ফিরে দেখা কলকাতা ময়দানের ষাট-সত্তর দশক, যখন ফুটবল ছিল আবেগ, সম্মান আর চাকরির নিশ্চয়তা—দরাদরির গল্প ছিল অন্যরকম
শান্তি প্রিয় রায় চৌধুরী
কলকাতা ময়দান। শুধু একটি মাঠ নয়, বাঙালির ক্রীড়াস্মৃতির এক বিশাল অধ্যায়। এই ময়দানের ঘাসে কত ফুটবলারের উত্থান, কত ক্লাবের গৌরব, কত স্বপ্ন আর আবেগের গল্প ছড়িয়ে আছে, তার হিসাব রাখা কঠিন। আজ পেশাদার ফুটবলের জগতে যেখানে অর্থ, চুক্তি, ট্রান্সফার ফি এবং পারিশ্রমিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে ষাট-সত্তর দশকের কলকাতা ময়দানের ছবি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
সেই সময়ের ময়দানের দিনগুলোর প্রত্যক্ষদর্শী বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক চিত্ত রঞ্জন বিশ্বাস, যিনি চিরঞ্জীব নামেই পরিচিত। ৮৫ বছর বয়সে পৌঁছেও তাঁর স্মৃতিতে এখনও স্পষ্ট কলকাতা ময়দানের সেই সোনালি দিনগুলি। ময়দানের অলিগলি, বড় ক্লাবের কর্তাদের ব্যক্তিত্ব, ফুটবলারদের আবেগ এবং ক্লাব বদলের সেই পুরনো দরাদরি, সবই যেন তাঁর স্মৃতির পাতায় এখনও জীবন্ত।
তাঁর সঙ্গে কথা বলে সেই হারিয়ে যাওয়া সময়কে তুলে ধরেছেন 'আওয়াজ-দ্য ভয়েস'- এর প্রতিনিধি ক্রীড়া সাংবাদিক শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী। সেই স্মৃতিচারণের প্রথম কিস্তিতে উঠে এসেছে অতীতের ফুটবল এবং ফুটবলারদের পারিশ্রমিক ও ক্লাব বদলের এক অন্যরকম জগত।
কলকাতা ময়দানের পুরনো দিনগুলি
টাকা নয়, সম্মানই ছিল বড় কথা
আজ যদি কোনও জাতীয় চ্যাম্পিয়ন জিমন্যাস্ট, সাঁতারু, সেরা কবাডি বা খো-খো খেলোয়াড়কে জিজ্ঞাসা করা হয়, “আপনার ক্লাব কত টাকা দেয়?”, তাঁর বিস্মিত হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন এই প্রশ্নই ফুটবলের বাইরে অন্য খেলায় প্রায় অকল্পনীয় ছিল।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের তারকা ফুটবলাররা আজকের মতো লক্ষ লক্ষ টাকা তো দূরের কথা, অনেক সময় ক্লাব থেকে কোনও অর্থই নিতেন না। শৈলেন মান্না, নিখিল নন্দী, ব্যোমকেশ বসু, এম এ সাত্তার, সমর ব্যানার্জির মতো খেলোয়াড়রা শুধু কলকাতা বা বাংলার মাঠ নয়, সারা ভারতের ফুটবল মাতিয়েছেন। এশিয়ান গেমসে দেশের হয়ে সোনা জিতেছেন। তাঁরাই ছিলেন ভারতীয় ফুটবলের মেগাস্টার। অথচ ক্লাবের হয়ে খেলেও পারিশ্রমিক নেওয়ার সংস্কৃতি তখন ছিল না।
চুনি গোস্বামীও সেই সময়েরই প্রতীক। ফুটবল খেলে এক পয়সাও নেননি তিনি। তাঁর কাছে ফুটবল ছিল ভালোবাসা, সম্মান এবং দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, খেলেছেন খেলার জন্যই। মোহনবাগানের মতো ঐতিহ্যশালী ক্লাবে খেলা, বাংলা ও ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা এবং দেশের সাফল্যের অংশ হওয়াকেই তিনি জীবনের বড় প্রাপ্তি মনে করতেন।
ফুটবলের বিনিময়ে মিলত চাকরি
তবে এর অর্থ এই নয় যে ফুটবলারদের কোনও আর্থিক নিরাপত্তা ছিল না। সেই সময় খেলাধুলার সঙ্গে চাকরির একটা গভীর সম্পর্ক ছিল। ভালো ফুটবলারদের ব্যাংক, রেল, পোর্ট কমিশনারস, সেন্ট্রাল এক্সাইজ, বিমান সংস্থা, পুলিশ, প্রতিরক্ষা-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করে দিত বড় ক্লাবগুলির কর্মকর্তারা।
অর্থাৎ, ফুটবলের বিনিময়ে সরাসরি টাকা নয়, ভবিষ্যতের নিরাপত্তাটাই ছিল বড় প্রাপ্তি। সেই চাকরিগুলিও অনেক সময় যথেষ্ট ভালো ছিল। ফুটবলারের প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে তাঁর জীবনের ভিত শক্ত করে দেওয়াই ছিল তৎকালীন ক্লাব সংস্কৃতির অন্যতম দিক।
কলকাতা ময়দানের পুরনো দিনগুলি
“অ্যামেচার ফুটবলে আবার টাকা কেন?”
