গাড়ির হর্ন শুনেই বুঝেছিলেন থঙ্গরাজ এসেছেন! গেঞ্জি-হাফপ্যান্ট পরেই মোহনবাগানের ডেরা থেকে বেরিয়ে গেলেন পুঙ্গম কান্নান
শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী
ষাট-সত্তরের কলকাতা ময়দান। তখন দলবদল মানেই শুধু সই-সাবুদ নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকত টানটান উত্তেজনা, গোপন যোগাযোগ আর কখনও কখনও সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানানো ঘটনা। ভারতের অন্যতম সেরা ইনসাইড ফরওয়ার্ড পুঙ্গম কান্নানকে ঘিরে ১৯৬৯ সালের এমনই এক দলবদলের গল্প আজও ময়দানের স্মৃতিতে জীবন্ত।ঘটনাটি উঠে এসেছে বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক ও ধারাভাষ্যকার বিপ্লব দাশগুপ্তের স্মৃতিচারণে।
পুঙ্গম কান্নান
মোহনবাগানের কড়া পাহারায় কান্নান
১৯৬৮ সালে দুরন্ত ফর্মে ছিলেন পুঙ্গম কান্নান। মুম্বাই থেকে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন মোহনবাগানের রিক্রুটার গজু বসু। ফলে তাঁকে ধরে রাখতে দলবদলের আগেই শুরু হয়েছিল কড়া পাহারা।বেঙ্গালুরু থেকে কান্নানকে কলকাতায় এনে ভবানীপুরে শিশির ব্যানার্জীর বাড়িতে রাখা হয়েছিল। দায়িত্বে ছিলেন গজু বসু। মোহনবাগানের ধারণা ছিল, কান্নানকে নিয়ে আর কোনও সংশয় নেই, তিনি তাঁদেরই দলে থাকছেন। কিন্তু আড়ালে তখন অন্য গল্প লিখে চলেছেন ইস্টবেঙ্গলের তৎকালীন অধিনায়ক পিটার থঙ্গরাজ।
গাড়ির হর্নেই মিলল সংকেত
কান্নানের সঙ্গে অনেক আগেই যোগাযোগ তৈরি করেছিলেন থঙ্গরাজ। মোহনবাগানের কড়া নজরদারির মধ্যেও সেই যোগাযোগের খবর টের পাননি গজু বসুরা। একদিন দুপুরে শিশির ব্যানার্জীর বাড়ির সামনে আচমকা একটি গাড়ির হর্ন বেজে উঠল। তখন স্নান সেরে খেতে বসেছেন কান্নান। পরনে হাফপ্যান্ট, গায়ে গেঞ্জি, পায়ে হাওয়াই চটি। হর্ন শুনেই বুঝে গেলেন, থঙ্গরাজ এসে গিয়েছেন।
দ্রুত জানালার কাছে গিয়ে ইশারায় তাঁকে অপেক্ষা করতে বললেন কান্নান। এরপর শিশির ব্যানার্জীকে বললেন, তাঁর এক বন্ধু এসেছে, একটু কথা বলে আসছেন। কান্নানের গায়ে তখন গেঞ্জি, পরনে হাফপ্যান্ট, পায়ে চটি। এমনকি হাতে খাবারের এঁটোও লেগে ছিল। তাই তাঁর কথায় কোনও সন্দেহ করেননি শিশিরবাবু।
পরপর দু’বার হর্ন, তারপরই চমক
কিছুক্ষণ পর গাড়ির হর্ন পরপর দু’বার বেজে উঠল। এবার জানালার সামনে গিয়ে শিশির ব্যানার্জী যা দেখলেন, তাতে আর কিছু বোঝার বাকি রইল না। কান্নান ইতিমধ্যেই গাড়িতে উঠে বসেছেন। আর স্টিয়ারিংয়ে বাঁ হাত রেখে ডান হাত দিয়ে শিশিরবাবুকে ‘টা-টা’ জানাচ্ছেন পিটার থঙ্গরাজ! মুহূর্তের মধ্যেই মোহনবাগানের কড়া পাহারা পেরিয়ে কান্নান চলে গেলেন ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে।
পিটার থঙ্গরাজ
এক বছর পর ‘মধুর প্রতিশোধ’
এই ঘটনাকে অনেকটা এক বছর আগের দলবদল-যুদ্ধের পাল্টা জবাব হিসেবেই দেখা হয়। কান্নানকে দলে নেওয়ার ক্ষেত্রে মোহনবাগানের রিক্রুটার গজু বসুকে কার্যত ধোঁকা দিয়ে সফল হয়েছিলেন থঙ্গরাজ। পরে পিটার থঙ্গরাজের মুখে কান্নানকে এভাবে নিয়ে যাওয়ার কাহিনি শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন গজু বসুরা।
আজকের কোটি টাকার দলবদলের যুগে সেই গল্প হয়তো অবিশ্বাস্য শোনায়। কিন্তু ষাট-সত্তরের কলকাতা ময়দানে দলবদল এমনই ছিল, তারকা ফুটবলারদের ঘিরে লড়াই, গোপন যোগাযোগ আর শেষ মুহূর্তের চমক। পুঙ্গম কান্নানকে ঘিরে পিটার থঙ্গরাজের সেই ‘গাড়ির হর্ন’-এর কাহিনি তাই কলকাতা ফুটবলের পুরনো দিনের এক অনন্য স্মৃতি হয়ে রয়েছে।