শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী
কলকাতা ময়দানের ষাট-সত্তরের দশক মানেই এক অন্যরকম ফুটবল-জগৎ। আজকের মতো দলবদল, নতুন খেলোয়াড়ের আগমন কিংবা চুক্তির খবর নিয়ে তুমুল প্রচার তখন ছিল না। অথচ সেই সময়েই কলকাতার ফুটবল ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। বাংলার তিন প্রধান, ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান ও মহমেডান স্পোর্টিং, নিজেদের দলকে শক্তিশালী করতে ভিন্রাজ্য থেকে ফুটবলার আনার দিকে নজর দিতে শুরু করেছিল। সেই বদলের প্রত্যক্ষ স্মৃতি এখনও স্পষ্ট ৮৫ বছরের বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক চিরঞ্জিবের মনে।
১৯৬৬, কলকাতা ফুটবলে নতুন ভাবনার শুরু
১৯৬৬ সাল থেকে কলকাতার তিন বড় ক্লাব ভিন্রাজ্যের ফুটবলারদের দলে নেওয়ার ব্যাপারে আরও আগ্রহী হয়ে ওঠে। মহমেডান স্পোর্টিং কেরালা থেকে হাফ-ব্যাক এসপি সালামকে নিয়ে আসে। ফরওয়ার্ড লাইনে মাদ্রাজ থেকে আসেন এসপি লাওনেল, বোম্বাই থেকে আব্দুল্লা, কেরালা থেকে রশিদ এবং অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে সালে।
আজকের দিনে কোনও তারকা ফুটবলার কলকাতায় পা রাখলে সংবাদমাধ্যমে যে ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়, সেই সময়ে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যেত না। দলবদলের সময় ছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ। বড় সংবাদপত্রগুলিতে দলবদলের খবর খুব একটা গুরুত্ব পেত না। বরং ছোট আকারের ক্রীড়া পত্রিকা ও মরশুমি ক্রীড়া ম্যাগাজিনগুলিতেই দলবদলের খবর তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পেত।
ষাট সত্তর দশকে কলকাতা ফুটবলে দলবদলের সময় মোহনবাগান সমর্থকদের উল্লাস
আনন্দবাজার ও যুগান্তরের মতো সংবাদপত্রেও কখনও কখনও ছোট খবর প্রকাশিত হতো। যেমন, ‘নবাগত খেলোয়াড় কান্নান’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল মহীশুরের এক ফুটবলারের কলকাতায় আসার খবর। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, কান্নান প্রতিদিন বিকেলে মোহনবাগান ক্লাব তাঁবুতে এসে অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। আজকের দিনে এমন কোনও ফুটবলার কলকাতায় এলে হয়তো তাঁর আগমনই বড় খবর হয়ে উঠত। কিন্তু সেই সময়ে বড় ফুটবলারদের ক্ষেত্রেও সংবাদপত্রের কভারেজ ছিল আশ্চর্যজনকভাবে সংক্ষিপ্ত।
‘মোহনবাগানে অসীম মৌলিক’, এমন বড় শিরোনাম হওয়া সত্ত্বেও খবরটি ছিল মাত্র কয়েক লাইনের। পরে কাজল মুখার্জির মোহনবাগান ছেড়ে ইস্টার্ন রেলে ফিরে যাওয়া, বিহারের চন্দ্রেশ্বর প্রসাদের ইস্টবেঙ্গল থেকে মোহনবাগানে যাওয়া কিংবা শিবপ্রসাদের মোহনবাগানে যোগ দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছিল অল্প কথায়।
জ্যোতিষ গুহর দূরদৃষ্টি
ভিন্রাজ্য থেকে ফুটবলার আনার প্রয়োজনীয়তা অবশ্য জ্যোতিষ গুহ অনেক আগেই বুঝেছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই কলকাতার ক্লাব ফুটবলে বাইরের প্রতিভা নিয়ে আসার পথ আরও শক্তিশালী হয়েছিল। বার্ড কোম্পানির পদস্থ কর্তা এম এস বালার সহযোগিতায় এক সময় তিনি একাধিক প্রতিভাবান ফুটবলারকে কলকাতায় এনেছিলেন। এমনকি কয়েকজনকে বার্ড কোম্পানিতে চাকরির ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়েছিল।
