শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী
বদলে গিয়েছে কলকাতা ময়দানের ফুটবল। হারিয়ে গিয়েছে ৬০ পয়সার গ্যালারি, বদলেছে দলবদলের চরিত্রও। কিন্তু পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তরের দশকের সেই রোমাঞ্চকর দিনগুলির স্মৃতি আজও অমলিন। সেই সময়েরই এক দারুণ দলবদল-যুদ্ধের গল্প, হাবিব ও নঈমুদ্দিনকে ঘিরে জ্যোতিষ গুহ ও ধীরেন দে'র টানাপোড়েন।বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক ও ধারাভাষ্যকার বিপ্লব দাশগুপ্তের স্মৃতি।
কলকাতা ময়দানে দক্ষিণ ভারতের খ্যাতনামা ফুটবলারদের আগমন শুরু হয়েছিল কয়েক দশক আগেই। সেই সময় ভিনরাজ্যের প্রতিভাবান ফুটবলারদের কলকাতায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে ইস্টবেঙ্গলের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। আর এই কাজে লাল-হলুদের তৎকালীন সচিব জ্যোতিষচন্দ্র গুহ ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। তরুণ প্রতিভা খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে তাঁর ছিল অসাধারণ নজর। বিশেষ করে ভিনরাজ্যের প্রতিভাবান ফুটবলারদের দিকে তাঁর নজর থাকত সবসময়।
মোহনবাগান রত্ন ধীরেন দে-র সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী
১৯৬৬ সালের দিকে তাঁর নজরে পড়েন হায়দরাবাদের দুই প্রতিভাবান ফুটবলার, ডিফেন্ডার সৈয়দ নঈমুদ্দিন এবং ইনসাইড ফরওয়ার্ড মোহাম্মদ হাবিব। নঈমুদ্দিন তখন ১৯৬৪ সাল থেকেই ভারতীয় দলে খেলছেন। তুলনায় হাবিব ছিলেন তরুণ। ১৯৬৫ সালের আইএফএ শিল্ডে দু'জনেই নজর কেড়েছিলেন। তখনই তাঁদের দলে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন জ্যোতিষ গুহ।
১৯৬৫-৬৬ মরশুমের সন্তোষ ট্রফির আসর বসেছিল কুইলনে। সেই আসরে হাজির ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের সচিব জ্যোতিষ গুহ। মোহনবাগানের পক্ষ থেকেও সেখানে উপস্থিত ছিলেন ক্লাবের অন্যতম দক্ষ রিক্রুটার গজু বসু।
রিপ্লে সেমিফাইনালে হায়দরাবাদের কাছে হেরে যায় বাংলা। সেই ম্যাচে নঈমুদ্দিন ও হাবিব দুর্দান্ত ফুটবল খেলেন। তবে তার আগেই তাঁদের সঙ্গে কথা এগিয়ে রেখেছিলেন জ্যোতিষ গুহ। সেমিফাইনালের প্রায় সাত দিন আগে দু'জনের সঙ্গে পাকা কথাও হয়ে গিয়েছিল। সেই অনুযায়ী তাঁরা আন্তঃরাজ্য ছাড়পত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন। জ্যোতিষ গুহ সেই ছাড়পত্রের কাগজ ডাকযোগে এআইএফএফ দফতরে পাঠিয়েও দিয়েছিলেন।
প্রবাদপ্রতিম ক্রীড়া প্রশাসক ও প্রাক্তন গোলরক্ষক জ্যোতিষচন্দ্র গুহ
বাংলা সেমিফাইনালে হেরে যাওয়ার পর জ্যোতিষ গুহ ও তাঁর সঙ্গীরা কুইলন ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। কিন্তু মোহনবাগানের গজু বসু থেকে যান কুইলনে। তাঁরও লক্ষ্য তখন নঈমুদ্দিন ও হাবিব। ম্যাচের পর গজু বসু দুই ফুটবলারকে দশপ্রকাশ হোটেলে নিয়ে গিয়ে কথা বলেন। তাঁর প্রস্তাবেও রাজি হয়ে যান নঈম ও হাবিব। বিশেষ করে হাবিব তখন অত্যন্ত তরুণ ছিলেন। নঈম রাজি হওয়ায় তিনিও মোহনবাগানের প্রস্তাবে সম্মতি দেন।
এরপর গজু বসু দু'জনকে আবারও আন্তঃরাজ্য ছাড়পত্রে স্বাক্ষর করান এবং সেই কাগজ এআইএফএফের তৎকালীন সচিব জিয়াউদ্দিনের কাছে জমা দেন। দুই ফুটবলারকে পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েই কলকাতায় ফেরেন তিনি। তাঁর চোখেমুখে তখন ছিল যেন যুদ্ধ জয়ের আনন্দ।
কিন্তু কলকাতায় ফিরেই পরিস্থিতি বদলে যায়। খবরটি জ্যোতিষ গুহর কানে পৌঁছতেই তিনি ক্ষুব্ধ হন। মোহনবাগানের কর্ণধার ধীরেন দে-কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি বলেন, নঈম ও হাবিব ইতিমধ্যেই ইস্টবেঙ্গলের হয়ে স্বাক্ষর করেছেন। এরপরও যদি মোহনবাগান তাঁদের খেলায়, তাহলে তিনি মামলা করবেন।
প্রতীকী ছবি
জ্যোতিষ গুহর হুঁশিয়ারি হালকাভাবে নেননি ধীরেন দে। তিনি জানতেন, আইনি লড়াইয়ে যেতে জ্যোতিষ গুহ পিছপা হন না। শেষ পর্যন্ত মোহনবাগান নঈম ও হাবিবকে ছেড়ে দেয়। এইভাবে হাবিব-নঈমকে দলে নেওয়ার প্রথম দফার লড়াইয়ে জয়ী হয় ইস্টবেঙ্গল। কিন্তু দুই প্রধানের সেই যুদ্ধ সেখানেই শেষ হয়নি। নঈমুদ্দিন ও মোহাম্মদ হাবিবকে পাওয়ার জন্য পরবর্তী লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু করে ধীরেন দে ও তাঁর সঙ্গীরা।