ভারতীয় মুসলমানদের ভবিষ্যৎ: শুধু অস্তিত্ব রক্ষাই শেষ কথা নয়

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 2 h ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
  এস ওয়াই কুরেশি 

দশকের পর দশক ধরে ভারতীয় মুসলমানদের নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে থেকেছে অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁদের সম্পর্কে অন্যরা কী ভাবেন, কী বলেন কিংবা তাঁদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন। কিন্তু সময় এসেছে আলোচনার দিক বদলে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে আনার, ভারতীয় মুসলমানরা নিজেদের সম্পর্কে কী ভাবছেন এবং তাঁরা নিজেদের জন্য ঠিক কেমন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চান? এই প্রশ্নটি এমন এক অস্বাভাবিক কঠিন সময়ে উঠছে, যখন সম্প্রদায়টির একটি বড় অংশ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায় ভুগছে, এই বিষয়টি কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না।

বছরের পর বছর ধরে বেড়ে চলা মেরুকরণ, ঘন ঘন বিদ্বেষমূলক ভাষণ, উন্মত্ত জনতার হিংসা এবং প্রায়ই বৈষম্যমূলক বা বর্জনমূলক বলে মনে করা সরকারি নীতিগুলি বহু মুসলমানকে ক্রমশ নিরাপত্তাহীন ও বিচ্ছিন্ন বোধ করিয়েছে। এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুযোগের সংকোচন, সংখ্যালঘু-কেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি শিক্ষামূলক ও কল্যাণমূলক প্রকল্পের পরিবর্তন বা প্রত্যাহার এবং এগিয়ে যাওয়ার পথগুলি আগের তুলনায় সংকুচিত হয়ে আসছে, এমন ব্যাপক ধারণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এই সমস্ত ধারণা বস্তুনিষ্ঠভাবে যুক্তিসঙ্গত কি না, তা আলাদা বিষয়। কিন্তু এই অনুভূতিগুলি একেবারেই বাস্তব। এর ফলে আশঙ্কা ও নীরব প্রত্যাহারের একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পরিবারগুলি এখন উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিবর্তে নিরাপত্তা নিয়ে বেশি আলোচনা করে। বাবা-মায়েরা তাঁদের সন্তানদের নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করার চেয়ে তাঁদের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি চিন্তিত।
 
ড্রয়িংরুম হোক, মসজিদ হোক কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া, সম্প্রদায়ের মধ্যে হওয়া আলোচনাগুলি কেবল সাম্প্রতিক বিতর্ক, সাম্প্রতিক বিদ্বেষমূলক ভাষণ, সাম্প্রতিক গ্রেফতার, সাম্প্রতিক উচ্ছেদ কিংবা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিপর্যয়ের আশেপাশেই ঘুরপাক খায়।
 
এই উদ্বেগগুলি কাল্পনিকও নয় বা তুচ্ছও নয়। এগুলিকে অত্যন্ত সততার সঙ্গে স্বীকার করা উচিত। একইসঙ্গে আমি এই প্রবন্ধটি আসলে কী নয়, সে বিষয়েও স্পষ্ট করতে চাই। এটি এমন কোনও যুক্তি নয় যে ভারতীয় মুসলমানদের রাষ্ট্রকে কঠিন প্রশ্ন করা বন্ধ করা উচিত, কিংবা ক্ষোভের পরিবর্তে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। সাংবিধানিক অধিকার সদাচরণের বিনিময়ে পাওয়া কোনও অনুগ্রহ নয়; এগুলি নিশ্চিত অধিকার এবং আদালত, সংসদ ও জনসাধারণের আলোচনায় দৃঢ়ভাবে, শান্তিপূর্ণভাবে এবং গণতান্ত্রিক উপায়ে এগুলিকে রক্ষা করে যেতে হবে।
 
নিচে উল্লেখ করা কোনও কথার অর্থ এই নয় যে সেই দাবিগুলিকে দুর্বল করা হচ্ছে বা পরিবর্তনের দায়িত্ব কেবল সম্প্রদায়টির উপরেই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একেবারেই তা নয়। তবুও, বৈষম্য ও অবহেলার বিপদের বাইরেও আরও একটি ভয়ংকর বিপদ এসে পড়েছে। সেটি হল, আমাদের সামষ্টিক কল্পনাশক্তি সংকুচিত হয়ে আসছে। যখন একটি সম্প্রদায় কেবল তাদের সঙ্গে কী ঘটছে, তার ভিত্তিতেই নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলতে শুরু করে, তখন ভবিষ্যতে তারা কী হতে চায়, সে বিষয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে।
 
