গজালা পারভীন: উত্তর প্রদেশের এক সাহসী নারী যিনি রঙের মাধ্যমে সমাজের বাধা অতিক্রম করেছেন

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 5 h ago
গজালা পারভীন: উত্তর প্রদেশের এক সাহসী নারী যিনি রঙের মাধ্যমে সমাজের বাধা অতিক্রম করেছেন
গজালা পারভীন: উত্তর প্রদেশের এক সাহসী নারী যিনি রঙের মাধ্যমে সমাজের বাধা অতিক্রম করেছেন
 
অনিকা মাহেশ্বরী / নয়াদিল্লি

শিল্প শুধু রঙ আর ক্যানভাসের সমাহার নয়, এটি এমন সব আবেগ, অভিজ্ঞতা ও প্রশ্নকে প্রকাশ করার একটি মাধ্যম, যা সবসময় ভাষায় প্রকাশ করা সহজ নয়। কারও জন্য শিল্প একটি শখ, কারও জন্য জীবিকা নির্বাহের উপায়, আবার কারও জন্য সমাজের সঙ্গে যোগাযোগের একটি মাধ্যম। গজলা পারভীনের কাছে শিল্প এসবের অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি ছবি আঁকেন, পরিবেশন শিল্পের মাধ্যমে তাঁর ভাবনা তুলে ধরেন এবং একজন শিল্প-শিক্ষক হিসেবে নতুন প্রজন্মকে সৃজনশীলতার গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেন।

উত্তর প্রদেশের একটি গ্রামের সরকারি বিদ্যালয় থেকে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং শেষ হয়েছিল জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায়, যেখানে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিতে স্বর্ণপদক লাভ করেন। শিল্পের এই পথচলা তাঁকে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশেও তাঁর প্রতিভা প্রদর্শনের সুযোগ করে দিয়েছিল। আজ তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে এই বার্তা দিচ্ছেন যে, কোনো বিষয় বা পেশা নির্বাচন শুধুমাত্র সামাজিক প্রত্যাশার উপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত নয়, বরং তা হওয়া উচিত নিজের আগ্রহ, কঠোর পরিশ্রম এবং নিষ্ঠার উপর।

গজলার গল্প শুরু হয় এমন এক বয়সে, যখন বেশিরভাগ শিশু তাদের জগৎকে খেলাধুলা আর বইপড়াতেই সীমাবদ্ধ রাখে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তার কাগজের ওপর নানা রকম আকৃতি আঁকার অভ্যাস গড়ে ওঠে। ধীরে ধীরে এই অভ্যাসটি চিত্রকলার রূপ নেয়। সে মানুষের প্রতিকৃতি আঁকত এবং তার চারপাশে যা দেখত, তা কাগজে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করত। তার বাবা-মা তার কাজের প্রশংসা করতেন। পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া এই প্রাথমিক উৎসাহ শিল্পের প্রতি তার অনুরাগ আরও দৃঢ় করে তোলে। সেই সময়ে সে হয়তো ভাবেনি যে শৈশবে শুরু হওয়া এই শখটি একদিন তার পরিচয় ও পেশার ভিত্তি হয়ে উঠবে।

স্কুলে তাঁর শিল্পকলার শিক্ষক, রাজকুমার সিং, তাঁর প্রতিভা চিনতে পেরেছিলেন এবং তা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। গজালা আজও তাঁকে স্মরণ করেন। রাজকুমার সিং আর এই পৃথিবীতে নেই, তিনি ক্যান্সারে মারা গেছেন। কিন্তু গাজালার জীবনে তাঁর উৎসাহ এবং নির্দেশনা আজও জীবন্ত। তিনি শুধু গাজালার চিত্রকর্মের প্রশংসাই করেননি, বরং তাঁর শিল্পকলাও বুঝতেন এবং তাঁকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য দিকনির্দেশনা দিতেন। গাজালার মতে, শিক্ষক তাঁকে কখনও একা ছেড়ে যাননি। তিনি গজালাকে এই ভাবনায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন যে, যখন বহু ছাত্রছাত্রী ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার প্রতিযোগিতায় রয়েছে, তখন প্রতিভাবান তরুণদেরও শিল্পকলার জগতে আসা উচিত। এই উৎসাহই গজালার জীবনের জন্য নির্ণায়ক প্রমাণিত হয়েছিল।

গজালা পড়াশোনাতেও মেধাবী ছিলেন। তিনি বিজ্ঞানে খুব ভালো ছিলেন এবং তার পরিবার চাইত তিনি একজন ডাক্তার হন। তার সামনে এমন একটি পথ ছিল যা সমাজে একটি নিরাপদ ও সম্মানিত পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়। এর বিপরীতে, শিল্পকলা নিয়ে পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন ছিল। ছবি আঁকা কি পেশা হতে পারে? আমি কি এটা থেকে নিয়মিত আয় করতে পারব? শিল্পকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া কি একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হবে? এই ধরনের প্রশ্ন শুধু গজালা পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এমনকি তার আশেপাশেও শিল্পকে প্রায়শই একটি শখ হিসেবে গণ্য করা হতো। তাকে প্রমাণ করতে হয়েছিল যে ছবি আঁকা কেবল একটি অবসর বিনোদন নয়, বরং কঠোর পরিশ্রম, শিক্ষা এবং পেশাগত নিষ্ঠার মাধ্যমে গ্রহণ করা যায় এমন একটি ক্ষেত্র।

