হাবিবের দর ছিল মাত্র ৫ হাজার, আমেদ খানের পারিশ্রমিক আড়াই হাজার, কলকাতা ময়দানের ফুটবলের সেই দিনগুলোর গল্প

Story by  Shanti Roy Chowdhury | Posted by  Aparna Das • 54 m ago
হাবিবের দর ছিল মাত্র ৫ হাজার, আমেদ খানের পারিশ্রমিক আড়াই হাজার, কলকাতা ময়দানের ফুটবলের সেই দিনগুলোর গল্প
হাবিবের দর ছিল মাত্র ৫ হাজার, আমেদ খানের পারিশ্রমিক আড়াই হাজার, কলকাতা ময়দানের ফুটবলের সেই দিনগুলোর গল্প
 
শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী

কলকাতা ময়দানের ফুটবল মানেই একসময় ছিল আবেগ, তারকা খেলোয়াড় আর মাঠের বাইরের নানা অজানা গল্প। ষাট-সত্তর দশকের সেই ময়দানের দিনগুলোর বহু স্মৃতি এখনও স্পষ্ট ৮৫ বছর বয়সি বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক চিরঞ্জিবের মনে। অতীতের সেই দিনগুলির কথা বলতে গিয়ে তিনি  আওয়াজ দ্য ভয়েসকে তুলে ধরেছেন ফুটবলারদের পারিশ্রমিক, ক্লাবের নিয়ম এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে সাংবাদিকদের দূরত্বের নানা অজানা অধ্যায়। 
 
১৯৬৫ সাল থেকে খেলোয়াড়দের নিয়ে ‘নখদর্পণে’ নামে ফিচার লেখা শুরু করেছিলেন চিরঞ্জিব। সকালে অনুশীলন থাকলে তিনটি মাঠেই ঘুরে বেড়াতেন তিনি। কিন্তু তখন সাংবাদিকদের জন্য খেলোয়াড়দের কাছে পৌঁছনো মোটেই সহজ ছিল না। ক্লাবের কড়া নিষেধাজ্ঞার কারণে দূর থেকে প্রিয় খেলোয়াড়দের দেখা কিংবা কর্মকর্তাদের ডাকে এক কাপ চা খাওয়া, এই ছিল ভরসা। অর্থাৎ খেলোয়াড়দের খুব কাছাকাছি থেকেও তাঁদের থেকে কার্যত অনেক দূরেই থাকতে হতো সাংবাদিকদের।
 
ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা মহম্মদ হাবিব
 
স্থানীয় ফুটবলাররাও অনুশীলনের পর খুব একটা আড্ডায় বসতেন না। প্র্যাকটিস শেষে ক্লাব টেন্টে দ্রুত স্নান ও জলখাবার সেরে অফিস কিংবা বাড়ির উদ্দেশে বেরিয়ে যেতেন তাঁরা। ব্যতিক্রম ছিলেন হাবিব। অনুশীলনের পরেও টেন্টের পাশে নানা ধরনের ব্যায়াম করতেন তিনি। কিন্তু ক্লাবের নিষেধাজ্ঞার কারণে সেখানেও সাংবাদিকদের যাওয়ার সুযোগ ছিল না।
 
মোহনবাগানে অনুশীলনে আসা কান্নানও ছিলেন অত্যন্ত চুপচাপ। তাঁর সম্পর্কে কিছু জানতে হলে কর্মকর্তাদের কাছেই যেতে হতো। তাঁদের অনুমতি মিললে তবেই খেলোয়াড়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যেত, সেটিও খুব অল্প সময়ের জন্য। কয়েকটি কথা বলে নোট নিয়ে ফিরে আসাই ছিল নিয়ম।
 
সময়ের সঙ্গে সেই পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। এখন অনুশীলনের পর খেলোয়াড় ও কোচের সঙ্গে সহজেই কথা বলা যায়। কিন্তু ষাট-সত্তরের দশকে ফুটবলারদের পারিশ্রমিকের অঙ্কও ছিল আজকের তুলনায় অবিশ্বাস্য রকম কম।
 
