ভারতসহ বিশ্বের সকল মুসলমানের জন্য মক্কা–মদিনার পবিত্র হজযাত্রা ঘিরে এসেছে এক বড়ো স্বস্তির বার্তা। সৌদি আরব জানিয়েছে যে ২০২৬ সালের হজের ভিসা কার্যক্রম এবার অস্বাভাবিকভাবে অনেক আগেই শুরু করা হবে। হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হিজরি ১৪৪৭, অর্থাৎ ২০২৬ সালের হজের ভিসা ইস্যু ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকেই শুরু হবে। সাম্প্রতিক সময়ে হজ ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে দ্রুত ও আগাম উদ্যোগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হজ ব্যবস্থাপনাকে আরও নিরাপদ, দক্ষ ও স্বচ্ছ করতে সরকারের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষমানুষের আগমনের কারণে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, আবাসন ও পরিবহনের আগাম পরিকল্পনা, এবং অবৈধ বা নিবন্ধনবিহীনভাবে হজে পৌঁছানো ব্যক্তিদের রোধ করার লক্ষ্যেই প্রক্রিয়াটি এত আগে শুরু করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের মতে, ভিসা প্রক্রিয়া কয়েক মাস আগেই খুলে দিলে শুধুমাত্র নিবন্ধিত ও অনুমোদিত যাত্রীরাই সৌদি আরবে প্রবেশ করতে পারবেন, ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও প্রশাসনিক জটিলতা অনেকটাই কমবে।
হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় আরও জানায় যে হজ ২০২৬-এর প্রস্তুতি আসলে ৮ জুন ২০২৫ থেকেই শুরু হয়েছে, যা ছিল ইসলামী ক্যালেন্ডারের ১২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৬ হিজরি। সে দিনই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হজ অফিসগুলোকে প্রাথমিক পরিকল্পনার নথি পাঠানো হয়, যাতে প্রত্যেক দেশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা সময়মতো নিজেদের প্রস্তুতি শুরু করতে পারে।
সম্পূর্ণ প্রস্তুতি একটি সুসংগঠিত অপারেশনাল ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এগোচ্ছে। প্রথম ধাপে “নুসুক মসার” নামের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পবিত্র স্থানে থাকা ক্যাম্প ও সুবিধাগুলোর বিস্তারিত তথ্য বিশ্বব্যাপী হজ অফিসগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এতে প্রতিটি দেশকে পরিকল্পনা, পর্যালোচনা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য অতিরিক্ত সময়ও পাওয়া গেছে।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আবাসন ও অন্যান্য প্রধান সেবা সংক্রান্ত প্রাথমিক চুক্তি ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৭ হিজরি থেকে শুরু হবে। ১২ অক্টোবর ২০২৫-এর মধ্যে সব প্রাথমিক বৈঠক শেষ করা, অপারেশনাল ডেটা চূড়ান্ত করা এবং অংশগ্রহণকারী দেশগুলিতে হজযাত্রীদের নিবন্ধন খোলা বাধ্যতামূলক হবে। কোনো পর্যায়ে দেরি না হয় তা নিশ্চিত করতেই এই সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে।
সৌদি আরবের হজ ভিসা এত আগেই দেওয়ার সিদ্ধান্ত গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া শিক্ষা প্রতিফলিত করে। দেরিতে আবেদন, নিবন্ধনহীন যাত্রীদের আগমন এবং অননুমোদিত ট্যুর অপারেটরদের কারণে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এসব জটিলতা এড়াতেই এবার ভিসা উইন্ডো আগেভাগে চালু করা হচ্ছে, যাতে হজযাত্রী, ট্রাভেল অপারেটর ও বিদেশি সরকারগুলো কাগজপত্র, যাতায়াত পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য অনুমোদনের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য যথেষ্ট সময় পায়।
প্রতীকী ছবি
