও হতাশার মাত্রা বাড়িয়ে তোলে।
তিনি আরও জানান, শিশু, কিশোর, প্রাপ্তবয়স্ক ও বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষই হতাশায় ভুগতে পারেন। তবে জীবনের প্রতিটি স্তরে হতাশার কারণ আলাদা আলাদা হয়ে থাকে। যদি কোনো মানসিক লক্ষণ ১৪ দিনের বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়, তাহলে দেরি না করে অবশ্যই একজন মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। এ ধরনের সমস্যা আপনাআপনি সেরে যায় না, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও জটিল আকার ধারণ করে।
শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার হতাশার কারণ ভিন্ন হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অস্বস্তি থাকলে তা অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
মনোবিজ্ঞানী জাসিন্ধা মীর
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পরিবার ও শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পারিবারিক কলহ শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। শিক্ষকরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিশুর আচরণ ও পড়াশোনার পারফরম্যান্সে যে পরিবর্তন আসে, তা সহজেই শনাক্ত করতে পারেন এবং সে বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক করতে পারেন।
তিনি একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেন, যেখানে মানসিক চিকিৎসার মাধ্যমে এক নারীর সঙ্গে তাঁর শাশুড়ির সম্পর্ক সম্পূর্ণ বদলে যায়—ঘৃণা পরিণত হয় বন্ধুত্বে। এই উদাহরণ থেকে স্পষ্ট হয় যে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা একজন মানুষের জীবন আমূল পরিবর্তন করতে পারে।
ধর্ম ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ধর্মীয় আচার-অনুশীলন যদি সঠিকভাবে গ্রহণ করা যায়, তবে তা হতাশা মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। তবে কেবল আধ্যাত্মিক চর্চার ওপর নির্ভর করে যদি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপেক্ষা করা হয়, তাহলে তা ক্ষতিকর হতে পারে।
সবশেষে বিশেষজ্ঞটি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। মানসিক চিকিৎসা শুধু কথাবার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং চিকিৎসার মাধ্যমে দেওয়া নির্দেশনা ও পরামর্শগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করলেই একজন মানুষ একটি সুন্দর, সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারেন।