দেবকিশোর চক্রবর্তী
তারাপীঠে তখন ভোরের আলো ফুটছে। চারপাশে ভক্তদের ভিড় বাড়ছে ক্রমশ। কারও হাতে পুজোর ডালা, কারও হাতে লাল জবা। মা তারার দর্শন পেতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন অগণিত মানুষ। কৌশিকী অমাবস্যার বিশেষ তিথিতে তারাপীঠ যেন পরিণত হয়েছে এক অন্য জগতে। মন্দিরমুখী মানুষের স্রোতের পাশে সারি সারি ফুলের দোকান। লাল জবার গন্ধ, ধূপের ধোঁয়া আর ভক্তির আবহে জমজমাট মন্দির চত্বর।আর সেই ফুলের ডালা হাতে বসে রয়েছেন কয়েকজন মুসলিম রমণীও।
কেউ হয়তো জানেন, কেউ হয়তো জানেন না—এই মহিলাদের হাত দিয়েই প্রতিদিন বহু ভক্তের পুজোর ফুল পৌঁছে যায় মা তারার চরণে। তাঁদের ধর্ম আলাদা, প্রার্থনার ভাষা আলাদা। কিন্তু জীবিকার টানে, মাটির টানে, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের টানে তাঁরা দাঁড়িয়ে আছেন সেই একই জায়গায়। ফুল বিক্রি তাঁদের কাছে পেশা, সংসার চালানোর অবলম্বন। আর সেই ফুলই পৌঁছে যাচ্ছে তারাপীঠের আরাধ্য দেবীর পুজোয়।
কৌশিকী অমাবস্যার দিনে এই ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ এই তিথিতে তারাপীঠে ভক্তসমাগম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। মা তারার পুজোয় জবার বিশেষ গুরুত্ব থাকায় ফুলের বাজারেও তৈরি হয় বাড়তি চাহিদা। স্থানীয় ফুলচাষি থেকে শুরু করে বিক্রেতা—অনেকের কাছেই এই সময়টা বছরের গুরুত্বপূর্ণ উপার্জনের সময়।
তারাপীঠ শুধু একটি তীর্থস্থান নয়, বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা একটি জনপদ। মন্দিরকে ঘিরে ফুল, মালা, প্রসাদ, পুজোর সামগ্রী, হোটেল, দোকান—অসংখ্য মানুষের রুজিরুটি। সেই অর্থনীতির অংশ হয়ে রয়েছেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও।
সেখানেই হয়তো তারাপীঠের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটি লুকিয়ে রয়েছে।
একজন ভক্ত যখন মায়ের পুজোর জন্য ফুল কিনছেন, তখন তিনি হয়তো খেয়ালও করছেন না ফুলটি কার হাত থেকে এল। বিক্রেতার নাম, তাঁর ধর্ম, তাঁর সামাজিক পরিচয়—কোনও কিছুই তখন গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ শুধু সেই ফুল, যা কয়েক মুহূর্ত পর মায়ের চরণে অর্পিত হবে।
এই দৃশ্যকে শুধু ধর্মের চোখে দেখলে হয়তো গল্পটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ এখানে ধর্মের পাশাপাশি রয়েছে জীবনের গল্প। রয়েছে সংসার চালানোর লড়াই। রয়েছে স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার গল্প। আর রয়েছে এমন এক সামাজিক বাস্তবতা, যেখানে মানুষের প্রয়োজন অনেক সময় পরিচয়ের সীমানাকে অতিক্রম করে যায়।
কৌশিকী অমাবস্যার রাতে যখন তারাপীঠে বিশেষ পুজো, তন্ত্রসাধনা ও ধর্মীয় আচারকে ঘিরে ভক্তদের ঢল নামে, তখন মন্দিরের বাইরের পৃথিবীও নিজের মতো করে জেগে থাকে। কেউ প্রসাদ বিক্রি করেন, কেউ ফুল, কেউ পুজোর সামগ্রী। কেউ দূর থেকে আসা ভক্তদের থাকার ব্যবস্থা করেন। প্রত্যেকেরই লক্ষ্য এক—এই কয়েকটি দিনকে কেন্দ্র করে সংসারের আয়টুকু বাড়ানো।