হজ ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের একটি, এবং যার আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য আছে তার জীবনে অন্তত একবার হজ আদায় করা ফরজ। প্রতিবছর লাখ লাখ মুসলমান মক্কায় সমবেত হন, ফলে এত বড় ভিড় পরিচালনা করা সৌদি আরবের জন্য জাতীয় পরিকল্পনা, জননিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে কোভিড–১৯-এর পর হজ ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় আবারও বৈধ পারমিট ছাড়া হজ করার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কতা দিয়েছে। তাদের দাবি, অনুমোদনহীন যাত্রীরা অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জটিল করে তোলেন। আগেভাগে ভিসা উইন্ডো খুলে দিলে দেশগুলো ও অনুমোদিত ট্যুর অপারেটররা কোটা, আবাসন চুক্তি এবং যাত্রার সময়সূচি ঠিক করার সুযোগ আগেভাগেই পাবে।
যাত্রীদের জন্যও এটি অত্যন্ত লাভজনক হতে পারে। আগেই পরিকল্পনা তৈরি হওয়ায় যাত্রা আরও পূর্বানুমেয় হবে, বিমান ও হোটেল বুকিং আগেভাগে করার ফলে খরচ কমতে পারে, এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষও টিকাকরণ ও অন্যান্য চিকিৎসাগত প্রয়োজনীয়তা আরোপ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবে, যা হজ প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হজ ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দ্রুত স্থানান্তরিত হচ্ছে। ভিসা আবেদন থেকে শুরু করে আবাসন বরাদ্দ পর্যন্ত সব ধাপই এখন ডিজিটাল সিস্টেমে যুক্ত। হজ ২০২৬-এর আগাম ভিসা প্রক্রিয়া এ সব ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয়ে কাজ করবে, ফলে যাত্রীদের তথ্য রিয়েল-টাইমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাবে।
মন্ত্রণালয় পরিষ্কার জানিয়েছে যে ভিসা শুধুমাত্র অধিকৃত চ্যানেল এবং স্বীকৃত জাতীয় হজ মিশন-এর মাধ্যমে ইস্যু করা হবে। উদ্দেশ্য হলো প্রতারণা ও অবৈধ এজেন্টদের দৌরাত্ম্য কমানো, যারা বিগত বছরগুলোতে বহু যাত্রীকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নিয়ম ভঙ্গকারী ট্যুর অপারেটরদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানা থেকে শুরু করে ব্ল্যাকলিস্ট করার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
প্রতীকী ছবি
দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার মতো প্রধান যাত্রীপ্রেরণকারী অঞ্চলের জন্য ভিসা প্রক্রিয়ার আগাম সূচনা মানে পরিকল্পনা চক্রও অনেক আগেই শুরু হবে। এতে প্রতিটি দেশ তাদের জাতীয় হজ নীতি যথাসময়ে ঘোষণা করতে পারবে।
এই উদ্যোগ সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি ভিশন ২০৩০-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার লক্ষ্য উন্নত অবকাঠামো, আধুনিক প্রযুক্তি ও উচ্চমানের সেবার মাধ্যমে হজ অভিজ্ঞতাকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করা। মন্ত্রণালয়ের মতে, আগাম পরিকল্পনা ও সময়মতো প্রস্তুতি নিরাপদ, সুসংগঠিত ও মর্যাদাপূর্ণ হজ নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৮ এপ্রিল ২০২৬ (১ জ্বিলক্বদ ১৪৪৭ হিজরি) থেকে প্রথম হজযাত্রীদের সৌদি আরবে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে। এর আগে অবকাঠামো, আবাসন, পরিবহন এবং সব জরুরি সেবা সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে রাখা হবে। ইতিমধ্যে প্রায় ৭.৫ লাখ হজযাত্রীর নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে এবং নুসুক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বেশিরভাগ চুক্তিও চূড়ান্ত করা হয়েছে।
শেষে মন্ত্রণালয় সব হজ অফিস ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত সময়সূচি কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, “শুরু থেকেই সুসংগঠিত পরিকল্পনাই একটি নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও মর্যাদাপূর্ণ হজযাত্রার প্রকৃত চাবিকাঠি।”