এই ধারাই পরে আরও বড় আকার নেয়। জ্যোতিষ গুহ সার্ভিসেস থেকে ফরওয়ার্ড শ্যাম বাহাদুর থাপা, গুরু কৃপাল সিং এবং কে বি শর্মাকে আনার উদ্যোগ নেন। অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে আসেন স্টপার সৈয়দ নঈমুদ্দিন, হাফ-ব্যাক আফজল এবং ফরওয়ার্ড মহম্মদ হাবিব। অর্থাৎ, একসঙ্গে বাইরে থেকে সাত ফুটবলারকে দলে নেওয়ার উদ্যোগ! যুগান্তর সেই ঘটনাকে যথার্থই শিরোনাম দিয়েছিল, ‘ইস্টবেঙ্গলে সপ্তরথী’। যদিও সার্ভিসেসের অমর বাহাদুর শেষ পর্যন্ত কলকাতায় আসেননি।
তবে আশ্চর্যের বিষয়, সেই সময়ের দলবদলের বাজারে এই ফুটবলারদের আগমন তেমন আলোড়ন তুলতে পারেনি। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো পরবর্তীকালে ফুটবলপ্রেমীদের নজরে আসার মতো প্রতিভা ছিলেন, কিন্তু সেই সময় তাঁদের নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়নি।
আইএফএর সিদ্ধান্তে উত্তাল ময়দান
এরই মধ্যে কলকাতা ফুটবলে অন্য এক বিতর্ক তৈরি হয়। ১৯৬৬ সালে আইএফএর একটি সিদ্ধান্তকে ঘিরে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। লিগে তিন বছর ওঠানামা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে চিরঞ্জিবের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। এই সিদ্ধান্ত ফুটবলমহলে প্রবল প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। বিশেষ করে দলবদলের শেষ দিন, ১৫ মার্চ, পরিস্থিতি অন্য মাত্রা পায়।
বিখ্যাত ডিফেন্ডার সৈয়দ নাঈম উদ্দিন,চন্দেশ্বর প্রসাদ ও বিখ্যাত ফুটবলার কান্নান
ধর্মতলা স্ট্রিটে আইএফএ অফিসের সামনে জড়ো হন বিপুল সংখ্যক ফুটবলপ্রেমী। চিরঞ্জিবের স্মৃতিতে, অন্তত পাঁচশো মানুষের একটি মিছিল সেখানে পৌঁছেছিল। তাঁদের স্লোগান ছিল, ‘ফুটবল বাঁচাও, ওঠানামা বন্ধ করা যাবে না।’ শুধু ক্লাব বা খেলোয়াড়দের দলবদল নিয়ে নয়, লিগের কাঠামো এবং প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখার দাবিতেও যে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীরা রাস্তায় নেমেছিলেন, এই ঘটনা তারই এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
কলকাতা ফুটবল লিগের ইতিহাসে ষাটের দশক যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময় ছিল, তার আরেকটি প্রমাণ সেই সময়ের লিগের ফলাফলেও দেখা যায়, ১৯৬৬ সালে ইস্টবেঙ্গল কলকাতা লিগ জেতে এবং ১৯৬৭ সালে মহমেডান স্পোর্টিং চ্যাম্পিয়ন হয়।
বদলের সেই শুরু
আজকের পেশাদার ফুটবলে ভিন্রাজ্যের কিংবা বিদেশি ফুটবলার দলে নেওয়া, দলবদলের খবর, খেলোয়াড়ের পারিশ্রমিক এবং চুক্তি, সবই ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ষাটের দশকের কলকাতা ময়দানে এই সংস্কৃতি তখনও শৈশবে।
সেই সময়ের ফুটবল ছিল অনেক বেশি আবেগনির্ভর। সংবাদপত্রের পাতায় দলবদলের খবর হয়তো ছোট্ট জায়গা পেত, কিন্তু মাঠের বাইরে ফুটবলপ্রেমীদের উত্তেজনা কখনও ছোট ছিল না। ভিন্রাজ্য থেকে নতুন ফুটবলার আসা, বড় ক্লাবের দল গড়ার পরিকল্পনা এবং আইএফএর সিদ্ধান্ত নিয়ে মিছিল, সব মিলিয়ে সেই সময়ের ময়দান ছিল পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। চিরঞ্জিবের স্মৃতিতে তাই ষাটের দশকের কলকাতা ময়দান শুধু পুরনো ফুটবলের গল্প নয়; এটি সেই সময়ের বদলে যেতে থাকা বাংলার ফুটবল সংস্কৃতিরও দলিল।