ফিরে দেখা কলকাতা ময়দানের ষাট-সত্তর দশক: অল্প টাকায় তারকাদের দাপট

Story by  Shanti Roy Chowdhury | Posted by  Aparna Das • 58 m ago
ফিরে দেখা কলকাতা ময়দানের ষাট-সত্তর দশক: অল্প টাকায় তারকাদের দাপট
ফিরে দেখা কলকাতা ময়দানের ষাট-সত্তর দশক: অল্প টাকায় তারকাদের দাপট
 
শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী

কলকাতা ময়দানের ষাট-সত্তর দশকের দিনগুলোর কথা ৮৫ বছর বয়সেও স্পষ্ট মনে রেখেছেন বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক চিরঞ্জিব। ময়দানের সেই সময়ের ফুটবল, খেলোয়াড়দের দলবদল এবং তাঁদের পারিশ্রমিকের নানা অজানা তথ্য এখনও তাঁর স্মৃতিতে জীবন্ত। অতীতের সেই দিনগুলির কথা তুলে ধরেছেন তিনি। 
 
আজকের কোটি টাকার ফুটবলের সঙ্গে ষাট-সত্তরের দশকের কলকাতা ময়দানের আর্থিক ছবির ছিল বিস্তর ফারাক। সুভাষ ভৌমিক, সুকল্যাণ ঘোষদস্তিদার, শ্যাম থাপা, সুরজিৎ সেনগুপ্তর মতো তারকা ফুটবলারদের দলবদলের দরও আজকের তুলনায় ছিল অবিশ্বাস্যভাবে কম।
 
প্রাক্তন ভারতীয় তারকা শ্যাম থাপা,সেই ব্যাক ভলি আজ সকলের কাছে স্মরণীয়
 
ইস্টবেঙ্গলের খেলোয়াড় নিয়োগের সঙ্গে জ্যোতিষ গুহর আমল থেকেই যুক্ত ছিলেন জ্যোতির্ময় সেনগুপ্ত। বাইচুং ভুটিয়ার ১৬ লাখ টাকার পারিশ্রমিকের প্রসঙ্গ উঠলে তাঁর বক্তব্য ছিল, ফুটবলাররা বেশি টাকা পাবেন না কেন? তাঁর যুক্তি, একজন ক্রিকেটার জাতীয় দলে ঢোকার পর এক বছরে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকারও বেশি আয় করতে পারেন। সেখানে একজন জাতীয় স্তরের ফুটবলারের অন্তত ২৫ লাখ টাকা পাওয়া উচিত। এতে তরুণদের ফুটবলের প্রতি আগ্রহ বাড়বে এবং দেশের ফুটবলেরও উন্নতি হবে। কলকাতা তথা বাংলার ফুটবলকে বাঁচাতে হলে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি ভিন রাজ্য ও বিদেশের খেলোয়াড়দের সঙ্গে স্থানীয় ফুটবলাররা খেললে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে খেলার মানও বাড়বে।
 
তবে ইস্টবেঙ্গলের আর এক পুরনো রিক্রুটার বিমল বসুর বক্তব্য ছিল ভিন্ন। তাঁর মতে, পঞ্চাশ-ষাটের দশকে কতজন ফুটবলারই বা বড় অঙ্কের টাকা পেয়েছেন? পরবর্তীকালে ট্রফি জয়ের সঙ্গে খেলোয়াড়দের আর্থিক পুরস্কার দেওয়ার রীতি চালু হয়। ইস্টবেঙ্গল ১৯৭০ সালে এই প্রথা শুরু করে। ডুরান্ড কাপ জয়ের পর ক্লাবের পক্ষ থেকে প্রত্যেক খেলোয়াড়কে ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছিল। নিশীথ ঘোষ প্রত্যেক খেলোয়াড়কে একটি করে সোনার আংটিও দিয়েছিলেন।
 
এর আগে ষাটের দশকে মোহনবাগানের জার্নাল সিং নিজের সেরা সময়েও সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। কান্নানের ক্ষেত্রে জীবনের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক ছিল ৩০ হাজার টাকা।
 
সত্তরের দশকে কলকাতা ময়দানে একের পর এক তারকা ফুটবলার উঠে আসেন। সেই দশকের প্রথম দিকে প্রায়ই সর্বোচ্চ দর পেতেন মহম্মদ হাবিব। ১৯৭৬ সালে সেই হিসাব বদলে দেন সুভাষ ভৌমিক। মোহনবাগান তাঁকে ৪৫ হাজার টাকা দিয়ে দলে নিয়েছিল। পরে এক মরশুমে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে শ্যাম থাপাকে দলে নেয় মোহনবাগান।
 
তৎকালীন ফুটবলারদের পারিশ্রমিকের বাস্তবতা বোঝাতে আরও কয়েকটি উদাহরণ রয়েছে। নায়িম খেলোয়াড়ি জীবনে সবটুকু উজাড় করে দিয়েও মাসে গড়ে চার হাজার টাকাও পেতেন না। পিকে বন্দ্যোপাধ্যায় মূলত ইস্টার্ন রেলের চাকরি করেই জীবন কাটিয়েছেন। ফুটবল থেকে তাঁর অতিরিক্ত আয় মূলত কোচিংয়ের মাধ্যমে আসে।
 
৭০ দশকের অসাধারণ ফুটবলার সুরজিৎ সেনগুপ্ত
 
আত্মীয়তার প্রভাব নিয়েও ময়দানে নানা কথা প্রচলিত ছিল। আকবরের ক্ষেত্রে শোনা যেত, তাঁর দাদা মহম্মদ হাবিবকে পাওয়ার জন্য ভাইয়ের দর ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। উলগানাথন ২০ হাজার টাকার বেশি পাননি। সারা মাঠজুড়ে দাপিয়ে খেলা ভবানী রায়ও আকবরের তুলনায় অনেক কম টাকায় খেলেছেন। বল নিয়ন্ত্রণে দক্ষ কাজল মুখার্জিকেও ৩০ হাজার টাকার মধ্যেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল।
 