গজালা মনে করতেন, তাঁর পরিবারে শিল্পকলাকে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হতো না। তবে, তাঁর মা ও ভাই তাঁকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর, উচ্চশিক্ষার জন্য দিল্লিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারকে কিছু বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এক গ্রাম ছেড়ে অন্য শহরে পড়তে যাওয়া, প্রতিদিন যাতায়াত করা এবং নিজের ভবিষ্যতের দায়িত্ব একা নেওয়া সহজ ছিল না। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় ভর্তি হওয়ার জন্য গাজালা কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। তিনি তাঁর পরিবারকে বুঝিয়েছিলেন যে তিনি শিল্পকলা নিয়ে পড়তে চান। তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়েও আবেদন করেছিলেন, কিন্তু নির্বাচিত হননি। জামিয়ায় ভর্তি হওয়ার পর, তাঁর ভাই পরিবারকে বোঝান যে গজালাকে একটি সুযোগ দেওয়া উচিত। অবশেষে, পরিবার রাজি হয় এবং গাজালা তাঁর স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান।

গজালা পারভীন

গজালার কাছে ব্যাপারটা শুধু কলেজে ভর্তি হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটা ছিল তার জীবনের স্বাধীনতার দিকে প্রথম বড় পদক্ষেপ। সে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত গ্রামের সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেছে। তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং দিল্লির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ তার জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। গ্রাম থেকে শহরে এই পরিবর্তন তার সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। তাকে নতুন মানুষদের সাথে মানিয়ে চলতে হয়েছিল, একটি স্বতন্ত্র সামাজিক ও শিক্ষাগত পরিবেশ বুঝতে হয়েছিল এবং নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে হয়েছিল। সে বলে যে এই ব্যবধান কাটিয়ে উঠতে তার অনেক বছর লেগেছিল। স্নাতক পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে নিজের খরচ নিজেই চালিয়েছে এবং সহপাঠীদের সাথে মিশে যাওয়ার ও তাল মিলিয়ে চলার আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে।

জামিয়ায় ভর্তি হওয়ার পর তাকে একটি ছাত্রাবাসে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। বাড়ি থেকে দূরে থাকা, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া এবং নিজের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা করা তার স্বাধীন ব্যক্তিত্ব গঠনের একটি অংশ হয়ে ওঠে। যে মেয়েটিকে তার গ্রাম ছাড়ার জন্য পরিবারকে রাজি করাতে হয়েছিল, সে ধীরে ধীরে তার শিল্পের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে যায়। জামিয়ায় স্নাতক পড়ার সময় ২০১৩ সালে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন। এরপর তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রিতেও স্বর্ণপদক জেতেন। এই অর্জনগুলো তার জন্য কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সম্মানই ছিল না, বরং যারা শিল্পকে ভবিষ্যতের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি অনিশ্চিত ক্ষেত্র বলে মনে করত, তাদের প্রশ্নের উত্তরও ছিল।

গজালার মতে, তার জীবনে পরিবারের অনুপ্রেরণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার বাবা যত্ন করে তার আঁকা ছবিগুলো সংরক্ষণ করতেন। তার বাবা গজালার আঁকার ফাইলটি তার বিছানার পাশে রাখতেন এবং বাড়িতে আসা বন্ধু ও পরিচিতদের গর্বের সাথে সেগুলো তার মেয়ের আঁকা ছবি বলে দেখাতেন। গাজালার মনে আছে, চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন তার বাবা তাকে একটি বইয়ে ছাপা হওয়া বাসের ছবি আঁকতে বলেছিলেন। তিনি তার ভাইকে পাশে বসিয়ে একই ছবিটা আঁকতে বলেন এবং দুজনের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। গজালা দ্রুত তার ছবিটি এঁকে ফেলেন, কিন্তু তার ভাই তা আঁকতে পারেননি। এই ছোট ঘটনাটি আজও তার মনে উজ্জ্বল। তার বাবা খুব অল্প বয়সেই তার প্রতিভা চিনতে পেরেছিলেন এবং তাকে শিল্পচর্চা চালিয়ে যাওয়ার জন্য আশীর্বাদ করেছিলেন। অবশ্যই, গাজালার কর্মজীবনের পূর্ণ বিকাশ দেখে যাওয়ার জন্য তিনি বেশিদিন বাঁচেননি, কিন্তু তার বিশ্বাস আজও গাজালার জন্য এক অনুপ্রেরণা।