ষাটের দশকের ময়দানের কর্তাদের মানসিকতাও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জ্যোতিষ গুহ, ধীরেন দে, শেখ আনোয়ার আলীদের মতো ব্যক্তিত্বরা ফুটবলকে দেখতেন মূলত অ্যামেচার স্পোর্টস হিসেবেই। বিদেশি ফুটবলারদের উদাহরণ টেনে কখনও অর্থের প্রসঙ্গ উঠলে তাঁদের পাল্টা প্রশ্ন ছিল, “অ্যামেচার ফুটবলে আবার টাকা কেন?” তাঁদের যুক্তি ছিল, খেলোয়াড়রা চাকরি পাচ্ছেন, সেটাই তো যথেষ্ট। বরং খেলোয়াড়কে সরাসরি টাকা দেওয়াটাই অনেক সময় নিয়মবহির্ভূত বলে মনে করা হতো। অবশ্য কোনও কোনও খেলোয়াড়কে সামান্য অর্থ দেওয়া হতো বলেও সেই সময়ের স্মৃতিতে উঠে আসে।
কর্মকর্তাদের সামনে দাঁড়ানোই ছিল বড় ব্যাপার
আজকের দিনে খেলোয়াড়রা ক্লাব কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন, চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেন, পারিশ্রমিক নিয়ে দরাদরি করেন। কিন্তু সেই সময়ের ময়দানে ছবিটা ছিল অন্যরকম।
জ্যোতিষ গুহ কিংবা স্যুট-বুট পরা ধীরেন দের মতো ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়ানোই অনেক খেলোয়াড়ের কাছে বড় ব্যাপার ছিল। তাঁদের ব্যক্তিত্ব, কর্তৃত্ব এবং ক্লাব পরিচালনার ধরন ছিল আলাদা। মহমেডান স্পোর্টিংয়ের র্যান্ডেরিয়ানের কাছে পৌঁছনোর সাহসও অনেকের ছিল না বলে স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। ফুটবলারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মূল মাধ্যম ছিলেন ফুটবল সচিবরা। খেলোয়াড় এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল যথেষ্ট।
কোচের বদলে কর্মকর্তারাই ছিলেন অভিভাবক
আজকের ফুটবলে কোচের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন খেলোয়াড়কে দলে নেওয়া হবে, কোন বিদেশি ফুটবলারকে আনা হবে, দলকে চ্যাম্পিয়ন করতে কত টাকা খরচ হবে, এসব নিয়ে কোচদের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ষাটের দশকের কলকাতা ময়দানে সেই চিত্র ছিল না। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের মতো বড় ক্লাবগুলিতে আজকের অর্থে কোচের ভূমিকা ছিল না বললেই চলে। জ্যোতিষ গুহ বা ধীরেন দের মতো কর্মকর্তারাই কার্যত দল পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাতেন।
বিলেতে তাঁদের অভিজ্ঞতা ছিল। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তাঁরা অনুশীলনে শৃঙ্খলার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। কে কখন মাঠে এলেন, কে কখন অনুশীলন শুরু করলেন, কে কখন শেষ করলেন, সবকিছুর উপর ছিল কড়া নজর। সময়ানুবর্তিতাকে তাঁরা প্রায় ইংরেজদের মতোই গুরুত্ব দিতেন।
বিদেশি ফুটবলার আনার ভাবনা
কলকাতার ফুটবলকে আরও সমৃদ্ধ করতে বাইরের খেলোয়াড় আনার প্রয়োজনীয়তা জ্যোতিষ গুহ অনেক আগেই বুঝেছিলেন। শুধু ভিনরাজ্য নয়, বিদেশ থেকেও ভালো ফুটবলার আনার পক্ষে তিনি ছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, বাইরের ভালো খেলোয়াড়রা কলকাতায় এলে স্থানীয় ফুটবলাররা তাঁদের দেখে শিখতে পারবেন। প্রতিযোগিতা বাড়বে, খেলার মান উন্নত হবে। শুধু স্থানীয় প্রতিভার উপর নির্ভর করে বড় ক্লাবের চ্যাম্পিয়ন হওয়া কঠিন, আর জাতীয় ফুটবলেও পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে।
আজকের পেশাদার ফুটবলের যুগে বিদেশি খেলোয়াড়, বড় চুক্তি, ট্রান্সফার ফি কিংবা কোচের পছন্দ নিয়ে যে আলোচনা স্বাভাবিক, তার বীজ কিন্তু অনেক আগেই কলকাতা ময়দানে রোপিত হয়েছিল। তবে সেই সময়ের ফুটবলের সঙ্গে আজকের ফুটবলের সবচেয়ে বড় পার্থক্য ছিল এক জায়গায়, তখন ফুটবলের মূল্য শুধু টাকায় মাপা হতো না। মাঠে সাফল্য, ক্লাবের জার্সি, দেশের প্রতিনিধিত্ব এবং নিজের প্রতিভার স্বীকৃতিই ছিল একজন ফুটবলারের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে ময়দান, বদলেছে ফুটবল, বদলেছে খেলোয়াড়দের জীবনও। কিন্তু চিত্ত রঞ্জন বিশ্বাসের মতো মানুষের স্মৃতিতে ষাট-সত্তরের সেই কলকাতা ময়দান এখনও একইরকম জীবন্ত, যেখানে ফুটবল ছিল পেশার চেয়ে বেশি, ছিল আবেগ, আত্মসম্মান এবং এক গভীর ভালোবাসার নাম।