দলবদলের সেই দিন: পিটার থঙ্গরাজকে পেতে ইস্টবেঙ্গলের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়

Story by  Shanti Roy Chowdhury | Posted by  Aparna Das • 5 h ago
দলবদলের সেই দিন: পিটার থঙ্গরাজকে পেতে ইস্টবেঙ্গলের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়
দলবদলের সেই দিন: পিটার থঙ্গরাজকে পেতে ইস্টবেঙ্গলের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়
 
শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী

কলকাতা ময়দানের ফুটবলে দলবদল বরাবরই ছিল আলাদা এক রোমাঞ্চের গল্প। ষাট-সত্তরের দশকে তার উত্তাপ ছিল আরও বেশি। এক ক্লাবের তারকা অন্য ক্লাবে চলে যেতেন, আর সেই দলবদল ঘিরে তৈরি হত নানা গল্প, আবেগ ও স্মৃতি। সেই সময়ের এমনই এক চমকপ্রদ কাহিনি ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম কিংবদন্তি গোলরক্ষক পিটার থঙ্গরাজকে ঘিরে।
 
আজকের প্রজন্মের কাছে দলবদল মানেই কোটি কোটি টাকার চুক্তি। কিন্তু কলকাতা ময়দানের পুরনো দিনে দলবদলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত ক্লাবের আবেগ, সমর্থকদের টান এবং সিনিয়র ফুটবলারদের ব্যক্তিগত উদ্যোগও। সেই সময়ের একটি স্মরণীয় দলবদলের গল্পে উঠে আসে খ্যাতনামা অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও।
 
কলকাতা ও ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক পিটার থঙ্গরাজ
 
পিটার থঙ্গরাজ ছিলেন ভারতীয় ফুটবলের স্বর্ণযুগের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক। ১৯৩৫ সালে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলার ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর ফুটবলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রথম দিকে তিনি ফরোয়ার্ড হিসেবেও খেলতেন, পরে গোলরক্ষক হিসেবে অসাধারণ সাফল্য পান। ১৯৫৫ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর তিনি ভারতের হয়ে ১৯৫৬ মেলবোর্ন ও ১৯৬০ রোম অলিম্পিকসে খেলেন। ১৯৫৮ সালে এশিয়ার সেরা গোলরক্ষক নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৭ সালে পান অর্জুন পুরস্কার।
 
কলকাতা ময়দানে থঙ্গরাজের পথচলাও ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ পর্যন্ত মহমেডান স্পোর্টিংয়ে খেলার পর ১৯৬৩ সালে তিনি যোগ দেন মোহনবাগানে। ১৯৬৫ সালে সেখান থেকে ইস্টবেঙ্গলে পাড়ি দেন এবং ১৯৭১ সাল পর্যন্ত লাল-হলুদ জার্সিতে খেলেন।
 
তবে দলবদলের সেই গল্পের সূত্রপাত হয়েছিল তাঁর মোহনবাগান পর্বের শেষদিকে। ১৯৬৪ মরশুমে দলে ছিলেন প্রদ্যুৎ বর্মনের মতো দক্ষ গোলরক্ষক। ফলে থঙ্গরাজ সব ম্যাচে প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক হিসেবে সুযোগ পাচ্ছিলেন না। আর সেই পরিস্থিতিতেই তাঁর দিকে নজর পড়ে ইস্টবেঙ্গলের।
 
স্মৃতিচারণে বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক ও ধারাভাষ্যকার বিপ্লব দাশগুপ্তের বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানা যায়, ইস্টবেঙ্গলের তরফে এই দলবদলের উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন মিডফিল্ডার প্রশান্ত সিনহা। প্রদ্যুৎ বর্মনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও, থঙ্গরাজের মতো জাতীয় দলের গোলরক্ষককে দিনের পর দিন সাইড বেঞ্চে বসে থাকতে দেখাটা তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না।
 
