নঈম-হাবিবকে নিয়ে দলবদল-যুদ্ধ, জ্যোতিষ গুহর চালেই হার মোহনবাগানের

Story by  Shanti Roy Chowdhury | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 2 h ago
নঈম-হাবিবকে নিয়ে দলবদল-যুদ্ধ, জ্যোতিষ গুহর চালেই হার মোহনবাগানের
নঈম-হাবিবকে নিয়ে দলবদল-যুদ্ধ, জ্যোতিষ গুহর চালেই হার মোহনবাগানের
 
শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরীঃ

বদলে গিয়েছে ভারতীয় ফুটবল, বদলে গিয়েছে কলকাতা ময়দানের ফুটবলের চরিত্রও। হারিয়ে গিয়েছে ৬০ পয়সার গ্যালারি, বদলে গিয়েছে দলবদলের রীতিনীতি। কিন্তু ষাট-সত্তর দশকের সেই রোমাঞ্চকর দিনগুলির গল্প আজও কলকাতা ফুটবলের ইতিহাসের অমূল্য দলিল। সেই সময়ের স্মৃতির পাতা উল্টে দেখাচ্ছেন বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক ও ধারাভাষ্যকার বিপ্লব দাশগুপ্ত। 

নঈম-হাবিবকে নিয়ে ফের মুখোমুখি দুই প্রধান

এক বছর আগের অপূর্ণতা যেন ভুলতে পারেননি মোহনবাগানের রিক্রুটার গজু বসু। নঈম ও হাবিবকে পাওয়ার জন্য ১৯৬৭ সালের দলবদল শুরু হওয়ার অনেক আগেই তিনি হায়দ্রাবাদে গিয়ে নঈমের আত্মীয় গোলাম আমেজ এবং হাবিবের দাদা আজমের সঙ্গে কথাবার্তা চূড়ান্ত করে এসেছিলেন।

সেই সময় মুম্বইয়ে জুনিয়র ভারতীয় দলের ক্যাম্প চলছিল। হায়দ্রাবাদ থেকে মুম্বইয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন গজু বসুও। সেখানেই হাবিবের কলকাতায় আসার ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেন তিনি।

ছক ছিল বেশ নিখুঁত। দলবদল শুরুর দু-তিন দিন আগে, অর্থাৎ ১২ বা ১৩ ফেব্রুয়ারি, নঈম হায়দ্রাবাদ থেকে মাদ্রাজ হয়ে দুপুরের বিমানে কলকাতায় আসবেন। আর সেদিনই বিকেলে মুম্বই থেকে সরাসরি কলকাতায় আসবেন হাবিব।

ইস্টবেঙ্গল কর্তারা এই পরিকল্পনার কিছুই জানতেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গোপন খবর ফাঁস হয়ে যায় মোহনবাগানেরই এক ফুটবলারের মাধ্যমে। খবরটি যে লাল-হলুদ শিবিরেও পৌঁছে গিয়েছে, তা বুঝতে পারেননি গজু বসু।

বিমানবন্দরে নঈমকে ঘিরে লাল-হলুদ সমর্থকদের ভিড়

নঈমকে আনতে গজু বসু নিজেই একজনকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতা বিমানবন্দরে হাজির হন। কিন্তু সেখানে পৌঁছে তাঁর চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। বিমানবন্দর তখন ইস্টবেঙ্গল সমর্থকে পরিপূর্ণ।

সুবীর ঘোষের নেতৃত্বে বিশাল লাল-হলুদ সমর্থক বাহিনী হাজির হয়েছিল বিমানবন্দরে। নঈম বিমান থেকে নামতেই সুবীর ঘোষ ভিতরে ঢুকে তাঁর হাত থেকে সুটকেসটি নিয়ে নেন।

নঈম বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, তিনি ‘গজুদাকে কথা দিয়েছেন’। কিন্তু লাল-হলুদ সমর্থকদের কাছে সেই যুক্তি তখন গুরুত্ব পায়নি। কারণ নঈম আগেই ইস্টবেঙ্গলে থাকার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছিলেন।

শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে নঈম গজু বসুকে বলেন, তিনি জ্যোতিষ গুহর সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জানাবেন। গজু বসুর অবশ্য আর ভরসা হয়নি। নঈমকে পাওয়ার আশা ছেড়ে তাঁকে বিমানবন্দর থেকে খালি হাতেই ফিরতে হয়।

নিঃশব্দে কলকাতায় হাবিব

তবে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের কাছে হাবিবের কলকাতায় আসার খবর তখনও পৌঁছয়নি। ফলে সেদিন বিকেলেই অনেকটা নিঃশব্দে কলকাতায় এসে মোহনবাগানের ডেরায় পৌঁছে যান হাবিব।

মোহনবাগানও তাঁকে সই করানোর প্রস্তুতি শুরু করে দেয়। কিন্তু নঈমের সিদ্ধান্তের ওপর হাবিবের গভীর নির্ভরতার কথা জানতেন মোহনকর্তারা। তাই নঈমকে প্রথম দিন, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ‘উইথড্র’ করানোর পর সেই খবর হাবিবকে জানানো হয়। ঠিক হয়, ১৭ ফেব্রুয়ারি হাবিবকে মোহনবাগানে সই করানো হবে।

কিন্তু তার আগেই খবর পৌঁছে যায় ইস্টবেঙ্গল শিবিরে—হাবিব মোহনবাগানের ডেরায় রয়েছেন।

আইএফএ অফিসে শুরু নাটকের দ্বিতীয় পর্ব

হাবিবের নঈমের প্রতি দুর্বলতার কথা জানতেন ইস্টবেঙ্গল কর্তারা। তাই ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি নঈমকে আইএফএ অফিসে বসিয়ে রাখা হয়েছিল।

