অনিকা মহেশ্বরী
নেকাব ও আবায়া তৈরি করে কেউ কি উদ্যোগ জগতে নিজের নাম খোদাই করতে পারেন? প্রথমবার শুনলে বিষয়টি আশ্চর্যজনক মনে হলেও, উত্তরপ্রদেশের মউ জেলার বাসিন্দা আসমা নাফিস আনসারির সাফল্য এই ধারণাটিকেই সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। নিজের এই বিশেষত্ব ও সাহসের জোরেই তিনি আজ গোটা দেশের তরুণ প্রজন্ম ও মহিলাদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছেন।
‘আওয়াজ-দ্য ভয়েস’-এর সঙ্গে এক বিশেষ একান্ত সাক্ষাৎকারে আসমা বলেন, “এই নেকাব ও আবায়া উৎপাদনের জোরেই আমি উদ্যোক্তাদের জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘শার্ক ট্যাঙ্ক’-এ যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি।”
মউয়ের মতো একটি ছোট শহর থেকে বেরিয়ে ভারতের অন্যতম বড় ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্ম ‘শার্ক ট্যাঙ্ক ইন্ডিয়া’-য় পৌঁছনো মোটেই সহজ ছিল না। সাধারণত মনে করা হয়, বড় সাফল্য অর্জন করতে হলে বড় শহরে যাওয়া জরুরি। কিন্তু হিজাব ও নেকাব পরা আসমা প্রমাণ করে দিয়েছেন, স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য জায়গার চেয়ে বেশি প্রয়োজন দৃঢ় সংকল্প ও সাহসের।
NIFT কলকাতা থেকে গুরুগ্রাম, যাত্রাপথে ঘটে এক বিশেষ ঘটনা
আসমার এই যাত্রার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ২০১৭ সালে, যখন তিনি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ফ্যাশন টেকনোলজি (NIFT), কলকাতা থেকে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের পড়াশোনা সম্পূর্ণ করেন। নিজের অসাধারণ প্রতিভার জন্য তিনি ‘বেস্ট গ্র্যাজুয়েশন অ্যাওয়ার্ড’-এও সম্মানিত হন। পড়াশোনা শেষ করার পরই তিনি গুরুগ্রামে শিশুদের পরিচিত ব্র্যান্ড ‘Nauti Nati’-তে ডিজাইনার হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান।
কেরিয়ার সঠিক দিকেই এগিয়ে চলেছিল। কিন্তু গুরুগ্রামে তাঁর সঙ্গে এমন একটি ঘটনা ঘটে, যা তাঁর সম্পূর্ণ চিন্তাধারাই বদলে দেয়। সেখানে তিনি নিজের পোশাক ও পরিধান নিয়ে কিছু অস্বস্তিকর মন্তব্যের সম্মুখীন হন। এই ঘটনা তাঁর আত্মসম্মানে গভীর আঘাত হানে। তিনি উপলব্ধি করেন, যেকোনও মহিলার পোশাক তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ। পোশাক কখনও কোনও মানুষের যোগ্যতা বা দক্ষতা নির্ধারণ করতে পারে না। এই মুহূর্তেই তিনি কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে নিজের পথ নিজেই তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন।
মউয়ে প্রত্যাবর্তন, আধ্যাত্মিক প্রেরণা এবং ‘ANA’-র সূচনা
সবকিছু ছেড়ে আসমা নিজের শহর মউয়ে ফিরে আসেন। মউয়ে থেকেই তিনি ইসলাম ও ধর্মীয় গ্রন্থগুলি অধ্যয়ন করতে শুরু করেন। কোরানের ‘সূরা নূর’-এর তাফসির (বিশ্লেষণ) পড়ার সময় তাঁর কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে শালীনতা ও হিজাব কোনও দুর্বলতা নয়, বরং তা মর্যাদা ও আত্মসম্মানের প্রতীক।
‘ANA’-‘মডেস্ট ফ্যাশন’ অর্থাৎ শালীন পোশাকের একটি ব্র্যান্ড
এই ভাবনা থেকেই তিনি ‘মডেস্ট ফ্যাশন’, অর্থাৎ শালীন পোশাকের নিজস্ব একটি ব্র্যান্ড শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে তিনি ‘ANA’-র ভিত্তি স্থাপন করেন। উর্দু ভাষায় ‘আনা’ শব্দের অর্থ একজন মহিলার মর্যাদা, তাঁর প্রকৃত সত্তা এবং আত্মসম্মান। নামটি আসমার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে মানানসই ছিল।
বোনেদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং ডিজিটাল বিপ্লব
শুরুতে এটি একটি ছোট কাস্টমাইজড প্রকল্প ছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আসমার দুই বোন, জোহরা নাফিস ও বুশরা নাফিসও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন। তিন বোন মিলে সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে ইনস্টাগ্রামের শক্তিকে উপলব্ধি করেন। তাঁরা নিজেদের অনন্য ডিজাইনগুলি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরতে শুরু করেন।
