তালাক-এ-হাসান বিতর্কে নারীর পক্ষে শক্ত অবস্থান সুপ্রিম কোর্টের

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 16 h ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
নয়া দিল্লি

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মামলায় হস্তক্ষেপ করে নির্দেশ দিয়েছে যে এক মুসলিম স্বামীর দ্বারা তাঁর নিরক্ষর স্ত্রীকে প্রদান করা তালাক-এ-হাসান আপাতত স্থগিত থাকবে। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত তালাক বৈধ বলে প্রমাণিত না হয়, ততক্ষণ স্ত্রী-স্বামীকে আইনত বিবাহিত দম্পতি হিসেবেই গণ্য করা হবে। আদালতের এই সিদ্ধান্ত শুধু এক দম্পতির ব্যক্তিগত বিরোধ নয়; বরং এটি নারী-অধিকার, মানবাধিকার এবং সংবিধানিক সুরক্ষার গভীর প্রশ্নকে সামনে তুলে ধরেছে।

এই মামলা কর্ণাটকের বেলগাভি অঞ্চলের, যেখানে ২০২১ সালে হেনা নামের এক গৃহবধূর বিবাহ হয়। নিরক্ষর হওয়ার কারণে হেনা পড়তে-লিখতে পারেন না। তাঁর অভিযোগ, স্বামী বেআইনি উপায়ে তাঁর কাছ থেকে সই করিয়ে নেন এবং তালাক-এ-হাসান পদ্ধতিতে একতরফাভাবে তালাক দেওয়ার চেষ্টা করেন। অভিযোগ সত্ত্বেও এবং আদালতের নোটিশ পাওয়ার পরও স্বামী কখনোই আদালতে হাজির হননি।
 
প্রতীকী ছবি
 
এই মামলার শুনানি করেন প্রধান বিচারপতি সুর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির বেঞ্চ। শুনানির সময় সিনিয়র অ্যাডভোকেট এম.আর. শামশাদ যুক্তি দেন যে তালাক-এ-হাসান ইসলামে স্বীকৃত তালাক পদ্ধতি। তবুও আদালত জানায়, তারা এই তালাক পদ্ধতিকে অবৈধ ঘোষণা করছে না; বরং স্বামীর অনুপস্থিতি এবং স্ত্রীর গুরুতর অভিযোগ বিবেচনা করেই তালাকের কার্যকারিতা স্থগিত রাখা জরুরি।
 
সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, স্বামী বৈধভাবে তালাক প্রদান করেছেন তা প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত দম্পতি বিবাহিত বলে গণ্য হবেন। সংশ্লিষ্ট থানার এসএইচওকে স্বামীর সন্ধান খুঁজে আদালতে উপস্থিত করানোরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতি উল্লেখ করেন, "এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল মামলা, কারণ এটি সরাসরি পরিবারের শান্তি, মানবিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত আবেগের সঙ্গে যুক্ত।"
 
হেনার পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট জয়না কোঠারি জানান- স্বামী ইমেল, হোয়াটসঅ্যাপ এবং রেজিস্টার্ড পোস্টের মতো ডিজিটাল মাধ্যমে তালাক দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি আদালতকে জানান, যতক্ষণ পর্যন্ত সংসদ স্থায়ী আইন না আনে, ততক্ষণ মুসলিম নারীদের একতরফা অবৈধ তালাক, প্রতিহিংসামূলক ফৌজদারি মামলা, এবং পুলিশের পক্ষপাতিত্ব থেকে রক্ষার জন্য নির্দেশিকা জরুরি।
 
এছাড়াও আরেকটি সংশ্লিষ্ট মামলায় তালাক-এ-হাসান সংবিধানের ১৪, ১৫ এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী, এই মর্মে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে। এটি দেখায় যে এই প্রথা শুধু ধর্মীয় নয়, আধুনিক ভারতীয় আইন এবং নারী-মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও গভীর বিতর্কের বিষয়।
 
