ডা. শাহিদা নগমা
অনিকা মাহেশ্বরী / নয়াদিল্লি
ঝাড়খণ্ডের ধানবাদ, কয়লার জন্য পরিচিত এই শহর থেকেই উঠে এসে দিল্লির চিকিৎসাজগতে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ এবং আইভিএফ এক্সপার্ট ডা. শাহিদা নগমা। তবে তাঁর সাফল্যের গল্প শুধু একজন চিকিৎসকের পেশাগত কৃতিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁকে চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখে আজ তাঁর পরিবারের একাধিক মেয়ে নিজের শহর ছেড়ে দূরে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ার, চিকিৎসক ও ফাইন আর্টিস্ট হিসেবে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন। ফলে পরিবারের কাছে ডা. শাহিদা এখন শুধু একজন সফল চিকিৎসক নন, বরং পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েদের স্বপ্ন দেখার ও তা পূরণ করার অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা।
মা শবানা কমর (শিক্ষিকা) এবং সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত বাবা খুরশিদ আহমেদের উৎসাহে চিকিৎসক হয়ে সুনাম অর্জন করা ডা. শাহিদা নগমার ছোট ভাইও একজন চিকিৎসক এবং মেরঠে চিকিৎসা পরিষেবা দিচ্ছেন। ডা. শাহিদার প্রাথমিক পড়াশোনা কনভেন্ট স্কুলে। এরপর তিনি আর্মি পাবলিক স্কুল, ধৌলা কুয়ো থেকে সিনিয়র সেকেন্ডারি শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
ডা. শাহিদা নগমা
চিকিৎসাক্ষেত্রে তাঁর যাত্রা শুরু হয় দিল্লি ক্যান্টের আর্মি কলেজ অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (ACMS) থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি ও ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করার মাধ্যমে। এরপর দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বর্ধমান মহাবীর মেডিক্যাল কলেজ (VMMC) এবং সফদরজং হাসপাতাল, নয়াদিল্লি থেকে অবস্টেট্রিক্স অ্যান্ড গাইনেকোলজিতে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন (MS) ডিগ্রি অর্জন করেন।
সফদরজং হাসপাতালেই তিন বছর সিনিয়র রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করার সময় তিনি জটিল অস্ত্রোপচারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করেন। এরপর নয়াদিল্লির স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালে প্রখ্যাত ডা. আভা মজুমদারের তত্ত্বাবধানে রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিন (আইভিএফ)-এ বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ (ফেলোশিপ) সম্পন্ন করেন।
শৈশবের স্বপ্ন এবং ‘ডাক্তার নানা’-র প্রভাব
ডা. শাহিদার চিকিৎসক হওয়ার অনুপ্রেরণার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর শৈশবের স্মৃতি। তাঁর নানাজি, যাঁকে পরিবারের সকলে ‘ডাক্তার নানা’ বলে ডাকতেন, ইউনাইটেড কিংডমের একজন পরিচিত শিশু বিশেষজ্ঞ (Pediatrician) ছিলেন। তিনি যখনই ভারতে আসতেন, ডা. শাহিদা তাঁর পাশে বসে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা শুনতেন। তাঁর শান্ত স্বভাব এবং রোগীদের যত্ন নেওয়ার পদ্ধতি ডা. শাহিদার মনে চিকিৎসাক্ষেত্রে যাওয়ার ভিত্তি তৈরি করে দেয়। এই সম্পূর্ণ যাত্রায় তাঁর বাবা-মা এবং পরিবারের অটুট সহযোগিতা ছিল। তাঁর বাবা প্রথমে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন এবং পরে ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার ব্যাংক ম্যানেজার পদ থেকে অবসর নেন। তিনি সবসময় তাঁর মেয়ের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁকে উৎসাহ জুগিয়েছেন।
বদলে যাওয়া জীবনযাপন ও বাড়তে থাকা বন্ধ্যাত্বের চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে কম বয়সি দম্পতিদের মধ্যেও বন্ধ্যাত্বের সমস্যা দ্রুত বাড়ছে। এ বিষয়ে ডা. শাহিদা জানান, বর্তমানের ব্যস্ত জীবনযাপন, ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত কর্মব্যস্ততা এবং অতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক চাপ এর অন্যতম প্রধান কারণ। মানসিক চাপের কারণে শরীরে কর্টিসল (Cortisol) হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা আমাদের প্রধান প্রজনন হরমোন যেমন ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন, এফএসএইচ (FSH) এবং এলএইচ (LH)-এর ভারসাম্য নষ্ট করে। এর পাশাপাশি খাবারে ভেজাল, দূষিত জল এবং ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণও প্রজনন ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আইভিএফ প্রযুক্তি সম্পর্কে আলোকপাত করে তিনি জানান, আইভিএফ (In Vitro Fertilization) হল এমন একটি কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি, যা সেইসব দম্পতিকে সাহায্য করে, যাঁরা স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ করতে সক্ষম হন না।
এক আবেগঘন ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা
নিজের কর্মজীবনের একটি আবেগঘন অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “একবার গ্রামীণ পটভূমির এক দম্পতি তাঁদের ১১ বছরের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন। তাঁদের মেয়ে একটি ভাই বা বোনের জন্য অত্যন্ত আগ্রহী ছিল। মহিলার জরায়ুতে বেশ অনেকটা অ্যাডহিশন (Adhesions) ছিল। আমি হিস্টেরোস্কোপির মাধ্যমে সেই সমস্যা ঠিক করি এবং জরায়ুর আস্তরণ আরও ভালো করার জন্য প্রথমবারের মতো পিআরপি (PRP) প্রযুক্তি ব্যবহার করি। এর ফলস্বরূপ, প্রথম আইভিএফ প্রচেষ্টাতেই ওই মহিলা গর্ভধারণ করেন। আর যখন প্রথমবার শিশুটির হৃদস্পন্দন শোনা গেল, সেই মুহূর্তটি পুরো পরিবারের পাশাপাশি আমার কাছেও অত্যন্ত আবেগঘন ও স্মরণীয় হয়ে ওঠে।”
সাফল্যের শিখরে ডা. শাহিদা, নিঃসন্তান দম্পতিদের প্রতি বার্তা
বর্তমানে ডা. শাহিদা ছত্তরপুর মেন রোডে অবস্থিত ‘রেডিয়ান্স লাইফলাইন অ্যান্ড ফার্টিলিটি ক্লিনিক’-এ পরিষেবা দিচ্ছেন। পাশাপাশি তিনি ‘ক্লাউডনাইন হাসপাতাল’ (ইস্ট অফ কৈলাশ, নয়াদিল্লি)-এর সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন। এর আগে তিনি বিড়লা ফার্টিলিটি অ্যান্ড আইভিএফ-এর সঙ্গে কাজ করেছেন।
নিঃসন্তানতার সমস্যায় ভুগছেন এমন দম্পতিদের উদ্দেশে ডা. শাহিদা বলেন, বাবা-মা হওয়ার যাত্রা প্রত্যেকের জন্য আলাদা। একে অপরকে দোষারোপ করা বা সমাজের কটূক্তির ভিত্তিতে নিজেদের বিচার করার পরিবর্তে সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। মানসিক চাপমুক্ত থেকে এবং সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে এই যাত্রাকে আনন্দময় করে তুলুন।