মালিক আসগর হাসমি
কেরালার পালাক্কাড় জেলার ২৮ বছর বয়সি অ্যাথলিট মহম্মদ আজমল ওয়ারিয়াথোডিকে দেশের ১৭ জন বিশিষ্ট খেলোয়াড়ের সঙ্গে এবারের অর্জুন পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। ভারতীয় সেনায় কর্মরত আজমল এশিয়ান গেমস এবং এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের রিলে প্রতিযোগিতায় পদক জিতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের গৌরব বাড়িয়েছেন। ২০২৩ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের ৪x৪০০ মিটার রিলে হিটে এশিয়ান রেকর্ড গড়ে ফাইনালে প্রবেশ করা তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
এমন একটি বড় জাতীয় সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই আশা করা হয়েছিল যে, এই দৌড়বিদের সাফল্যে সব মহল থেকেই অভিনন্দনের জোয়ার উঠবে। ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রে অর্জুন পুরস্কারকে অত্যন্ত সম্মানজনক স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য করা হয়। দেশের ৩৫ জনেরও বেশি মুসলিম খেলোয়াড় ইতিমধ্যেই এই সম্মান লাভ করেছেন।
দেশের হয়ে খেলার মাঠে অবতীর্ণ একজন খেলোয়াড় সীমান্তে দেশের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত একজন সৈনিকের মতোই। ক্রীড়া ও খেলোয়াড়ের কোনও ধর্ম হয় না। যদি থাকত, তাহলে মহম্মদ আজহারউদ্দিন, সানিয়া মির্জা বা নিখাত জারিনকে ভালোবাসা মানুষের সংখ্যা শুধুমাত্র একটি সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। ভারতে খেলোয়াড়রা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সীমা অতিক্রম করে সমগ্র দেশবাসীর ভালোবাসা পান। তা সত্ত্বেও নিজেদের সমাজের সফল ব্যক্তিদের প্রকাশ্যে প্রশংসা করা সমাজেরও একটি নৈতিক দায়িত্ব।
ভারতীয় সমাজে যখন কোনও খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করেন, তখন সামাজিক সংগঠনগুলির উচিত তাঁদের সম্মান জানানো। এর ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে অনুপ্রেরণা তৈরি হয়। কিন্তু জমিয়ত উলেমা-ই-হিন্দ, জামাত-ই-ইসলামী হিন্দ বা ওয়াকফ বোর্ডের মতো প্রধান মুসলিম সংগঠনগুলির মঞ্চে এমন আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের সম্মান জানানোর দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়।
ক্রীড়া সবসময়ই একটি শক্তিশালী ‘সফট ডিপ্লোমেসি’র মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। ক্রীড়ার মাধ্যমে বিশ্বের বহু বড় রাজনৈতিক উত্তেজনাও হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলির খেলোয়াড়রাও ক্রীড়াসুলভ মনোভাব নিয়ে মুখোমুখি হন। তা সত্ত্বেও বহু সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন ক্রীড়ার গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে কোনও মহিলা খেলোয়াড় এগিয়ে এলে তাঁর সাফল্যের প্রশংসা করার পরিবর্তে অনেক সময় তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ ও জীবনযাপন নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা হয়। সানিয়া মির্জা এবং নিখাত জারিনের ক্ষেত্রেও অতীতে এমন মনোভাব দেখা গেছে।
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছ থেকে অর্জুন পুরস্কার গ্রহণ করছেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের পেস বোলার মহম্মদ শামি
মুসলিম সংগঠনগুলি সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও, তাদের অধিকাংশ মনোযোগ শিক্ষা ও প্রচলিত দাতব্য কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ ক্রীড়া এমন একটি মাধ্যম, যা কোনও দরিদ্র পরিবারের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। একজন খেলোয়াড় যখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছান, তখন তিনি সরকারি চাকরির পাশাপাশি আর্থিক নিরাপত্তা লাভের সুযোগও পান। এর ফলে শুধু তাঁর পরিবারই নয়, গোটা অঞ্চলও এগিয়ে যেতে পারে।
এই ক্ষেত্রে মাদ্রাসাগুলি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মাদ্রাসায় পড়াশোনা করা অধিকাংশ শিশুই দরিদ্র পরিবার থেকে আসে। দেশের প্রতিটি জেলায় ক্রীড়া বিভাগের প্রশিক্ষক নিয়োজিত রয়েছেন। যদি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলি শিশুদের খেলাধুলার মাঠে আসতে উৎসাহ ও সহায়তা করে, তাহলে বহু নতুন প্রতিভা উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে। সমগ্র বিশ্বে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে যুবক-যুবতীরা কঠোর পরিশ্রম ও সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে দারিদ্র্যকে পিছনে ফেলে ক্রীড়াজগতে ইতিহাস রচনা করেছেন।
এই চিন্তা ও প্রয়োজনীয়তাকে সামনে রেখে ‘আওয়াজ দ্য ভয়েস’-এর পক্ষ থেকে অনিকা মাহেশ্বরী একটি নতুন ধারাবাহিক শুরু করেছেন। এই বিশেষ সিরিজে এখনও পর্যন্ত অর্জুন পুরস্কার লাভ করা মুসলিম খেলোয়াড়দের অনুপ্রেরণাদায়ক কাহিনি প্রকাশ করা হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হল সমাজ ও ধর্মীয় সংগঠনগুলির দৃষ্টি ক্রীড়ার প্রতি আকৃষ্ট করা, যাতে নতুন প্রজন্ম এগিয়ে যাওয়ার জন্য একটি সঠিক পথ ও অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারে।