মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যের নতুন ব্যাখ্যা! যাদবপুরের গবেষণায় বিশ্ববিজ্ঞানে আলোড়ন

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 18 h ago
মহাকাশ-সংক্রান্ত গবেষণার  আলোচনায় নিমগ্ন অধ্যাপক ফারুক রহমান এবং তাঁর গবেষক দল
মহাকাশ-সংক্রান্ত গবেষণার আলোচনায় নিমগ্ন অধ্যাপক ফারুক রহমান এবং তাঁর গবেষক দল
 
আওয়াজ দ্য ভয়েস বাংলা

এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড আমাদের জীবনে সবসময় এক রহস্য। যেখানে আমাদের কাছে তা নিয়ে বিশেষ যুক্তি নেই, আছে বিশ্বাস। আর এই যুক্তি তর্ক বিশ্বাসকে মিলিয়ে সূর্য চন্দ্র গ্রহ তারা দের সম্পর্কে এক অভূতপূর্ব তথ্য দান করেছে  বিজ্ঞান। আমাদের বিশ্বাস এই জগতে সব রহস্যের পেছনে রয়েছে সুন্দর এক গল্প। যে গল্প রচনা করেছেন যুগ যুগ ধরে নানা বিজ্ঞানীরা। তাদের অক্লান্ত গবেষণা মানব জীবনকে শুধু সুখকর করে তোলেনি, ছোট্ট শিশুকেও করে তোলে স্বপ্নমুখর। যে তারাদের নিয়ে আমাদের কত কল্পনা, স্বপ্ন, সাহিত্য,রসবোধ। জানা গেল তাদেরও নাকি আছে মৃত্যু। বিজ্ঞানীরা এই তারাদের সৃষ্টি আর তার নিঃশেষ হয়ে যাওয়া নিয়ে এক নতুন গল্প রচনা করেছেন নতুন তথ্য আবিষ্কারের মাধ্যমে। দিয়েছেন তার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। 
 
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ডঃ ফারুক রহমান ও তাঁর গবেষক ছাত্ররা, বিক্রমার্ক এস. চৌধুরী, অরিত্র সান্যাল, আনিকুল ইসলাম ও বিদিশা সামন্ত মিলে মহাবিশ্বের এক রহস্যকে করেছেন উন্মোচন। তার নাম ‘গ্রাভাস্টার’। এই আবিষ্কার সারা বিশ্বে বৈজ্ঞানিক মহলে এক নতুন আলোড়ন ফেলেছে। কারন ‘গ্রাভাস্টার’ হল ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ-গহ্বরের বিকল্প। কি এই ‘গ্রাভাস্টার’? তার জন্য জানতে হবে ব্ল্যাক হোল কি? 
 

আমরা যে তারা দেখি তা হল হাইড্রজেন আর হিলিয়ামের ফিউশন মেথড। এই মেথডের মাধ্যমে তারা থেকে আলো আসে, তাপ আসে। আর এই সব কিছুর উৎস হাইড্রজেন। যখন হাইড্রজেন ফুরিয়ে যায়, তখন ফিউশন মেথডটা আর তৈরি হবেনা। নক্ষত্রের কেন্দ্রে ফিউশন প্রক্রিয়ার ফলে একটি বহির্মুখী (outward) চাপ সৃষ্টি হয়, আর মহাকর্ষ একটি অন্তর্মুখী চাপ বা আকর্ষণ বল সৃষ্টি করে। এই দুই বিপরীতমুখী বলের ভারসাম্যের কারণেই নক্ষত্রটি স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে। যখন হাইড্রজেন ফুরিয়ে যাবে তখন এই চাপ গুলো তৈরি হতে পারবেনা, তখন তারা গুলো আর উজ্জ্বল আলোয় জ্বলবেনা। তারারা সংকুচিত হয়ে যাবে। যখন হাইড্রজেন ফুরিয়ে যায় তখন ছোট তারারা ভৌত জ্যোতির বিজ্ঞানের ভাষায় ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ -এ পরিণত হয়। আর বড় তারারা ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়। 
 
এই ব্ল্যাক হোলে পরিণত হতে হলে ম্যাথেমেটিকাল ডিডাকশানে আইনস্টাইন তাঁর বিখ্যাত  রিলেটিভিটির সাধারণ তত্ত্বে সিঙ্গুলারিটির কথা বলেছেন। অর্থাৎ একটা পয়েন্ট আছে যার ভলিউম শূন্য  কিন্তু তার ডেনসিটি ইনফাইনিট। এই সিঙ্গুলারিটিতে ভৌতবিজ্ঞানের সকল তত্ত্ব বা ল’ ভেঙে পরে। তবে এই বিষয়টি শুধু মাত্র ভাবতে কষ্টকর হত। তখন ২০০১ সালে বিজ্ঞানী পাভেল মাজুর (USA) এবং এমিল মটোলা (USA) একটি বিকল্প ভাবনার প্রস্তাব দিলেন। তারা বলেন  জ্বালানি ফুরিয়ে গিয়ে তারারা মারা যাবে না, সেখানে ‘ভকিউম স্টার’ বা তারা তৈরি হবে। 
 