তার মায়ের অবদানও কোনো অংশে কম ছিল না। গজালা বলেন, তার মা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত না হলেও শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতেন। গাজালা যখন রাতে পড়াশোনা করত, তার মা তার পাশে বসে তাকে পড়তে উৎসাহিত করতেন। পরীক্ষার দিনগুলোতে যখন সে গভীর রাত পর্যন্ত বই নিয়ে বসত, তার মা তাকে তার সাথে জেগে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বলতেন। গজালার কাছে তার মায়ের সঙ্গ কেবল মানসিক সমর্থনই ছিল না, বরং শিক্ষা ও কঠোর পরিশ্রমের প্রতি তার মায়ের বিশ্বাসের প্রতীকও ছিল। তার গল্প এও প্রমাণ করে যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব কোনো ব্যক্তিকে তার সন্তানদের প্রতিভা ও ভবিষ্যতের গুরুত্ব বোঝা থেকে কখনো বিরত রাখতে পারে না।

গজালা পারভীনের চিত্রকর্ম

গজালা তার পরিবারের কনিষ্ঠতম কন্যাদের মধ্যে একজন। তাদের পরিবারে ১০ জন বোন ও ২ জন ভাইসহ মোট ১২ জন ভাইবোন রয়েছে। এত বড় পরিবারে থেকেও তিনি নিজের পছন্দের বিষয়গুলোর জন্য জায়গা করে নিয়েছিলেন। শৈশবেই পরিবারে তার আঁকা ছবি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে, কিন্তু শিল্পকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের বোঝাতে হয়েছিল যে ছবি আঁকা শুধু একটি শখ নয়, এটি একটি চমৎকার পেশাও হতে পারে। নিজের কাজের মাধ্যমে গাজালা এই ধারণাটি বদলানোর চেষ্টা করেছিলেন। তার আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য তার পরিবার ও চারপাশের মানুষদের কাছে শৈল্পিক সম্ভাবনার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।

তার জীবনের আরেকটি স্মরণীয় ঘটনা তার শৈশবের সাথে সম্পর্কিত। তিনি স্কুলে ক্লাস মনিটর ছিলেন এবং চক ও ডাস্টার রাখার দায়িত্বে ছিলেন। একদিন তিনি এক টুকরো চক তুলে নিয়ে তার বাড়ির ছাদে নানা রকম ছবি আঁকতে শুরু করলেন। খালি ছাদটি তার কাছে এক বিশাল ক্যানভাস বলে মনে হয়েছিল। তিনি মানুষের মুখ, পাখি এবং ফুল এঁকেছিলেন। যখন তার মা ছাদে সাদা চকের ছবিগুলো দেখলেন, তিনি গজলাইকে অভিশাপ দিলেন এবং সবকিছু মুছে ফেলতে বললেন। এটা সত্যি যে গজলাই ছাদটি ধুয়ে ফেলেছিলেন, কিন্তু সেই ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে থাকা তার সৃজনশীল উদ্দীপনা আজও তার সাথে রয়েছে। সেই সময়ে তার কোনো বড় স্টুডিও, দামী রঙ বা শিল্পকলায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। তার ছিল শুধু ছবি আঁকার এক প্রবল ইচ্ছা এবং যেখানেই তিনি সুযোগ পেতেন, সেখানেই তার কল্পনাকে রূপ দিতেন।

গজালার জন্য, চিত্রকলা ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশের একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। তিনি বিশ্বাস করেন যে প্রত্যেক ব্যক্তিরই নিজেকে প্রকাশ করার নিজস্ব উপায় আছে। কেউ লেখার মাধ্যমে, কেউ বা কথা বলার মাধ্যমে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করে। একজন শিল্পী হিসেবে, তিনি রঙ, আকৃতি এবং শিল্পকর্মের মাধ্যমে মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তার শিল্পকর্মে সামাজিক বিষয় এবং নারীর অভিজ্ঞতার একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। তিনি বিশেষ করে গ্রামের নারীদের জীবন, তাদের মুখোমুখি হওয়া পরিস্থিতি এবং পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কিত প্রশ্নগুলো নিয়ে কাজ করেন। তার কাছে, শিল্প কেবল সুন্দর ছবি আঁকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চান তার শিল্পকর্ম দর্শকদের ভাবাক এবং সমাজে প্রায়শই উপেক্ষিত অভিজ্ঞতাগুলোর প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করুক।