কলকাতা ও ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক পিটার থঙ্গরাজ
 
গল্পের সেই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি এসেছিল ডুরান্ড কাপের প্রস্তুতির সময়। অনুশীলন শেষে ইস্টবেঙ্গল মাঠ থেকে ফিরছিলেন প্রশান্ত সিনহা। অন্যদিকে মোহনবাগানের অনুশীলন সেরে ফিরছিলেন থঙ্গরাজ। পথেই দেখা হয় দু’জনের। কথায় কথায় প্রশান্ত তাঁকে ইস্টবেঙ্গলে আসার প্রস্তাব দেন।
 
স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, প্রশান্তের সেই আবেদনে সাড়া দিয়েছিলেন থঙ্গরাজ। এরপর খবর পৌঁছে যায় ইস্টবেঙ্গল কর্তাদের কাছে। মন্টু সুজন-সহ ক্লাবের কর্তারা তাঁকে দলে নেওয়ার উদ্যোগ শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৫ সালের দলবদলে মোহনবাগান ছেড়ে ইস্টবেঙ্গলে যোগ দেন থঙ্গরাজ। প্রকাশ্য ফুটবল রেকর্ডও তাঁর ১৯৬৫ সালে ইস্টবেঙ্গলে যোগ দেওয়ার তথ্য নিশ্চিত করে।
 
আর এই দলবদলের সঙ্গে জড়িয়ে যায় বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। স্মৃতিচারণে বলা হয়েছে, ইস্টবেঙ্গলের প্রতি গভীর আবেগ থাকা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় থঙ্গরাজকে সই করানোর সময় মন্টু সুজনদের সঙ্গে আইএফএ অফিসে গিয়েছিলেন। ইস্টবেঙ্গলের তৎকালীন সংগঠক জ্যোতিষ গুহর ঘনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে ক্লাবের নানা কর্মকাণ্ডে তাঁর সক্রিয় যোগাযোগ ছিল বলেও স্মৃতিচারণে উল্লেখ রয়েছে।
 
অর্থাৎ, পিটার থঙ্গরাজের মোহনবাগান থেকে ইস্টবেঙ্গলে যাওয়া শুধু একজন তারকা গোলরক্ষকের ক্লাব পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সতীর্থের উদ্যোগ, ক্লাবের প্রয়োজন, সমর্থকদের আবেগ এবং একজন জনপ্রিয় অভিনেতার ফুটবলপ্রেম।
 
পিটার থঙ্গরাজকে ইস্টবেঙ্গলে আনতে অভিনেতা ভানু বন্দোপাধ্যায় সহায়তা করেছিলেন
 
দলবদলের পর থঙ্গরাজ যে ইস্টবেঙ্গলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার হয়ে উঠেছিলেন, তার প্রমাণও রয়েছে। ১৯৬৫ সালের আইএফএ শিল্ড ফাইনালের প্রথম ম্যাচে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল ০-০ ড্র করেছিল। সেই ম্যাচে দুই গোলরক্ষক, মোহনবাগানের প্রদ্যুৎ বর্মন এবং ইস্টবেঙ্গলের পিটার থঙ্গরাজ, দু’জনেই দুর্দান্ত খেলেছিলেন। পরে রিপ্লেতে ইস্টবেঙ্গল ১-০ গোলে জিতে শিল্ড ঘরে তোলে।
 
ইস্টবেঙ্গলে থঙ্গরাজের দীর্ঘ অধ্যায় চলে ১৯৬৫ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে তিনি দলের সিনিয়র ফুটবলার হিসেবেও দল গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন বলে স্মৃতিচারণে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর মতো তারকার দলবদলই প্রমাণ করে, কলকাতা ময়দানের ষাট-সত্তরের ফুটবল শুধু মাঠের ৯০ মিনিটের খেলা ছিল না, তার বাইরে ছিল বন্ধুত্ব, আবেগ, ক্লাবের প্রতি আনুগত্য এবং দল গঠনের এক অন্যরকম সংস্কৃতি।
 
সময়ের সঙ্গে কলকাতা ময়দান বদলেছে। বদলেছে ফুটবলের অর্থনীতি, বদলেছে দলবদলের ধরন। কিন্তু পিটার থঙ্গরাজের মতো কিংবদন্তিদের ঘিরে থাকা সেই পুরনো দিনের গল্পগুলি আজও কলকাতা ফুটবলের ইতিহাসকে জীবন্ত করে রাখে।