ঢাকা
১৮ মাস আগে যুবনেতৃত্বাধীন অভূতপূর্ব আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতন, এরপর পুরো দেশ জুড়ে অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা আর উত্তাল রাজনীতি। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়সীমা এখন শেষের পথে, আর সেই পরিণত মুহূর্তেই ১৭৫ মিলিয়ন মানুষের রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রবেশ করছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট শুধু নতুন সরকারই বেছে দেবে না, বরং নির্ধারণ করবে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক সংস্কারের দিকনির্দেশনা এবং দীর্ঘ অস্থিরতার পর দেশের পুনর্গঠনের পথচলা।
মূল প্রতিযোগিতা বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি নেতৃত্বাধীন ‘সমমনা ১১ দল’ জোটের মধ্যে। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ বর্তমানে স্থগিত এবং নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ। বিভিন্ন জনমত জরিপে বিএনপিকে এগিয়ে দেখা গেলেও, ভোটারদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে আরও বহু গভীর সংকট।
নির্বাচনের প্রধান ইস্যুগুলো হলো:
শেখ হাসিনা ইস্যু
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে দিল্লিতে নির্বাসনে, আর তাঁর আওয়ামী লীগকে এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। হাসিনার দাবি, এতে লক্ষ লক্ষ সমর্থক প্রতিনিধি বঞ্চিত হচ্ছেন এবং অনেকে ভোট বর্জনের দিকে ঝুঁকবেন। বিএনপি হাসিনার প্রত্যর্পণকে তাদের মূল প্রচার ইস্যু করেছে। তাদের মতে, ভারতে তাঁর আশ্রয় বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়া ও সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করছে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘দ্য উইক’-কে বলেন, “হাসিনা একটা সঙ্কট তৈরি করেছেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তিনি প্রাসঙ্গিক থাকবেন না। তিনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছিলেন।” তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, বড় ধরনের কোনও ভোট বর্জন হবে না। সাম্প্রতিক এক জরিপ জানায়, সাবেক আওয়ামী লীগ সমর্থকদের প্রায় অর্ধেক এখন বিএনপির দিকে, আর প্রায় ৩০ শতাংশের পছন্দ জামায়াত।
দুর্নীতি
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP)-এর প্রতিবেদনে ভোটাররা জানিয়েছেন, তারা আইনের শাসন, নাগরিক স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব ফিরে পেতে চান। তবে অনেকে উদ্বিগ্ন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নারী ও সংখ্যালঘুদের প্রান্তিকীকরণ এবং ধর্মীয় উগ্রতার প্রসার নিয়ে।
ধাক্কা খাওয়া অর্থনীতির মাঝেও জরিপগুলোতে দুর্নীতিকে ভোটারদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই নিচের দিকে। বিএনপি এবং জামায়াত উভয়ই নির্বাচনী প্রচারে দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিশেষ করে জামায়াতের ‘স্বচ্ছ’ ভাবমূর্তি তাদের পুনরুত্থানে সাহায্য করছে বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।
প্রতীকী ছবি
অর্থনীতি
এশিয়ার দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি ছিল বাংলাদেশ। কোভিড-১৯ মহামারিতে রপ্তানিনির্ভর গার্মেন্টস খাত ধাক্কা খায়, আর ২০২৪ সালের বিক্ষোভ–অস্থিরতা অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে। ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ধসে পড়া অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীল করলেও, নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে।
২০২৬ সালে আইএমএফ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪.৯% হবে বলে অনুমান করেছে, যা ২০২৫ সালের ৩.৭% থেকে সামান্য বেশি। দেশের নামমাত্র জিডিপি ২০২৬ সালে দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫১৯ বিলিয়ন ডলার।
কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি
দেশজুড়ে উচ্চ মূল্যের চাপ এখনও তীব্র, ২০২৬ সালে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ৮.৭%। খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবন চাপে। জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৫৮%। এক জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার দামের বিষয়টিকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন।
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের প্রধান চালিকা শক্তি ছিল কর্মসংস্থান ও সরকারি চাকরির কোটাব্যবস্থার সংস্কার। দেশে প্রায় ৪০% মানুষ ৩০ বছরের নিচে, তাই বিপুল সংখ্যক তরুণ ভোটার চাকরির নিশ্চয়তা চান।বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, নির্বাচিত হলে প্রথম ১৮ মাসে ১ থেকে ১.৫ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। জামায়াত দক্ষতা উন্নয়ন ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
প্রতীকী ছবি
হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা
হাসিনা সরকারের সময়ের ‘নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন’ ও বিরোধী দমনই ছিল ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের বিস্ফোরণের বড় কারণ। তাঁর পতনের পর হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশে ৯০% মুসলিম এবং প্রায় ১.৩ কোটি হিন্দু। বিএনপি ও জামায়াতের সংখ্যালঘুবিরোধী অতীতের কারণে হিন্দুদের মধ্যে ভয় বেড়েছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো জানায়।
গত ১৮ মাসে হিন্দুদের ওপর প্রায় ২,৭০০ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, সম্প্রদায়নেতাদের এমন দাবি। ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ এবং ‘বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’-এর তথ্যানুযায়ী অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন।
নারীর প্রতিনিধিত্ব
দশকের পর দশক নারী নেতৃত্বে পরিচালিত বাংলাদেশ, খালেদা জিয়ার দুই মেয়াদ, শেখ হাসিনার চার মেয়াদ। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। খালেদা জিয়া মারা গেছেন নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে, আর হাসিনা নির্বাসনে এবং তাঁর দল নির্বাচনবঞ্চিত।
এই নির্বাচনে নারী প্রার্থী কম, যা হতাশ করেছে নারী-অংশগ্রহণে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণীদের। অর্থনীতি শিক্ষার্থী ওয়াসিমা বিনতে হুসাইন AP-কে বলেন, নতুন রাজনৈতিক পরিবেশে নারীদের জন্য আরও সুযোগ তৈরি হবে ভেবেছিলেন, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
বাংলাদেশের নারী ভোটার (ফাইল)
ইসলামপন্থীদের উত্থান
হাসিনার পতনের পর জামায়াতে ইসলামী আবারও জনসমর্থন পাচ্ছে, এটা অনেক ভোটারের উদ্বেগের কারণ। দলটির কিছু নেতার নারীর ভূমিকা নিয়ে রক্ষণশীল মন্তব্য নারীদের মাঝে ভয় বাড়িয়েছে। ২২ বছর বয়সী সাইমা নৌশিন সুহা বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে তরুণীদের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে বলে তিনি আশঙ্কা করেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে রক্ষণশীলতাই সবচেয়ে ভয়ের।”
এ নির্বাচনে তাই শুধু দল বা প্রার্থী নয়, ভোটারদের সামনে রয়েছে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু অধিকার, নারীর অধিকার এবং গণতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। ১২ ফেব্রুয়ারি সেই উত্তরের দিন।