চিত্রকলা থেকে পরিবেশন শিল্পকলায় যাত্রা

গজালার শৈল্পিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল পারফর্মিং আর্টস বা পরিবেশন শিল্পকলায় তাঁর সম্পৃক্ততা। শুরুতে মাধ্যমটি তাঁর কাছে সম্পূর্ণ নতুন ছিল। ২০১৪ সালে, যখন তিনি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছিলেন, তখন একজন জাপানি শিল্পী তাঁদের কলেজে এসেছিলেন। গাজালা তাঁকে তাঁর গুরু হিসেবে গণ্য করেন। তাঁর মাধ্যমেই গাজালা পারফর্মিং আর্টসকে কাছ থেকে বোঝার এবং এই মাধ্যমে নিজের সৃজনশীলতা আবিষ্কার করার সুযোগ পেয়েছিলেন। শুরুতে শিল্পকলাটি সম্পর্কে তাঁর তেমন কোনো ধারণা ছিল না। তিনি আগ্রহ নিয়ে শিল্পীকে দেখতেন, কিন্তু এও ভয় পেতেন যে তাঁকে হয়তো সবার সামনে পরিবেশন করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে। সেই সময়ে তিনি মাইক্রোফোনের সামনে আসতে অনিচ্ছুক ছিলেন।

একদিন তার শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের দুই মিনিটের জন্য তাদের শিল্পকর্ম প্রদর্শনের সুযোগ দিলেন। গজলার এক বন্ধুও তার নাম দিল। যখন তার পালা এলো, সে পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছিল না কী করবে। সামনে শিক্ষক, দর্শক এবং ক্যামেরা উপস্থিত ছিল। সে একটি স্কার্ফ এবং একটি ঘোমটা পরেছিল। সে অর্নিখটি উপরে ছুঁড়ে দিল এবং সেটি নিচে পড়ার আগেই মাটিতে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘোমটাটি নিচে পড়ে তার পুরো শরীর ঢেকে দিল। এটি ছিল তার প্রথম সংক্ষিপ্ত পরিবেশনা।

এই পরিবেশনাটি, যদিও মাত্র কয়েক মুহূর্ত স্থায়ী হয়েছিল, তার মনে এক নতুন শৈল্পিক মাধ্যমের দ্বার উন্মোচন করে দেয়। জাপানি শিল্পী তার পরিবেশনাটি খুব পছন্দ করেছিলেন। তিনি ভিডিও ক্লিপটি জাপানে নিয়ে যান এবং সেখানে প্রদর্শন করেন। পরবর্তীতে যখন জাপানি শিল্পী ফিরে আসেন, সেখানকার কয়েকজন শিল্পী ঘোমটা পরে প্রদর্শনকারী মেয়েটির সম্পর্কে জানতে চান। গাজালার জন্য এই অভিজ্ঞতা ছিল অকল্পনীয়। কোনো পূর্ব পরিকল্পনা বা বিশেষ প্রস্তুতি ছাড়াই তিনি যে ধরনের শিল্প নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন, তা তার জন্য নতুন পরিচয় ও সুযোগের দ্বার উন্মোচন করে দেয়।

"চিত্রকলা এবং পরিবেশন শিল্পের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে," গাজালা বললেন। যখন একজন শিল্পী ক্যানভাসে ছবি আঁকেন, তখন তিনি রঙ, রেখা এবং আকারের মাধ্যমে তাঁর চিন্তা ও আবেগ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, পরিবেশন শিল্পে শিল্পীর শরীরই হয়ে ওঠে অভিব্যক্তির মাধ্যম। শিল্পী তাঁর শরীর, বস্তু, কার্যকলাপ এবং একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতির মাধ্যমে তাঁর চিন্তাভাবনা উপস্থাপন করেন। এতে প্রচলিত নাটকের মতো সংলাপ বা পূর্বলিখিত চিত্রনাট্য থাকার প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় শিল্পীর শরীর, তাঁর কার্যকলাপ এবং তাঁর চারপাশের বস্তুগুলোই পুরো পরিবেশনাটির অর্থ নির্মাণ করে।

তিনি মনে করেন, পারফর্মিং আর্টসকে শুধু একটি নাটক হিসেবে ভাবা ভুল। এখানে শিল্পী একটি চিন্তা বা অনুভূতিকে দৃশ্যমান ও শারীরিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করেন। দর্শক সেই পরিবেশনা দেখেন এবং নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে এর অর্থ অনুধাবন করেন। গাজালার কাছে এই মাধ্যমটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তাঁকে সেইসব সামাজিক বিষয় তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়, যা নিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত ভাবেন। তাঁর শিল্পকর্মে শরীর শুধু পরিবেশনার একটি উপকরণ নয়, বরং চিন্তা প্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম।

গজালা পারভীন

গ্রাম থেকে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া

জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় পড়ার সময় গাজালা আন্তর্জাতিকভাবে তার শিল্পকর্ম প্রদর্শনের সুযোগ পান। তার শিক্ষকেরা তার প্রতিভা চিনতে পেরেছিলেন এবং তাকে চালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি জাপানে যাওয়ার সুযোগ পান। পরে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় যান। গ্রাম থেকে শহরে আসা এবং তারপর অন্যান্য দেশে তার শিল্প পরিবেশন করার এই যাত্রাটি ছিল এক বিরাট পরিবর্তনের চেয়ে কম কিছু নয়।

