শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
হুগলি জেলার ব্যান্ডেলের পোলবা স্পোর্টস একাডেমী প্রাঙ্গণে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ৪৮তম ন্যাশনাল ভলিবল চ্যাম্পিয়নশিপ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা অংশ নেবেন এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতায়। সেই মঞ্চেই এবার নিজের জায়গা করে নিয়েছে নদিয়া জেলার শান্তিপুরের গোপালপুর স্ট্রিট এলাকার এক কিশোর, আফরোজ আলী শেখ।
বর্তমানে শান্তিপুর মিউনিসিপাল স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র আফরোজ। পড়াশোনার পাশাপাশি ভলিবলই তার জীবনের মূল লক্ষ্য। আর্থিক অনটন, পারিবারিক সংগ্রাম, সব বাধা পেরিয়ে সে আজ জাতীয় স্তরের মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করতে চলেছে। মাঠে সে মিডিল ব্লকার হিসেবে খেলে এবং তার উচ্চতা, লাফানোর ক্ষমতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
আফরোজের জীবনযুদ্ধ শুরু হয়েছে ছোটবেলা থেকেই। তার বাবা হায়দার আলী শেখ এক সময় অন্য শহরে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। অনিশ্চিত কাজ, অল্প আয় আর দূরে পরিবার, এই ছিল বাস্তবতা। বর্তমানে তিনি কর্মহীন। মা রঞ্জিতা বিবি একজন গৃহবধূ। সংসারে আর্থিক টানাপোড়েন নিত্যসঙ্গী হলেও ছেলের স্বপ্নপূরণে কখনও পিছিয়ে যাননি তারা। অনেক সময় প্রয়োজনীয় কিট, জুতো কিংবা যাতায়াত খরচ জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হয়েছে পরিবারকে। তবুও থেমে থাকেনি আফরোজের অনুশীলন।
প্রতিদিন পড়াশোনার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর অনুশীলন করে সে। কোচদের মতে, তার মধ্যে রয়েছে অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং নিয়মিত পরিশ্রমের মানসিকতা। এর আগেও ৪৬তম অনূর্ধ্ব-১৭ বাংলা দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছে আফরোজ। সেই অভিজ্ঞতা তাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করেছে। এবার জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ তার কাছে এক নতুন চ্যালেঞ্জ, এক নতুন স্বপ্নের দরজা।
আফরোজ আলী শেখ
আফরোজ জানায়, ভবিষ্যতে দেশের হয়ে ভলিবলে প্রতিনিধিত্ব করাই তার জীবনের লক্ষ্য। সে ভলিবলকেই নিজের ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিতে চায়। পড়াশোনাতেও সে সমান মনোযোগী, কারণ সে জানে শিক্ষাই জীবনের শক্ত ভিত গড়ে দেয়। পরিবারও চায় ছেলে যেন খেলাধুলার পাশাপাশি শিক্ষায়ও এগিয়ে থাকে।
স্থানীয় এলাকায় আফরোজ এখন অনেক তরুণের অনুপ্রেরণা। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও যে স্বপ্ন দেখা যায় এবং সেই স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাওয়া যায়, তারই উদাহরণ সে। আর্থিক অনটন তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি, বরং আরও শক্ত করেছে তার মানসিক জোর।
২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া জাতীয় ভলিবল চ্যাম্পিয়নশিপে যখন সে কোর্টে নামবে, তখন শুধু নিজের জন্য নয়, সঙ্গে থাকবে পরিবারের আশা, এলাকার মানুষের শুভেচ্ছা এবং এক সংগ্রামী জীবনের গল্প। হয়তো এই লড়াই একদিন তাকে পৌঁছে দেবে দেশের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে। আর সেই দিনটির অপেক্ষায় আজ তার পরিবার, তার শহর এবং অসংখ্য স্বপ্নবাজ মানুষ।