তাঁরা একটি খবর থেকে অন্য একটি খবর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে শুরু করেন। তাঁরা প্রতিক্রিয়া জানান, প্রতিবাদ করেন, উদ্বিগ্ন হন এবং কেবল টিকে থাকেন, কিন্তু স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দেন। আবার উঠে দাঁড়ানোর নিজেদের যে সামর্থ্য রয়েছে, সেটিও তাঁরা ভুলে যান।
 
রাষ্ট্রকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা, এই দুটি পরস্পরবিরোধী কাজ নয়। যে সম্প্রদায় কেবল প্রথম কাজটি করে দ্বিতীয়টিকে অবহেলা করে, তারা কোনও একটি সরকারি নীতি যতটা কেড়ে নিতে পারে, তার চেয়েও বেশি নিজেদের ভবিষ্যৎ অন্যের হাতে তুলে দেয়।
 
প্রতীকী ছবি
 
নিরাপত্তাহীনতার সময় সাধারণত দুটি প্রবণতার জন্ম দেয়। প্রথমটি হল প্রত্যাহার: ক্ষোভে ডুবে থাকা, অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করা এবং একটি বিতর্ক থেকে অন্য একটি বিতর্ক পর্যন্ত বেঁচে থাকা। দ্বিতীয়টি হল নবজাগরণ: নিজেদের অধিকার বা আশা বিসর্জন না দিয়ে একটি সম্প্রদায় কীভাবে নিজেদের ভিতর থেকে শক্তিশালী করতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। এই দুটি একে অপরের বিকল্প নয়। একটি সম্প্রদায় ন্যায়ের দাবি জানিয়ে যেতে পারে এবং একইসঙ্গে শুধুমাত্র ন্যায়ের অভাবের দ্বারাই নিজেদের পরিচয় গড়ে তোলা থেকেও বিরত থাকতে পারে।
 
ভবিষ্যৎ গড়ার আত্মবিশ্বাস কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা আদালতের বিজয় থেকে আসে না, যদিও সেগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিশ্বাস সমাজের ভিতর থেকেই, পরিবার, প্রতিবেশী, মসজিদ, পেশাদার নেটওয়ার্ক এবং জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে জাগ্রত হতে হবে। যুগ যুগ ধরে ‘জাকাত’ ও ‘ওয়াকফ’-কে করুণা ও সহায়তার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। হয়তো এখন এগুলিকে আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ভাবার সময় এসেছে: শুধু দুর্দশাগ্রস্তদের সাহায্যের মাধ্যম হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ হিসেবেও। স্কলারশিপ, গ্রন্থাগার, দক্ষতা বিকাশ কেন্দ্র, গবেষণা ফেলোশিপ, ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম এবং বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলি এমন সুযোগ তৈরি করতে পারে, যেগুলি আজকের বিতর্কগুলি থেমে যাওয়ার বহু পরেও টিকে থাকবে।
 
যাঁরা ইতিমধ্যেই জীবনে সফল হয়েছেন, তাঁদের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি স্বচ্ছল পরিবার, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠিত পেশাদার এবং সফল উদ্যোক্তা অন্তত একজন শিশু বা তরুণ শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিয়ে তাঁর জীবন বদলে দিতে পারেন, তা স্কুলের ফি দেওয়া, পরামর্শ দেওয়া, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া কিংবা পেশাদার জীবনে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সহায়তা করা যাই হোক না কেন। সরকারের কোনও প্রকল্পই এমন লক্ষ লক্ষ নীরব সংহতির শক্তির সমকক্ষ হতে পারে না।
 
আমাদের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জটি শুধু শিক্ষাগত বা অর্থনৈতিক নয়; এটি মানসিকও। উদ্বেগের মধ্যে বড় হয়ে ওঠা একটি প্রজন্মের উত্তরাধিকারসূত্রে শুধু উদ্বেগ পাওয়া উচিত নয়। তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা অর্জন করতে হবে।
 
এই প্রচেষ্টায় শিক্ষা কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে, শুধু স্লোগান হিসেবে নয়, একটি নিরন্তর সাধনা হিসেবে। অভিজ্ঞতা বারবার প্রমাণ করেছে যে সম্প্রদায়গুলি শুধু রাজনৈতিক একত্রীকরণের মাধ্যমে নয়, বরং ধৈর্যের সঙ্গে জ্ঞান, দক্ষতা ও উৎকর্ষতা অর্জনের মাধ্যমেই প্রতিকূলতা অতিক্রম করতে পারে।
 
