উচ্চশিক্ষা নিয়েও হাফিজুল সর্দার চাকরি খুঁজলেন না! উল্টে তিনি সুন্দরবনের বুকে নিজের পরিশ্রমে বিরাট ‘সাম্রাজ্য’ গড়ে স্বনির্ভর করছেন গ্রামের বেকারদের
তরুণ নন্দী, কলকাতাঃ
চাকরির পিছনে না ছুটে চাকরি দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন সুন্দরবনের শিক্ষিত যুবক হাফিজুল সর্দার। আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে ৩৫০ ভেড়া ও ছাগলের ফার্ম গড়ে ভালো রোজগার করে অন্যদেরও উৎসাহ জোগাচ্ছেন তিনি। নিজে স্বনির্ভর হওয়ার পাশাপাশি অন্যকেও স্বনির্ভর হওয়ার পথ দেখাচ্ছেন। বর্তমান সময়ে চাকরির বাজারে রয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা। জীবনের মোড় ঘোরাতে দেখা যায় চাকরির জন্য শিক্ষিত যুবকদের দীর্ঘ অপেক্ষা। নিশ্চিত রোজগারের পথে হাঁটার স্বপ্ন নিয়ে সরকারি-বেসরকারি চাকরির আশায় বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছেন অনেকেই। কিন্তু বাস্তবের এই চেনা পথে না হেঁটে একেবারেই অন্যরকম স্বপ্ন দেখেছিলেন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকার যুবক হাফিজুল সর্দার। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, চাকরি না খুঁজে, অন্যের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করব। কঠোর পরিশ্রম আর তাঁর ইচ্ছেশক্তি আজ তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে সাফল্যের অন্য উচ্চতায়।
গৌড়েশ্বর নদীর পাড়ে হিঙ্গলগঞ্জের চার নম্বর স্যান্ডেলবিল গ্রামের বাসিন্দা হাফিজুল সর্দার। প্রত্যন্ত গ্রামে থেকেও প্রাণী পালন বিষয়ে বিএসসি ডিগ্রি রয়েছে তাঁর। উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর ভবিষ্যত গড়তে হাফিজুল চাকরির পিছনে ছোটেননি। অন্যদের পথে না হেঁটে নিজের পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণকে বাস্তব জীবনে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি আধুনিকমানের মাল্টিপারপাস ভেড়া ও ছাগলের ফার্ম।
হাফিজুলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁর এই ফার্ম গড়ে ওঠার শুরুটা অবশ্য খুবটা বড় পরিসর ছিলনা। তবে আত্মবিশ্বাস ছিল নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। স্বপ্নপূরণ করতে নিজের এক টুকরো জমিতেই কয়েকটি গৃহপালিত পশু এনেই শুরু হয়েছিল পথচলা। স্বপ্ন দেখেছিলেন অনেক বড়। সঠিক নিয়মে হেঁটেই নিজের পরিশ্রম, পরিকল্পনাকে সঙ্গী করে গড়ে উঠেছে ফার্ম। সঠিক পরিচর্যায় আজ তাঁর ফার্মে রয়েছে প্রায় ৩৫০টি ভেড়া ও ছাগল। আগামী দিনে নিজের ফার্মে এই সংখ্যাকে ১০০০-এ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে চলেছেন তিনি। শুধু নিজের জন্য হাফিজুল ব্যস্ত নন, তাঁর ফার্ম আজ অন্যদের কাছেও রোজগারের নতুন দরজা খুলে দিয়েছে।
হাফিজুল সর্দার
বর্তমানে এই ভেড়া ও ছাগলের ফার্মে চারজন বেকার যুবক-যুবতী কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। বলা ভালো, হাফিজুলের এই বিরাট উদ্যোগ বদলে দিচ্ছে সুন্দরবন এলাকার বেশ কয়েকটি পরিবারের জীবন। তাঁর নিজের ব্যবসাকে আরও বড় পরিসরে এনে ২০ থেকে ২৫ জন মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা। সুন্দরবনের মতো প্রত্যন্ত এলাকার বহু যুবক যখন কাজের সন্ধানে দূরের শহরে পাড়ি দিতে বাধ্য হন, তখন নিজের গ্রামেই কর্মসংস্থানের পরিবেশ তৈরি করার স্বপ্ন দেখছেন হাফিজুল।
হাফিজুল জানান, নিজের উদ্যোগকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে আরও বড় করে রূপ দিতে হায়দরাবাদের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। পাশাপাশি প্রাণী চিকিৎসার উপর ডিপ্লোমাও করেছেন। ভেড়া ও ছাগলের নানা ঋতুজনিত রোগব্যাধি, চিকিৎসা আর সঠিক পরিচর্যা সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেছেন। তিনি বিশেষ প্রশিক্ষণ নেওয়ায় এখন নিজের ফার্মের পশুদের স্বাস্থ্য দেখভালের সঙ্গে সঙ্গে পরিচর্যা নিজেই সামলে নেন। সুন্দরবনের বুকে এই ফার্ম হাউস গড়ে হাফিজুল বলেন, আজকের দিনে চাষবাস বা প্রাণীপালন কোনও ছোট কাজ নয়। এটা শিক্ষিত মানুষেরও কাজ। নিজেকে বেকার ভেবে বসে না থেকে নিজের ক্ষমতা আর ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে সাফল্য আসবেই।

আসলে হাফিজুল নিজের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আজকের যুবসমাজকে স্বনির্ভর হওয়ার বড় বার্তা দিয়ে দিলেন। ডিগ্রি হাতে নিয়ে শুধু চাকরির বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু তৈরি করাও যে সম্ভব, তা রীতিমত প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়েছেন হাফিজুল। সুন্দরবনের মাটিতে গড়ে ওঠা এই ফার্ম আজ বহু বেকার যুবকের স্বপ্নের ঠিকানা। কারণ, হাফিজুল নিজেও যেমন স্বনির্ভর হয়েছেন তেমনি গ্রামের বেশ কয়েকজন মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে রোজগারের সুযোগ। বলা ভালো, চাকরির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার বদলে তিনি দেখিয়েছেন রোজগারের নতুন পথ।