এই অভিজ্ঞতাটি গজালার জন্য বিশেষ ছিল, কারণ সে-ই তার পরিবার ও আত্মীয়দের মধ্যে প্রথম মেয়ে যে বিদেশে ভ্রমণ করেছিল। যে মেয়েটির শিল্পকলা নিয়ে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত নিয়ে একসময় প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, সে-ই এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার প্রতিভা প্রদর্শন করছে। জাপানে সে বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং নানা শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার সুযোগ পায়। এই অভিজ্ঞতা তাকে তার শিল্পকে আরও বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে শিখতে ও দেখতে সাহায্য করেছিল।

তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে তাঁর মধ্যে অনেক উত্তেজনার পাশাপাশি কিছুটা ভয়ও ছিল। একা ভ্রমণ করা এবং সম্পূর্ণ নতুন এক পরিবেশে পৌঁছানো তাঁর জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে এবং অন্যান্য দেশের শিল্পীদের মাঝে নিজের শিল্পকর্ম প্রদর্শন করার পর তাঁর আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তিনি অনুভব করেন যে, শিল্পের ভাষা প্রায়শই শব্দ ও ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে যায়। শিল্পীরা এমন সব মাধ্যমের দ্বারা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও চিন্তাভাবনা প্রকাশ করতে পারেন, যা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমির মানুষ বুঝতে সক্ষম।

জাপানে প্রদর্শনী করার সময় গাজালা ভারতীয় সংস্কৃতি, বিবাহ এবং নারীর জীবন সম্পর্কিত বিষয়গুলো তুলে ধরেছিলেন। তাঁর একটি প্রদর্শনীতে তিনি বধূর বেশ ধারণ করেছিলেন। তিনি সিঁদুর ছবি এবং কনের পোশাকের মাধ্যমে ভারতীয় বিবাহ সংস্কৃতিকে চিত্রিত করেছেন, কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য কেবল ঐতিহ্যবাহী রূপটি দেখানো ছিল না। প্রদর্শনীটিতে বিবাহিত নারীদের জীবন, পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং নারীর মর্যাদা সম্পর্কিত প্রশ্নগুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাঁর কাজে একটি নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তিনি সেই সামাজিক প্রত্যাশাগুলোকে তুলে ধরেন, যার মধ্যে নারীরা জীবনযাপন করে।

এইভাবে তাঁর শিল্পকর্ম ভারতীয় সংস্কৃতির উপস্থাপনার পাশাপাশি এর অন্তর্নিহিত সামাজিক অভিজ্ঞতা ও প্রশ্নগুলোকেও তুলে ধরে। তিনি তাঁর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন, কিন্তু সেই পরিমণ্ডলে নারীদের অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর কাছে, নিজের সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করার অর্থ কেবল তার সৌন্দর্য দেখানোই নয়, বরং তার ভেতরের বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে বোঝা এবং প্রকাশ করাও।

জাপানে তার প্রদর্শনী যে প্রশংসা পেয়েছিল, তা তার পরিবারকেও গর্বিত করেছিল। তার মা ও ভাই খুশি হয়েছিলেন যে, গাজালা তার পছন্দের ক্ষেত্রকে অনুসরণ করে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছে। যে মেয়ের পরিবার তাকে ডাক্তার হিসেবে দেখতে চেয়েছিল, সে শিল্পকলাকে বেছে নিয়েছিল এবং নিজের জন্য একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছিল। গাজালা বিশ্বাস করেন যে, যদি তিনি বিজ্ঞানের জগতে যেতেন, তবে নিজের প্রচেষ্টাতেই সেখানে কিছু অর্জন করতে পারতেন, কারণ পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ এবং কঠোর পরিশ্রম করার অভ্যাস আগে থেকেই ছিল। কিন্তু তিনি শিল্পকলাকে বেছে নিয়েছিলেন এবং সেখানেই নিজের সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছিলেন।

তার এই যাত্রা তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং গ্রামবাসীদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যারা শিল্পকে কেবল একটি শখ হিসেবে ভাবতেন, তারাও এখন দেখতে পেলেন যে এই ক্ষেত্রেও শিক্ষা, সাফল্য, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক সুযোগের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। গাজালার কাছে এই পরিবর্তন ব্যক্তিগত সাফল্যের ঊর্ধ্বে। তিনি চান, তার অভিজ্ঞতা থেকে অন্য মেয়েরা ও তরুণ-তরুণীরা তাদের পেশা বেছে নেওয়ার সাহস পাক।

তার মায়ের প্রতি উৎসর্গীকৃত চিত্রকর্ম ও শৈশবের স্মৃতি

গজালার শিল্পকর্ম শুধু জনসমক্ষে প্রদর্শনী এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর কিছু শিল্পকর্ম ব্যক্তিগত আবেগ এবং পারিবারিক সম্পর্কের সাথেও গভীরভাবে জড়িত। এগুলোর মধ্যে তাঁর মায়ের একটি চিত্রকর্ম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি তিনি চিত্রকর্মটি তাঁর মাকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন। এই শিল্পকর্মটির পেছনে রয়েছে তাঁর মায়ের অবদানের গল্প, যিনি তাঁর শিক্ষা ও জীবন গঠনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