সুভাষ ভৌমিক ও সুকল্যাণ ঘোষদস্তিদারের মাঠ কাঁপানো সময় আজও ময়দানের ইতিহাসে স্মরণীয়। সুকল্যাণের পারিশ্রমিক ৩৫ হাজার টাকার বেশি ওঠেনি। ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান, দুই দলের হয়েই দাপট দেখানো সুরজিৎ সেনগুপ্ত সত্তরের দশকে ৫০ হাজার টাকার বেশি পাননি বলেই স্মৃতিচারণে উল্লেখ করা হয়েছে।
 
কলকাতার পাশাপাশি সারা ভারতের ফুটবলেও বিশেষ প্রভাব ফেলেছিলেন শ্যাম বাহাদুর থাপা। সত্তরের দশকের আর্থিক বাস্তবতা এবং ক্লাবগুলির সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁকে ৬০-৭০ হাজার টাকা দিতে ক্লাবগুলি পিছপা হয়নি।
 
সুধীর কর্মকার এশিয়ান অল-স্টার দলে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁকে ৭০ হাজার টাকা দিয়ে দলে রাখা হয়েছিল। বিপক্ষের স্ট্রাইকারদের কাছে আতঙ্কের নাম বিদেশ বসুও পেয়েছিলেন ৭০ হাজার টাকা। অন্যদিকে শ্যামল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দক্ষ ফুটবলারকে ৪০ হাজার টাকার আশপাশে থাকতে হয়েছিল।
 
প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্সের কারণে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন। সুব্রত ভট্টাচার্যও নিজের সময়ে যথেষ্ট মর্যাদা পেয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ধারাবাহিকভাবে একই মানের খেলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাঁর নজির ছিল উল্লেখযোগ্য। রক্ষণে খেলেও প্রয়োজন অনুযায়ী আক্রমণে উঠে যাওয়ার দক্ষতা ছিল তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
 
কলকাতার গোলরক্ষকদের মর্যাদা বাড়িয়েছিলেন প্রদ্যুৎ বর্মন, সনৎ শেঠ ও থঙ্গরাজ। পরবর্তীকালে তরুণ বসু, ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায় ও শিবাজি বন্দ্যোপাধ্যায় এই জায়গায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁদের মধ্যে পারিশ্রমিকের দিক থেকে ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন শীর্ষে। একজন গোলরক্ষক যখন প্রতিপক্ষের নিশ্চিত গোলের সম্ভাবনা নস্যাৎ করে দলকে বাঁচান, তখন তাঁরও ৪০-৫০ হাজার টাকা পাওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল, এমনটাই ছিল সেই সময়ের যুক্তি।
 
সত্তর দশকের ময়দানে কিংবদন্তি ফুটবলার সুভাষ ভৌমিক
 
এরপর কলকাতা ফুটবলে বড় অঙ্কের পারিশ্রমিকের যুগ শুরু হয় আশির দশকে। ছয় অঙ্কের পারিশ্রমিকের সূচনা হয় ইস্টবেঙ্গলে। ১৯৮১ সালে নিশীথ ঘোষ মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যকে ১ লাখ টাকা দিয়ে দলে নেওয়ার পর কলকাতার একজন ফুটবলারের কাছে লাখ টাকা আর স্বপ্নের বিষয় রইল না।
 
১৯৮৪ সালে মোহনবাগান সেই রেকর্ড ভেঙে প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে দলে নেয়। মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য ও প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ফুটবলারদের ক্ষেত্রে এই পারিশ্রমিক তাঁদের দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা, দক্ষতা এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি ছিল।
 
বিদেশি ফুটবলার মজিদ, জামশেদ, খাবাজি এবং পরবর্তীকালে চিমা, এমেকাদের ক্ষেত্রে অবশ্য পারিশ্রমিকের হিসাব ছিল ভিন্ন। কিন্তু পরবর্তী দুই দশকে কলকাতায় ভারতীয় ফুটবলারদের পারিশ্রমিকও যে এতটা বেড়ে যাবে, তা ষাট-সত্তরের দশকের ফুটবলপ্রেমীরা হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি।
 
পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তরের দশকের ফুটবলাররা তুলনামূলকভাবে সামান্য পারিশ্রমিক পেয়েও মাঠে নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে দর্শকদের আনন্দ দিয়েছেন। তাঁদের পারফরম্যান্স ভারতীয় ফুটবলের মানকে একসময় অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
 
কিন্তু আশির দশকের পর কলকাতা ফুটবলে বাঙালি ফুটবলারদের উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমেছে। ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবেও স্থানীয় ফুটবলারদের জায়গা আগের তুলনায় সংকুচিত হয়েছে। এখন কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে বিদেশি ফুটবলাররা কলকাতা ফুটবলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
 
তাই শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়, আজ যখন ফুটবলারদের পারিশ্রমিক লাখ পেরিয়ে কোটি টাকায় পৌঁছেছে, তখন সেই তারকারা কি ষাট-সত্তরের দশকের ফুটবলারদের মতোই কলকাতার দর্শকদের আনন্দ দিতে পারছেন? টাকা বেড়েছে, ফুটবল আরও পেশাদার হয়েছে, কিন্তু সেই সময়ের তারকাদের ঘিরে যে আবেগ, মাঠের উত্তেজনা এবং দর্শকদের সঙ্গে ফুটবলারদের যে গভীর সম্পর্ক ছিল, সেই আবহ কি আজও একইভাবে রয়েছে?