মহাকাশ-সংক্রান্ত গবেষণার  আলোচনায় নিমগ্ন অধ্যাপক ফারুক রহমান এবং তাঁর গবেষক দল
 
তবে এই তত্ত্বে  অনেক অ্যাপ্রক্সিমেশন ছিল। এই বিষয়ের  ওপর অনেক অ্যাপ্রক্সিমেশন-এর কাজ হলেও অ্যাপ্রক্সিমেশন কেউ অতিক্রম করতে পারেনি।  এখানেই এই প্রথম  অধ্যাপক ডঃ ফারুক রহমান ও তাঁর গবেষক ছাত্ররা প্রথম ব্ল্যাক হোলের বিকল্পের কথা বলেছেন যে বিশাল নক্ষত্ররা সবচেয়ে নাটকীয়ভাবে মারা যায়, সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে তাদের কেন্দ্রস্থল বা কোর ধসে পড়ে। নক্ষত্রটির খোলস ভেতরে আছড়ে পড়ে এবং কেন্দ্রের সাথে ধাক্কা খেয়ে বিস্ফোরিত হয়, যা পুরো গ্যালাক্সির চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
 
নক্ষত্রটি কতটা বিশাল ছিল তার ওপর ভিত্তি করে দুটি ফলাফল হতে পারে: হয় এর কোরটি সংকুচিত হয়ে একটি সুপার-ডেনস ‘নিউট্রন স্টার’ তৈরি করবে, অথবা এটি বাস্তবতা ভেঙে একটি ‘সিংগুলারিটি’তে (Singularity) পরিণত হবে, একটি অসীম ঘনত্বের বিন্দু যার কোনো আকার নেই। এটি এমন এক জায়গা যেখানে মহাবিশ্বের নিয়মগুলো কাজ করে না, একটি ব্ল্যাক হোল।
 
প্রতীকী ছবি
 
এতদিন ধরে মনে করা হতো, বিশাল ভরের নক্ষত্র ধ্বংস হলে তার পরিণতি অনিবার্যভাবে একটি ব্ল্যাক হোল, এক এমন অঞ্চল, যেখানে মহাকর্ষ এতটাই প্রবল যে আলো পর্যন্ত পালাতে পারে না, আর কেন্দ্রে থাকে অসীম ঘনত্বের একটি সিঙ্গুলারিটি। কিন্তু এই গবেষণা দেখাচ্ছে, সেই ভয়ংকর সমাপ্তির বিকল্প পথও থাকতে পারে।তাঁদের মতে, মহাকর্ষীয় পতনের শেষ পরিণতি সবসময় ব্ল্যাক হোল নাও হতে পারে; তার বদলে তৈরি হতে পারে  একটি বিশেষ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু, গ্রাভাস্টার (Gravastar)। 
 
এটি এমন এক মহাজাগতিক বিন্যাস, যা দেখতে বাইরে থেকে ব্ল্যাক হোলের মতো হলেও ভেতরে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। একে তুলনা করা যায় এক ধরনের স্থিতিশীল “মহাজাগতিক সাবানের  বুদবুদ”, যা বিশুদ্ধ শক্তিতে পূর্ণ এবং যার খোলসটি  প্রকৃতির সবচেয়ে অদ্ভুত উপাদান দিয়ে তৈরি।
 
‘গ্রাভাস্টার’ অসীম ঘনত্বের বিন্দুতে পরিণত হওয়ার বদলে, কোরটি যেন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধূলিকণায় পরিণত হয়। পরমাণু এবং কণাগুলো এত জোরে পিষ্ট হয় যে তারা ‘বিশুদ্ধ শক্তিতে’ রূপান্তরিত হয়। ঠিক আমাদের মহাবিশ্বের মতোই, এই বুদবুদটি প্রচণ্ডভাবে প্রসারিত হতে চায়। নক্ষত্রের ধসে পড়া ভর এবং এই প্রসারণশীল শক্তির বুদবুদের মধ্যে এক মহাপ্রলয়ংকারী সংঘর্ষ ঘটে। এর ফলে এমন এক নতুন ধরনের পদার্থ তৈরি হয় যা আগে কখনও দেখা যায়নি। আর এভাবেই জন্ম নেয় একটি ‘গ্রাভাস্টার’।
 
প্রতীকী ছবি
 
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ডঃ ফারুক রহমান ও তাঁর গবেষক ছাত্ররা, বিক্রমার্ক এস. চৌধুরী, অরিত্র সান্যাল, আনিকুল ইসলাম ও বিদিশা সামন্ত, তারা দাবি করেছেন যে এই কাজ ম্যাথমেতিকাল হলেও অত্যন্ত সুশৃখঙ্খল একটি মডেল। তারা দেখিয়েছেন যে গ্রাভাস্টার -এর পাশ  থেকে আলো আসছে তার যে বেন্ডিং হবে তার যে লেন্সিং হবে তা ক্যাল্কুলেট করে দেখিয়েছেন। 
 
এই বিশ্বের অগুনিত রহস্য যেমন আমাদের কল্পনার জগত তৈরি করে ঠিক একই ভাবে এই নতুন  ‘গ্রাভাস্টার’ তথ্য এই মায়াবী  পৃথিবীকে জানতে আরও উৎসুক করে তোলে আমাদের মনকে।


শেহতীয়া খবৰ