গজলার মা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত না হলেও মেয়ের পড়াশোনার ব্যাপারে তিনি খুব সচেতন ছিলেন। গজলা যখন গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করত, তার মা তার পাশে বসতেন। তার মা তাকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করতেন এবং পরীক্ষার সময় তার সঙ্গে থাকতেন। গজলার কাছে এগুলো শুধু শৈশবের স্মৃতি নয়, বরং এগুলো ছিল সেই ত্যাগ ও আবেগঘন সম্পৃক্ততার স্মৃতি, যা তাকে তার স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।

তিনি তাঁর মায়ের প্রতি উৎসর্গীকৃত এই চিত্রকর্মটির মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চান। তাঁর জীবনে বাবা ও মা দুজনেই ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে শিল্পের প্রতি তাঁর বিশ্বাসকে দৃঢ় করেছেন। তাঁর বাবা গর্বের সাথে অন্যদের তাঁর আঁকা ছবি দেখাতেন, আর মা তাঁর পড়াশোনা এবং তা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাকে সমর্থন করতেন। এই দুটি অভিজ্ঞতাই গাজালাকে বুঝতে সাহায্য করেছিল যে, একটি শিশুর প্রতিভাকে চিনতে পারা এবং তাকে সুযোগ দেওয়া তার ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

শিল্পের মাধ্যমে জীবিকা ও আত্মনির্ভরশীলতা

গজলা পারভীন বর্তমানে একজন শিল্পকলার শিক্ষক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি একজন স্বাধীন শিল্পী হিসেবেও তাঁর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ছবি আঁকেন, তাঁর প্রিয় বিষয় নিয়ে কাজ করেন এবং পারফরম্যান্স আর্ট প্রদর্শনীরও আয়োজন করেন। তাঁর কাজের মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যিক প্রকল্প, ফরমায়েশি শিল্পকর্ম এবং বিভিন্ন প্রদর্শনী। সুতরাং, শিল্প তাঁর জন্য কেবল ব্যক্তিগত অভিব্যক্তির একটি মাধ্যমই নয়, বরং তাঁর পেশাগত জীবনেরও মূল ভিত্তি।

তিনি স্মরণ করেন যে, স্কুলজীবনে তাঁর আঁকা একটি ছোট ছবি রুপিতে বিক্রি হয়েছিল। সে সময় এটি তাঁর জন্য একটি স্মরণীয় ঘটনা ছিল। এরপর তিনি বাণিজ্যিকভাবেও কাজ করেছেন এবং বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁর শিল্পচর্চা চালিয়ে গেছেন। তবে, তিনি তাঁর এই যাত্রাকে এখনও সম্পূর্ণ বলে মনে করেন না। তাঁর মতে, তাঁর কাজ এখনও চলমান এবং তাঁর এখনও অনেক কিছু শেখার ও করার আছে।

গাজালার অভিজ্ঞতা এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে যে শিল্পের কোনো অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নেই। তিনি বিশ্বাস করেন যে যেকোনো ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য প্রতিভার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং নিরন্তর শেখার প্রয়োজন। শিল্পকলাতেও সুযোগ রয়েছে, তবে সে সম্পর্কে তথ্য ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। মানুষকে বুঝতে হবে যে কারুশিল্প শিক্ষা এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন পথ খুলে যেতে পারে।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গজালা পারভীন

তাঁর জীবনে অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতার গুরুত্বও সুস্পষ্ট। তিনি বলেন যে, আজ যদি তাদের পরিবারের কোনো সন্তান শিল্পচর্চায় আসতে চায়, তবে আগের মতো সহজে তাকে থামানো যায় না, কারণ পরিবার তার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছে যে শিল্প একটি চমৎকার পেশার দিকেও নিয়ে যেতে পারে। তার মতে, শিল্পের মাধ্যমে ভালো আয় করা, স্বাবলম্বী হওয়া এবং অভাবীদের সাহায্য করাও সম্ভব। তার কথাগুলো সমাজের চিন্তাভাবনার পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটায়, যেখানে একসময় শিল্পকে কেবল একটি শখ বা বাড়তি কাজ হিসেবে দেখা হতো।

নতুন প্রজন্মের জন্য নির্দেশনা

গজালার ভূমিকা শুধু তাঁর শিল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি স্কুলের একজন শিল্পকলার শিক্ষিকা এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের পড়ান। এই সূত্রে তাঁর প্রায়শই এমন অনেক ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ হয়, যাদের সৃজনশীল প্রতিভা আছে, কিন্তু নিজেদের পছন্দের বিষয় বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা নেই।