মুসলিম রমণীদের ফুল বিক্রির ছবিটা তাই কেবল একটি ‘অন্যরকম’ দৃশ্য নয়। এটি বাংলার মাটির এক পরিচিত সংস্কৃতিরও প্রতিচ্ছবি—যেখানে মানুষের সম্পর্ক অনেক সময় ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।বাংলার গ্রামবাংলায় বহুদিন ধরেই বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একে অন্যের উৎসব, বাজার ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। কারও বাড়ির পুজোর ফুল অন্য সম্প্রদায়ের চাষির জমি থেকে আসে, কারও দোকানের ক্রেতা অন্য ধর্মের মানুষ, আবার কারও হাতে তৈরি সামগ্রী পৌঁছে যায় অন্যের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে। এই আদানপ্রদান কোনও নতুন রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি বাংলার দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা।
তারাপীঠেও সেই বাস্তবতারই যেন এক ছোট্ট ছবি দেখা যায়।মায়ের মন্দিরে যে ফুল অর্পণ করা হচ্ছে, তার মূল্য হয়তো কয়েক টাকা। কিন্তু সেই ফুলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে একজন চাষির ঘাম, একজন বিক্রেতার সারাদিনের পরিশ্রম, একটি পরিবারের সংসার চালানোর স্বপ্ন। ফুলটি কার হাত থেকে এল, তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ফুলটির প্রয়োজনীয়তা এবং মানুষের পরিশ্রম।
কৌশিকী অমাবস্যার ভিড়ের মধ্যে তাই একটু থেমে তাকালে অন্য একটি তারাপীঠকে দেখা যায়। যেখানে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনির পাশাপাশি শোনা যায় দোকানদারের ডাক। যেখানে ভক্তির পাশাপাশি রয়েছে জীবিকার লড়াই। যেখানে ধর্মীয় আচার যেমন আছে, তেমনই রয়েছে সহাবস্থানের নীরব ছবি।
আর সেই ছবিতে লাল জবার ডালা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মুসলিম রমণী হয়তো খুব সাধারণভাবেই বলবেন—“ফুল বিক্রি করি, সংসার চলে।”
এই সরল কথাটির মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে অনেক বড় একটি বার্তা।কারণ মানুষ যখন জীবিকার জন্য পাশাপাশি দাঁড়ায়, তখন পরিচয়ের দেওয়াল অনেকটাই ছোট হয়ে আসে। একজনের হাতে ফুল, অন্যজনের হাতে পুজোর ডালা—মাঝখানে কোনও বিভাজন নেই। আছে শুধু প্রয়োজন, পরিশ্রম আর মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক।
কৌশিকী অমাবস্যার তারাপীঠ তাই শুধু পুজো আর ভক্তির গল্প নয়। এই তিথি আমাদের দেখিয়ে দিতে পারে বাংলার মাটিতে সম্প্রীতির আরও একটি নীরব ছবি—যেখানে ধর্ম আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানুষের রুজি-রুটি, পরিশ্রম এবং স্বপ্নের ভাষা একই।মা তারার মন্দিরে অর্পিত সেই লাল জবা ফুল তখন শুধু একটি পুজোর উপকরণ থাকে না। তার সঙ্গে মিশে যায় বহু মানুষের ঘাম, শ্রম এবং জীবনের গল্প।
আর সেই গল্পের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকেন একজন মুসলিম রমণী—হাতে ফুলের ডালা, চোখে সংসার চালানোর স্বপ্ন।তারাপীঠের কৌশিকী অমাবস্যায় এও তো বাংলাকে দেখার এক সুন্দর জানালা।