দেখতে দেখতে শুধু ভারত থেকেই নয়, বিদেশ থেকেও তরুণীরা তাঁদের ব্র্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেন। পরে আসমার স্বামী জিশান করিমও এই যাত্রার অংশীদার হন এবং কোম্পানির পরিচালন ব্যবস্থায় নতুন শক্তি যোগ করেন। মউ থেকে শুরু হওয়া এই স্টার্ট-আপটি আজ ৩০ জনেরও বেশি মানুষকে সরাসরি কর্মসংস্থান দিয়েছে।
তাঁর এই উদ্যোগ জাতীয় স্তরেও স্বীকৃতি লাভ করে। প্রাক্তন রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভু তাঁকে ‘FICCI FLO UP মহিলা পুরস্কার’-এ সম্মানিত করেন। এছাড়াও তিনি উইমেন লিডার্স ফোরামের কাছ থেকে ‘উইমেন এন্টারপ্রেনিয়র অফ দ্য ইয়ার ২০২৩’ খেতাবও অর্জন করেছেন।
আসমা নাফিস আনসারির তিন বোন ও স্বামী
তিন বছরের প্রত্যাখ্যান এবং শার্ক ট্যাঙ্কে চমকপ্রদ প্রবেশ
শার্ক ট্যাঙ্ক ইন্ডিয়ার মঞ্চে উপস্থিত হওয়া কোনও স্বপ্নের চেয়ে কম ছিল না। আসমা জানান, এই জায়গায় পৌঁছতে তাঁকে টানা তিন বছর প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রতি বছরই তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কিন্তু তিনি হাল ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে প্রতিবার নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন এবং ডিজাইনগুলিকে আরও উন্নত করেছেন।
অবশেষে চতুর্থ বছরে তাঁর ব্র্যান্ড ‘ANA’ শার্ক ট্যাঙ্কে নিজের কথা তুলে ধরার সুযোগ পায়। শার্ক ট্যাঙ্কের মঞ্চে যখন মউয়ের এই কন্যা নিজের কাহিনি ও ব্যবসায়িক মডেল তুলে ধরছিলেন, তখন দেশের শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও তাঁর মনোবল দেখে মুগ্ধ হয়ে পড়েন।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার অপূর্ব মেলবন্ধন: ANA Apparels
আজ ‘ANA Apparels’ তরুণ প্রজন্মের প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছে। এই ব্র্যান্ডটি শুধু ঐতিহ্যবাহী হিজাব ও আবায়া তৈরি করে না, এর ট্রেন্ডি ও আধুনিক লুকের দিকেও সম্পূর্ণ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সূক্ষ্ম কারুকার্য: প্লিটেড স্লিভস থাকা কালো বন্ধ আবায়া এবং সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি করা ধূসর ওপেন আবায়া এই ব্র্যান্ডের পরিচয় হয়ে উঠেছে।
সাশ্রয়ী ও কাস্টমাইজড: প্রিমিয়াম মানের হওয়া সত্ত্বেও পোশাকের দাম গ্রাহকদের সাধ্যের মধ্যে রাখা হয়েছে। গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী কাস্টমাইজেশনের সুবিধাও দেওয়া হয়।
ফ্যাশন পরামর্শ (Fashion Consultation): আসমা শুধু পণ্য বিক্রি করেন না, মহিলাদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করে তাঁদের ফ্যাশন সম্পর্কিত পরামর্শও দেন।
আসমা নাফিস আনসারি
আসমার মতে, আবায়া শুধুমাত্র শরীর ঢেকে রাখার পোশাক নয়, এটি প্রতিটি মহিলার সংস্কৃতি, ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর আত্মবিশ্বাস প্রকাশের একটি মাধ্যম।
মউয়ের একটি ছোট দোকান থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা এখন বড় শহরগুলিতে ফ্ল্যাগশিপ স্টোর খোলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্তরে ব্র্যান্ডটিকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। আসমা নাফিস আনসারির এই কাহিনি আমাদের একটি সুন্দর বার্তা দেয়, যদি আপনার লক্ষ্য ও সংকল্প দৃঢ় হয়, তাহলে কোনও বাধাই আপনাকে সাফল্যের আকাশ ছুঁতে বাধা দিতে পারে না। আসমার এই কাহিনি শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের নয়, এটি নিজের আত্মপরিচয় নিয়ে গর্ব করার এক অনন্য নিদর্শন।