গজলাই বলেন, অনেক শিক্ষার্থী সুন্দর ছবি আঁকে এবং চারুকলা নিয়ে পড়াশোনা করতে চায়, কিন্তু তাদের বাবা-মা এই বিষয়টি বেছে নিতে দেন না। বাবা-মায়েরা মনে করেন যে শিল্পচর্চায় সময় দিলে পেশাগত সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। এমন ক্ষেত্রে, গজলাই শিক্ষার্থী এবং তাদের বাবা-মা উভয়ের সাথেই কথা বলেন। তিনি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে শিল্পশিক্ষাকে সময়ের অপচয় হিসেবে ভাবাটা ভুল এবং শিশুদের প্রতিভাকে সঠিক সুযোগ দেওয়া উচিত।

তিনি বিশ্বাস করেন যে, শিল্প শিক্ষা শুধুমাত্র পেশাদার শিল্পী তৈরির জন্যই প্রয়োজনীয় নয়। এটি শিশুর ব্যক্তিত্ব, কল্পনা, সংবেদনশীলতা এবং প্রকাশের ক্ষমতাও বিকাশ করে। তিনি বিদ্যালয়ে শিল্পের ভূমিকাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন এবং চান যে শিক্ষার্থীরা এটি চর্চা করতে উৎসাহিত হোক। যদিও বিদ্যালয়ে শিল্প শিক্ষার ব্যবস্থা এবং এটি বাধ্যতামূলক করার নিয়মকানুন ভিন্ন হতে পারে, গাজালার মূল জোর এটাই যে, শিল্পকে শিক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ছাত্রদের বোঝান যে, শিল্পকলাতেও কঠোর পরিশ্রম ও একাগ্রতার মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। তাঁর মতে, প্রতি বছর তাঁদের স্কুল থেকে প্রায় তিন-চারজন ছাত্রছাত্রী চারুকলা কোর্স সম্পন্ন করে জীবনে এগিয়ে যায়। তাঁর কাছে এটি একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, কারণ এটি সেইসব ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের পছন্দের পেশা বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়, যারা অন্যথায় হয়তো এই পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ পেত না।

গজালা মনে করেন, শিল্পকলা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এখনও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় যত বেশি সম্ভব মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে চান। তাঁর কাছে শিক্ষক হওয়ার অর্থ শুধু পুঁথিগত পাঠদান নয়, বরং শিক্ষার্থীদের তাদের সুপ্ত প্রতিভা চিনতে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাধীনভাবে ভাবতে সাহায্য করা।

গ্রামীণ নারীদের জীবন ও সামাজিক প্রশ্নাবলি সম্পর্কিত শিল্পকর্ম

গজালার সৃজনশীল কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্রামীণ নারীদের জীবনের সাথে এর সম্পর্ক। সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হওয়া তাঁর কাজের বিষয়বস্তুতে উঠে আসে গ্রামের নারীরা, তাঁদের অভিজ্ঞতা এবং তাঁরা যে সামাজিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হন তা। তিনি এমন সব বিষয়কে সামনে আনতে আগ্রহী, যেগুলোকে প্রায়শই সাধারণ জীবনের অংশ বলে ধরে নেওয়া হয় এবং উপেক্ষা করা হয়।

তিনি বিশ্বাস করেন যে, একজন শিল্পীর নিজেকে প্রকাশ করার একটি স্বতন্ত্র শৈলী থাকে। একজন লেখক শব্দের মাধ্যমে সামাজিক বিষয় নিয়ে লিখতে পারেন, কিন্তু একজন চিত্রকর তাঁর শিল্পকর্মের মাধ্যমে একই প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেন। গজলা এই মাধ্যমের দ্বারা মানুষের কাছে তাঁর ভাবনা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর শিল্পের উদ্দেশ্য শুধু একটি দৃশ্যকে সুন্দর করে তোলা নয়, বরং দর্শককে এর পেছনের অভিজ্ঞতা ও অর্থ নিয়ে ভাবানো।

নারীর মর্যাদা ও পিতৃতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা সম্পর্কিত বিষয়গুলো তাঁর পরিবেশন শিল্পেও প্রতিফলিত হয়। জাপানে অনুষ্ঠিত কনে প্রদর্শনীগুলো এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ভারতীয় বিবাহের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত প্রতীকগুলোর মাধ্যমে তিনি একজন বিবাহিত নারীর জীবন সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। এইভাবে, তাঁর শিল্পকর্মে সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং সামাজিক সমালোচনা সমান্তরালভাবে চলে।

তাঁর কাজ থেকে বোঝা যায় যে, শিল্প সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। শিল্পীরা যে সমাজে বাস করেন, সেখান থেকেই অভিজ্ঞতা ও বিষয়বস্তু গ্রহণ করেন। গাজালার জন্য, তাঁর গ্রাম, পরিবার এবং চারপাশের নারীদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হওয়া তাঁর সৃজনশীল প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
 