স্কুল ও কলেজের শিক্ষাকে শুধু ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়; এটি দক্ষতা, অনুসন্ধিৎসা এবং বৌদ্ধিক আত্মবিশ্বাসের অন্বেষণ হতে হবে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সম্প্রদায়টিকে তাদের কারিগরি দক্ষতা, উদ্যোগ এবং বৃত্তিমূলক দক্ষতার দীর্ঘ ও গৌরবময় ঐতিহ্যকে নতুন রূপ দিতে হবে।
 
প্রতীকী ছবি
 
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বাজার দ্বারা পরিচালিত এই যুগে দক্ষতা বিকাশ শুধু ঐতিহ্যবাহী পেশার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তরুণ মুসলমানদের নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক ব্যবসায়িক পদ্ধতি এবং সমসাময়িক বিপণন পদ্ধতি গ্রহণ করতে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তাঁরা এমন সুযোগের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেন, যেগুলির অস্তিত্ব এক প্রজন্ম আগেও ছিল না।
 
উৎকর্ষতার উপর নির্মিত যেকোনও যুক্তির ক্ষেত্রে একটি যৌক্তিক আপত্তি থাকতে পারে: এটি বৈষম্যের শিকার মানুষদের শুধু আরও বেশি পরিশ্রম করতে বলার মতো হয়ে উঠতে পারে, যেন পক্ষপাতিত্ব কেবল অপর্যাপ্ত মেধারই সমস্যা। কিন্তু এখানে এমন কোনও দাবি করা হচ্ছে না।
 
উৎকর্ষতা পক্ষপাতিত্ব দূর করতে পারে না এবং সমতার অধিকার পাওয়ার জন্য কাউকে অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ ভালো হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু ন্যায়ের জন্য প্রতিটি ন্যায্য দাবি জানানোর পর যে জায়গাটি অবশিষ্ট থাকে, সেখানে উৎকর্ষতা হল এমন একমাত্র শক্তি, যা একটি সম্প্রদায় অন্য কারও অনুমতির প্রয়োজন ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজেদের শর্তে গড়ে তুলতে পারে।
 
এটি অধিকারের লড়াইকে পরিপূর্ণতা দেয়; এর বিকল্প নয়। শিক্ষার্থীদের শুধু যোগ্যতা অর্জন করাই নয়, নিজেদের নির্বাচিত ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ সম্মান ও প্রভাব শুধু সংখ্যা বা রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে আসে না, এগুলি আসে দক্ষতা, সততা এবং প্রমাণিত কৃতিত্ব থেকে।
 
এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু সাফল্যের প্রচলিত ধারণার বাইরে যেতে হবে। ভবিষ্যৎ সেই সমাজগুলিরই হবে, যারা নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণ করতে পারে, প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারে। ভারতীয় মুসলমানদের পাণ্ডিত্য, উদ্যোগ এবং সমাজসেবার দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। তাঁদের সামনে থাকা কাজটি অতীতকে পুনরায় সৃষ্টি করা নয়, বরং একটি নতুন প্রজন্মকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভারতে বিকশিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত করাই।
 
উৎসাহজনক লক্ষণ ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে, যদিও কোনও একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ ব্যাপক ধারণার প্রমাণের পরিবর্তে কেবল একটি দৃষ্টান্ত। সম্প্রতি দিল্লির একটি ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সময় স্থানীয় মুসলিম দোকানিরা ভিতরে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার করতে গদি ও কম্বল বিছিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সারা দেশেই মাঝেমধ্যে এমন আবেগঘন ঘটনা দেখা যায়, যেখানে মুসলমানরা দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ব্যক্তিগত সংকটের সময় হিন্দু প্রতিবেশীদের সাহায্য করেন এবং বিনিময়ে কৃতজ্ঞতা ও সদিচ্ছা লাভ করেন।
 
এই ধরনের মুহূর্তগুলি ভারতের সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের অবস্থা নিয়ে চলা বৃহত্তর বিতর্কগুলির অবসান ঘটায় না। কিন্তু এগুলি মনে করিয়ে দেয় যে রাজনীতি ও সোশ্যাল মিডিয়ার কোলাহলের মধ্যেও মানবতা সম্ভব, এবং প্রতিটি খবরের আড়ালে ভারতীয় মুসলমানরা ধীরে ধীরে কী ধরনের একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারেন, তার আভাসও দেয়।
 
