১৭ বছর পর ইতিহাস গড়ল জঙ্গলমহলের স্কুল

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Aparna Das • 19 h ago
১৭ বছর পর  ইতিহাস গড়ল জঙ্গলমহলের স্কুল
১৭ বছর পর ইতিহাস গড়ল জঙ্গলমহলের স্কুল
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

খেলার মাঠের অভাব। নেই পর্যাপ্ত পরিকাঠামো। তবু স্বপ্ন দেখেছিল কিশোর ফুটবলাররা। সেই স্বপ্নই এবার বাস্তবের মাটিতে নামল। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলার স্কুল ফুটবলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখল ঝাড়গ্রামের মানিকপাড়া বিবেকানন্দ বিদ্যাপীঠ। সুব্রত কাপ আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টের অনূর্ধ্ব-১৫ বিভাগে শক্তিশালী অসমকে ১-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতেছে জঙ্গলমহলের এই স্কুল। দীর্ঘ ১৭ বছর পর বাংলার কোনও স্কুলের হাতে উঠল এই মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি। বিজয়ী দল ঝাড়গ্রামে ফিরতেই গভীর রাত পর্যন্ত উৎসবে মেতে উঠলেন শহরবাসী।

চ্যাম্পিয়ন দলের খেলোয়াড়েরা জেলায় পা রাখতেই তাঁদের স্বাগত জানাতে হাজির হন পরিবারের সদস্য, শিক্ষক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং ক্রীড়াপ্রেমীরা। প্রদীপ জ্বালিয়ে, চন্দনের ফোঁটা দিয়ে ও ফুলের মালা পরিয়ে খুদে ফুটবলারদের সংবর্ধনা জানানো হয়। এরপর বের হয় বর্ণাঢ্য বিজয় মিছিল। পাঁচমাথা মোড়ে বিধায়ক, জেলা প্রশাসন, মহকুমা প্রশাসন, জেলা পুলিশ এবং স্থানীয় ক্লাবগুলির পক্ষ থেকে খেলোয়াড়দের সম্মান জানানো হয়। মিষ্টিমুখের পাশাপাশি চলে উচ্ছ্বাস, আবেগ ও অভিনন্দন। রাত গভীর হলেও শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছিল উৎসবের আবহ।
 
এই জয় শুধু একটি স্কুলের সাফল্য নয়, জঙ্গলমহলের ফুটবলপ্রেমী মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণ। এর আগে বাংলার কোনও বিদ্যালয় এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করে সুব্রত কাপের অনূর্ধ্ব-১৫ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। কলকাতার সুকান্ত বিদ্যালয় নিকেতন ২০০৯ সালে নাগাল্যান্ডের কোহিমার চ্যারিটি স্কুলকে ১-০ গোলে হারিয়ে শেষবার বাংলার হয়ে ট্রফি জিতেছিল। ২০১২ সালে কলকাতার কল্যাণগড় বিদ্যামন্দির ফাইনালে পৌঁছালেও নাগাল্যান্ডের কাছে পরাজিত হয়ে রানার্স হয়। তারপর দীর্ঘ অপেক্ষা। অবশেষে সেই আক্ষেপ মুছে দিল মানিকপাড়া বিবেকানন্দ বিদ্যাপীঠ।
 
সাফল্যের পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম। বিদ্যালয়ের নিজস্ব খেলার মাঠ নেই। স্থানীয় ক্লাবের মাঠেই অনুশীলন করতে হয়েছে ছেলেদের। পর্যাপ্ত পরিকাঠামোর অভাব সত্ত্বেও প্রশিক্ষণ, নিয়মিত অনুশীলন এবং দলগত সংহতিকে ভরসা করে এগিয়েছে তারা। এর আগে চারবার জাতীয় স্তরের সুব্রত কাপে অংশ নিয়েছিল স্কুলটি। একবার সেমিফাইনালে পৌঁছেও স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা নিয়ে ফিরতে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার আরও দৃঢ় মানসিকতা নিয়ে মাঠে নেমেছিল দল।
 
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শৈবাল মহাপাত্র বলেন, সীমিত পরিকাঠামোর মধ্যেও ছাত্রদের অদম্য জেদ ও পরিশ্রম এই সাফল্য এনে দিয়েছে। তাঁর কথায়, “স্কুলে পরিকাঠামোর যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আগামী দিনে একটি ভালো মানের হোস্টেল ও স্থায়ী খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা গেলে ছেলেরা আরও বড় মঞ্চে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।”
 
বিদ্যালয়ের এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত জেলা প্রশাসনও। ঝাড়গ্রামের জেলাশাসক আকাঙ্খা ভাস্কর জানান, বিদ্যালয়ের পরিকাঠামোগত ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রতিভাবান ফুটবলারদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়েও পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
 
জঙ্গলমহলের এই জয় তাই শুধু একটি ট্রফি পাওয়ার ঘটনা নয়। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রতিভা কীভাবে নিজের জায়গা করে নিতে পারে, তারই প্রমাণ মানিকপাড়া বিবেকানন্দ বিদ্যাপীঠের কিশোর ফুটবলাররা। তাঁদের সাফল্যে নতুন করে আশার আলো দেখছেন জেলার ক্রীড়াপ্রেমীরা। এবার তাঁদের প্রত্যাশা, স্থায়ী মাঠ, হোস্টেল ও উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলে এই খুদে খেলোয়াড়রাই আগামী দিনে বাংলার ফুটবলকে আরও বড় মঞ্চে তুলে ধরবে।


শেহতীয়া খবৰ