একদিন ময়দানে খবর ছড়িয়েছিল, হাবিবকে কলকাতায় খেলাতে হলে বেশ কিছু টাকা দিতে হবে। কিন্তু অঙ্কটা কত, তা জানা যাচ্ছিল না। ইস্টবেঙ্গলের রিক্রুটদের দাবি ছিল, এটি নাকি মোহনবাগানের প্রচার। পরে অবশ্য জানা যায়, হাবিবের দাদা আজম মাত্র ৫ হাজার টাকা চেয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, হাবিব চাকরি করবেন না; খেলার বাইরে তাঁকে আর কিছু দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
 
আজকের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে ৫ হাজার টাকার সেই অঙ্ক অবিশ্বাস্য বলেই মনে হয়। কিন্তু তখন কলকাতায় খেলার সুযোগকেই বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখা হতো। কয়েক বছর কলকাতার ময়দানে খেললেই একজন ফুটবলার নিজেকে ‘কমপ্লিট ফুটবলার’ হিসেবে তৈরি করতে পারতেন, এমনটাই ছিল সেই সময়ের ধারণা।
 
আরও অবাক করার মতো তথ্য রয়েছে আমেদ খানের ক্ষেত্রে। চিরঞ্জিবের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, তাঁর মতো তারকা ফুটবলারও সর্বাধিক আড়াই হাজার টাকা পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন। মূলত সত্তরের দশক থেকেই ফুটবলারদের অর্থ উপার্জনের সুযোগ বাড়তে শুরু করে।
 
তবে নব্বইয়ের দশকে এসে ফুটবলের বাজারে অর্থের অঙ্ক দ্রুত বদলে যায়। ১৯৯৫ সালে বাইচুং ভুটিয়া যখন কলকাতা ছেড়েছিলেন, তখন তাঁর দাম ছিল ৫ লক্ষ টাকা। মাত্র এক বছর পর কলকাতায় ফিরে আসার সময় তাঁর দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ লক্ষ টাকা।
 
খালি পায়ের কিংবদন্তী ফুটবলার আহমেদ খান
 
এরপর থেকেই ফুটবলারদের পারিশ্রমিকে ছয় অঙ্কের নিচের অঙ্ক যেন গুরুত্ব হারাতে শুরু করে। চার, পাঁচ কিংবা সাত লক্ষ টাকা তখন আর বড় অঙ্ক বলে মনে করা হতো না। মোহনবাগানের তৎকালীন সচিব টুটু বসুর সময় থেকেই এই পরিবর্তনের সূত্রপাত বলে উল্লেখ করেছেন চিরঞ্জিব।
 
১৯৯২ সালে জাতীয় লিগের প্রথম মরশুম শুরু হওয়ার সময় তিন প্রধান, মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ও মহামেডান স্পোর্টিংয়ের বাজেটও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। সেই সময় তিন প্রধানের বাজেট ছিল প্রায় ৫০ থেকে ৮০ লক্ষ টাকা।
 
মোহনবাগানের তৎকালীন সচিব অঞ্জন মিত্র একবার বলেছিলেন, স্পনসরদের কাছ থেকে যদি ক্লাব টাকা পায়, তাহলে খেলোয়াড়রা সেই অর্থের অংশীদার হবেন না কেন? দীর্ঘদিন মোহনবাগানের ফুটবলার রিক্রুটমেন্টের দায়িত্বে থাকা সজল বসু, যিনি ‘গজু’ নামে পরিচিত, অবশ্য মনে করতেন, মোহনবাগান পারিশ্রমিকের বাজারদর কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল ঠিকই। কিন্তু পরবর্তীকালে যোগ্য ফুটবলারের সংখ্যা কমে যাওয়ায় অযোগ্য বা তুলনামূলক কম মানের খেলোয়াড়রাও বেশি অর্থ পেতে শুরু করেন।
 
ষাট-সত্তরের দশকে কয়েক হাজার টাকার পারিশ্রমিক থেকে নব্বইয়ের দশকে লক্ষ লক্ষ টাকার বাজার, কলকাতা ময়দানের ফুটবলের এই দীর্ঘ যাত্রা শুধু অর্থের পরিবর্তনের গল্প নয়, বরং বদলে যাওয়া পেশাদার ফুটবল সংস্কৃতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।