প্রতীকী ছবি
 
সুপ্রিম কোর্ট উল্লেখ করে, অনেক ক্ষেত্রে তালাক-এ-হাসান একতরফা ও বিচারবহির্ভূতভাবে ব্যবহৃত হয়। হেনার ক্ষেত্রে ঠিক সেটিই ঘটেছে, স্বামী বেআইনি পথে তালাক দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, আর স্ত্রী নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার মতো ন্যায্য সুযোগ পাননি। তাই আদালত মনে করে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত, ন্যায়সঙ্গত এবং সংবেদনশীল হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
 
এই প্রেক্ষাপটে আদালত মধ্যস্থতার নির্দেশ দেয়। সুপ্রিম কোর্টেরই সাবেক বিচারপতি কুরিয়ান জোসেফকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়, যাতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বৈধ ও শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজা যায়। আদালত নির্দেশ দেয় যে চার সপ্তাহের মধ্যে তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য। এতে আদালত স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, তালাকের মতো মানবিক বিষয়ে শুধু আইনি প্রক্রিয়া নয়, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ড. রিজওয়ান আহমেদ জানান, আগের নির্দেশ সত্ত্বেও স্বামী আবারও বেআইনি ভাবে তালাক দেওয়ার চেষ্টা করেন। আদালত তাই পূর্ববর্তী সমস্ত তালাককে আপাতত বাতিল রেখে মধ্যস্থতা প্রক্রিয়াকে নিরপেক্ষ ও কার্যকর রাখার নির্দেশ দেয়।
 
যদিও আদালত এই পর্যায়ে ডিজিটাল মাধ্যমে তালাকের ওপর কোনো অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি, তবে প্রধান বিচারপতি ইঙ্গিত দেন, ভবিষ্যতে এই বিষয়ে উপযুক্ত নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। তিনি আরও বলেন, “এটি শুধু আইনের প্রশ্ন নয- এটি আবেগ, মানবিক বোধ ও পারিবারিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত।”
 
সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত দেশের সকল মুসলিম নারীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, তালাক-এ-হাসান পদ্ধতি কোনোভাবেই নারীর প্রতি অবিচার বা একতরফা ক্ষতি সাধনের হাতিয়ার হতে পারে না। আইন শুধুমাত্র পুরনো প্রথাকে অনুসরণ করে না; বরং নারী-অধিকার ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। এই মামলার শুনানিতে এম.আর. শামশাদ স্বামীর পক্ষ রাখেন, আর জয়না কোঠারি ও ড. রিজওয়ান আহমেদ হেনার ন্যায্যতা ও অধিকারের সুরক্ষা নিয়ে যুক্তি দেন। শেষমেশ আদালত মানবিক সমাধানের পথে হাঁটতে মধ্যস্থতার নির্দেশ দেয়।
 
প্রতীকী ছবি
 
সুপ্রিম কোর্টের এই পদক্ষেপ কেবল হেনার ক্ষেত্রেই নয়, বরং সমগ্র দেশে মুসলিম তালাকের বিতর্কে নারীর অধিকার রক্ষার এক নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। আদালত স্পষ্ট করেছে, তালাক একটি আইনগত প্রক্রিয়া হলেও, সেটিকে সামাজিক ও আবেগগত দায়বদ্ধতা থেকেও বিচার করতে হবে।
 
অবশেষে আদালত জানায়, তালাক-এ-হাসান কোনো অবস্থাতেই নারীর বিরুদ্ধে বেআইনি বা অন্যায়ভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। এই রায় নারী-অধিকার, ন্যায়বিচার এবং সংবিধানিক সুরক্ষার গুরুত্বকে আরও একবার দৃঢ়ভাবে চিহ্নিত করে। এই মামলা এবং এর মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া মুসলিম তালাক আইন, নারীর অধিকার ও মানবাধিকার বিষয়ে দেশে একটি ঐতিহাসিক অবস্থান তৈরি করে, যা বহু নারীর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।