গজালা পারভীন

যুবকদের প্রতি গজালার বার্তা

গজালা পারভীন তরুণদের পরামর্শ দিয়েছেন, তারা যে ক্ষেত্রেই প্রবেশ করুক না কেন, যেন সততা ও পূর্ণ মনোযোগের সাথে কাজ করে। তার মতে, শুধু শিল্পকলাতেই নয়, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, বাণিজ্য বা অন্য যেকোনো ক্ষেত্রেও সাফল্য অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠা অপরিহার্য। কোনো বিষয় ভালো না খারাপ, তা বিচার না করে বরং দেখা উচিত কোন বিষয়ে ব্যক্তির আগ্রহ আছে এবং কোন ক্ষেত্রে সে তার সেরা অবদান রাখতে পারবে।

তিনি বিশেষ করে সেইসব শিক্ষার্থীদের সমর্থন করেন, যাদের শিল্পকলার প্রতি আগ্রহ আছে, কিন্তু পারিবারিক প্রত্যাশা বা সামাজিক চাপের কারণে তাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে না। তিনি বলেন, অভিভাবকদের উচিত তাদের সন্তানদের আগ্রহ বোঝার চেষ্টা করা এবং সঠিক পথে পরিচালিত করা। পারিবারিক সমর্থন যেকোনো তরুণ-তরুণীর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলতে পারে, বিশেষ করে যখন তারা এমন কোনো ক্ষেত্রে প্রবেশ করে, যে ক্ষেত্রটি সমাজে যথেষ্ট পরিচিতি পায়নি।

গজালার নিজের জীবন এই বার্তার একটি চমৎকার উদাহরণ। শুরুতে তাকে তার পরিবারকে বোঝাতে হয়েছিল, নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়াতে হয়েছিল এবং নতুন পরিবেশে নিজের পথ করে নিতে সংগ্রাম করতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি পড়াশোনায় ভালো ফল করেন, দুটি স্বর্ণপদক জেতেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে পারফর্ম করেন এবং আজ তার পেশার মাধ্যমে অন্যদের অনুপ্রাণিত করেন।

শিল্পকলা ছাড়াও তিনি নৃত্য ও সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহী, যদিও তিনি বলেন যে এই দুটি ক্ষেত্রের কোনোটিতেই তাঁর পেশাদার প্রশিক্ষণ নেই। তাঁর প্রধান মনোযোগ থাকে তাঁর আত্মগত চিত্রকর্ম এবং পারফরম্যান্স আর্টের ওপর। তিনি তাঁর কাজে এমন বিষয় খোঁজেন যা তাঁর মনে প্রশ্ন জাগায় এবং যা তিনি দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে চান।

গজালার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নিজের প্রতিভা চেনার জন্য শুরু থেকেই সব সুযোগ-সুবিধা থাকার প্রয়োজন নেই। কখনও কখনও একজন শিক্ষকের উৎসাহ, পরিবারের বিশ্বাস এবং নিজের স্বপ্নের জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টাই এগিয়ে যাওয়ার চাবিকাঠি হয়ে ওঠে। গ্রামের ছাদে চক দিয়ে ছবি আঁকা সেই ছোট্ট মেয়েটি তার কল্পনাকে কখনও সীমাবদ্ধ হতে দেয়নি। তিনি শিল্পকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন, শিক্ষাকে আত্মনির্ভরশীলতার ভিত্তি বানিয়েছিলেন এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণায় পরিণত করার চেষ্টা করেছিলেন।

তার যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। সে নিজে অনুভব করে যে, সামনে এগিয়ে যাওয়ার এবং শেখার জন্য তার সামনে আরও অনেক কিছু রয়েছে। কিন্তু এখন তার সাথে আছে অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত আত্মবিশ্বাস, শিল্পের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করার দক্ষতা এবং নতুন প্রজন্মকে পথ দেখানোর সুযোগ। গজলা পারভীনের গল্পটি শুধু একজন শিল্পীর সাফল্যের গল্প নয়, বরং এটি পরিবর্তনের এক গল্প, যেখানে একটি মেয়ে তার পছন্দের বিষয়ে সোচ্চার হয় এবং ধীরে ধীরে তার পরিবার ও সমাজের চিন্তাধারায় একটি নতুন স্থান করে নেয়।

তাঁর জীবনযাত্রা প্রমাণ করে যে, প্রতিভা যখন সুযোগ পায়, কঠোর পরিশ্রম সঠিক দিকনির্দেশনা পায় এবং স্বপ্ন যখন পারিবারিক সমর্থন পায়, তখন গ্রামের একটি সাধারণ শুরুও আন্তর্জাতিক মঞ্চে আলো ছড়াতে পারে। তাঁর রঙিন ক্যানভাস ও নীরব প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে বয়ে চলা সংগ্রাম ও সাফল্যের এই কাহিনী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নতুন প্রজন্মকে পথ দেখিয়ে যাবে।



শেহতীয়া খবৰ