অন্যদিকে নঈম সই করবেন—এই আশ্বাস দিয়ে হাবিবকে নিয়ে আইএফএ অফিসের দিকে রওনা হন মোহনবাগানের আর এক রিক্রুটার নবু ঘোষ। হাবিব যাতে নির্বিঘ্নে সই করতে পারেন, সে জন্য আইএফএ অফিস চত্বরও ফাঁকা করে দিয়েছিল পুলিশ।

কিন্তু কেউ জানতেন না, আইএফএ অফিসের ছাদে তখন অন্তত ৩০ জন ইস্টবেঙ্গল সমর্থক অপেক্ষা করছেন।এদিকে ইস্টবেঙ্গল কর্মকর্তা অজয় শ্রীমানির সঙ্গে সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন পিটার থঙ্গরাজ, নঈমুদ্দিন এবং মিডফিল্ডার আফজলও।

সকাল ১১টা নাগাদ হাবিবকে সঙ্গে নিয়ে নবু ঘোষ গাড়ি থেকে নামতেই আইএফএ অফিসের ছাদ থেকে নেমে আসেন ইস্টবেঙ্গল সমর্থকেরা। নবু ঘোষকে কোনওভাবেই পথ ছাড়তে রাজি ছিলেন না তাঁরা।

ঠিক সেই সময় আইএফএ অফিসের দোতলার ব্যালকনি থেকে অজয় শ্রীমানি ও পিটার থঙ্গরাজ সমর্থকদের পথ ছেড়ে দেওয়ার ইঙ্গিত করেন। কিছুটা পথ খুলে যায়।

নঈমকে দেখে চমকে গেলেন হাবিব

হাবিবকে নিয়ে উপরে উঠলেন নবু ঘোষ। কিন্তু সেখানে নঈমকে অজয় শ্রীমানি ও পিটার থঙ্গরাজের সঙ্গে দেখে হাবিব কার্যত চমকে গেলেন।তাহলে নঈম ইস্টবেঙ্গলেই থাকছেন! মোহনবাগান কি তাঁকে ভুল খবর দিয়ে এখানে নিয়ে এসেছে?হাবিবকে নিয়ে দ্রুত আইএফএ দপ্তরের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন নবু ঘোষ। কিন্তু সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ান পিটার থঙ্গরাজ।

এরই মধ্যে সুযোগ বুঝে হাবিবকে কোলে তুলে নিচে নেমে আসেন আর এক হায়দ্রাবাদি ফুটবলার, ১৯৬২ সালের এশিয়ান গেমসে সোনাজয়ী ভারতীয় দলের সদস্য মিডফিল্ডার আফজল। থঙ্গরাজ ও নঈমও দ্রুত নেমে আসেন।নিচে অজয় শ্রীমানির গাড়ি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। সেই গাড়িতে হাবিবকে তুলে সোজা নিয়ে যাওয়া হয় ইস্টবেঙ্গলের ডেরায়।

আতঙ্কিত হাবিবকে সাহস দিয়েছিলেন জ্যোতিষ গুহ

পুরো ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন তরুণ হাবিব। তিনি জ্যোতিষ গুহকে জানিয়ে দেন, এমন পরিস্থিতিতে তিনি কলকাতাতেই থাকতে চান না।

সেই মুহূর্তে হাবিবকে আশ্বস্ত করেছিলেন জ্যোতিষ গুহ। তাঁর বক্তব্য ছিল, ভয় পাওয়ার কিছু নেই—ইস্টবেঙ্গল তাঁর পাশে রয়েছে এবং সামনে তাঁর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

জ্যোতিষ গুহ হাবিবকে আরও বোঝান, আগেরবার তাঁকে কলকাতায় এনে তিনি যে প্রত্যাশা করেছিলেন, হাবিব তার থেকেও বেশি করে নিজেকে মেলে ধরেছেন। বয়স কম হওয়ায় কোনও ভুল সিদ্ধান্ত নিলে ভবিষ্যতে ক্ষতি হতে পারে বলেও তাঁকে সতর্ক করেছিলেন তিনি।

জ্যোতিষ গুহর সেই কথাগুলিই শেষ পর্যন্ত হাবিবের মনে গেঁথে যায়। দু’দিন পর, সোমবার ১৯ ফেব্রুয়ারি, ইস্টবেঙ্গলের পক্ষেই ‘উইথড্র’ করেন মোহাম্মদ হাবিব।

দূরদর্শী জ্যোতিষ গুহ

এরপরের ইতিহাস ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের অজানা নয়। ১৯৬৭ সাল থেকেই ভারতীয় দলে অপরিহার্য হয়ে উঠতে শুরু করেন মোহাম্মদ হাবিব। ক্লাব ফুটবলেও তিনি হয়ে ওঠেন ভারতের অন্যতম সফল ফুটবলার।

হাবিবের মধ্যে ভবিষ্যতের এক বড় ফুটবলারকে অনেক আগেই চিনে নিয়েছিলেন ইস্টবেঙ্গলের প্রাণপুরুষ জ্যোতিষচন্দ্র গুহ। দলবদলের সেই রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে তাই ফের একবার তাঁর দূরদর্শিতা ও কৌশলের কাছে পিছিয়ে পড়েছিল মোহনবাগান।

ষাটের দশকের কলকাতা ময়দানে দলবদল যে শুধু চুক্তি আর স্বাক্ষরের বিষয় ছিল না, বরং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকত উত্তেজনা, কৌশল, আবেগ এবং সমর্থকদের উন্মাদনা—নঈম-হাবিবকে ঘিরে ১৯৬৭ সালের এই ঘটনাই তার জীবন্ত প্রমাণ।