প্রতীকী ছবি
 
হয়তো তখন সম্প্রদায়টির সামনে থাকা কাজটি শুধু নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার চেয়েও বৃহত্তর হয়ে উঠবে। স্কুল, হাসপাতাল, স্কলারশিপ, সাহায্যের কাজ, পরিবেশ অভিযান, রক্তদান শিবির এবং প্রতিবেশীদের উদ্যোগগুলি শুধু মুসলমানদের নয়, সমগ্র সমাজকে সেবা করা উচিত। যেকোনও প্রতিষ্ঠান তখনই সম্মান অর্জন করে, যখন তা সাম্প্রদায়িক সীমারেখা অতিক্রম করে।
 
আজ যে শিশুরা স্কুলে ভর্তি হচ্ছে, তারা ভারতীয় সংবিধানের শতবর্ষ উদযাপনের সময় প্রাপ্তবয়স্ক হবে। সেই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হয়তো এটা হবে না যে তাঁদের বাবা-মা কতটা বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন, বরং প্রশ্ন হবে, এর পরেও এবং ন্যায়ের দাবির পাশাপাশি তাঁরা কী গড়ে তুলেছিলেন: তাঁরা কী কী প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছিলেন, কতগুলি সুযোগের প্রসার ঘটিয়েছিলেন, কোন কোন অধিকার রক্ষা করেছিলেন এবং পরবর্তী প্রজন্মকে কতটা আত্মবিশ্বাস দিয়ে গিয়েছিলেন।
 
শত্রুতা কখনও কখনও উপর থেকে তৈরি করা যায়, কিন্তু বিশ্বাস গড়ে ওঠে নিচ থেকে, অগণিত সেবা, উদারতা এবং অভিন্ন লক্ষ্যের মাধ্যমে। সম্প্রদায়গুলিকে সংযুক্ত করা বন্ধনকে শক্তিশালী করে ভারতীয় মুসলমানরা শুধু নিজেদের ভাবমূর্তিই উন্নত করবেন না; তাঁরা ভারতের বহুত্ববাদী ও মানবিক ধারণাকে সংরক্ষণ করতেও সাহায্য করবেন।
 
এমন এক সময়ে, যখন দেশ ক্রমশ আত্মনির্ভর ভারত, স্বনির্ভরতা, উদ্যোগশীলতা ও উদ্ভাবনের কথা বলছে, তখন ভারতীয় মুসলমানদের সামনে চ্যালেঞ্জ হল, সংবিধানপ্রদত্ত অধিকারগুলির সঙ্গে কোনও আপস না করে নিজেদের দানশীলতা, শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ঐতিহ্যকে ক্ষমতায়নের হাতিয়ারে রূপান্তরিত করা। প্রকৃত স্বনির্ভরতা শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি বৌদ্ধিক, শিক্ষাগত ও নৈতিকও। দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে প্রতিযোগিতায় নামতে এবং শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে জ্ঞান, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসে সুসজ্জিত একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার মধ্যেই এর প্রকৃত অর্থ নিহিত।
 
তাই ভারতীয় মুসলমানদের জন্য এখন করণীয় কাজ শুধু প্রতিকূলতা সহ্য করা নয় কিংবা শুধু এর অবসানের দাবি জানানোও নয়, এই দুটির পাশাপাশি প্রতিকূলতাকে নবজাগরণের এক উৎসে রূপান্তর করাও সমান প্রয়োজনীয়। পরিস্থিতি অনুকূল হলেই যে সম্প্রদায়গুলি এগিয়ে যায়, তা নয়। বরং অধিকাংশ সময়েই তারা এগিয়ে যায়, কারণ তারা সংকল্প করে যে প্রতিকূলতা যতই বেদনাদায়ক ও অন্যায় হোক না কেন, সেটি কখনও শেষ কথা হতে পারে না।
 
নিজেদের অধিকার রক্ষা করে, শিক্ষায় বিনিয়োগ করে, নতুন দক্ষতা অর্জন করে, উৎকর্ষতার সন্ধান করে এবং সমগ্র সমাজকে সেবা দিয়ে ভারতীয় মুসলমানরা শুধু নিজেদের ভবিষ্যৎই সুরক্ষিত করবেন না; তাঁরা সংবিধান যে বহুত্ববাদী, মানবিক ও আত্মবিশ্বাসী ভারতের স্বপ্ন দেখেছে, সেই ভারত গড়ে তুলতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবেন।
 
(লেখক ভারতের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং ‘INDIA and I - A Hundred Memories, Not a Memoir’ গ্রন্থের রচয়িতা।)