মালিক আসগর হাশমি / নয়া দিল্লি
২০২৬ সালের আইসিসি পুরুষ টি-২০ বিশ্বকাপের জন্য ঘোষিত সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE)-এর দলটি শুধু তাদের পারফরম্যান্সের জন্যই নয়, দলের গঠনগত বৈশিষ্ট্য নিয়েও বহুল আলোচিত হয়েছে। বহুদিন ধরেই ক্রিকেটজগতে প্রচলিত, উপসাগরীয় দেশগুলোর দল সাধারণত স্থানীয় খেলোয়াড়দের পাশাপাশি প্রবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিভার ওপরও নির্ভরশীল। UAE-র বর্তমান টি-২০ দল এই বহুমাত্রিকতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। বিশেষত, দলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক খেলোয়াড় রয়েছেন যাদের শিকড় ভারতীয় এবং যাদের ভূমিকা কোনোভাবেই আনুষ্ঠানিক নয়, বরং দলটির ভরকেন্দ্র।
দলের ওপর নজর ফেললে ওপেনিং থেকে শুরু করে অলরাউন্ডার ও বোলিং বিভাগ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের শক্তিশালী উপস্থিতি চোখে পড়ে। যদিও দলের অধিনায়কত্বে আছেন মহম্মদ ওয়াসিম, তবুও দলকে শুরুর স্থিতি দেওয়ার ক্ষেত্রে মায়াঙ্ক কুমারের মতো নির্ভরযোগ্য ক্রিকেটার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
হরিয়ানায় জন্ম নেওয়া মায়াঙ্ক রাজেশ কুমার একজন ডানহাতি ওপেনিং ব্যাটসম্যান। আন্তর্জাতিক স্তরে তার অভিজ্ঞতা এখনও সীমিত, তবে ঘরোয়া টি-২০ ক্রিকেটে তিনি বহু কার্যকরী ইনিংস খেলেছেন। তার স্ট্রাইক রেট ও টেকনিক্যাল ভারসাম্য UAE-র টপ অর্ডারকে মজবুত ভিত্তি দেয়।
উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান আয়ুষ শর্মাও দলের প্রধান স্তম্ভ। তরুণ আয়ুষ একদিনের ম্যাচ ও টি-২০, দুই ফর্ম্যাটেই ধারাবাহিক অবদান রেখেছেন। টি-২০ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার গড় ও স্ট্রাইক রেট প্রমাণ করে তিনি দ্রুতগতির খেলার সাথে নিজেকে সুন্দরভাবে মানিয়ে নিয়েছেন। উইকেটের পেছনে তার ফুর্তি এবং মিডল অর্ডারে তার উপস্থিতি ইউএইয়ের ভারসাম্য দৃঢ় করে।
অলরাউন্ডার বিভাগে হর্ষিত কৌশিক এবং ধ্রুব পরাশর, এই দু’জনকে দলের মেরুদণ্ড বলা যায়। বাঁহাতি ব্যাটসম্যান ও স্লো লেফট-আর্ম স্পিনার হর্ষিত কৌশিক সুযোগ পেলে মূল্যবান ইনিংস খেলেছেন এবং প্রয়োজনে কৃপণ বোলিংও করেছেন।
অন্যদিকে ধ্রুব পরাশর বিশেষভাবে নজরকাড়া। ডানহাতি অফব্রেক বোলার ধ্রুব আন্তর্জাতিক টি-২০ ম্যাচে ইতিমধ্যেই ৩০টিরও বেশি উইকেট দখল করেছেন। তার ইকোনমি ও স্ট্রাইক রেট প্রমাণ করে মিডল ওভারে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে তিনি সিদ্ধহস্ত। সঙ্গে নিচের দিকে ব্যাট হাতে রান তুলতেও সক্ষম।
UAE- দলের খেলোয়াড়েরা
বোলিং বিভাগে সিমরনজিৎ সিংয়ের অভিজ্ঞতা UAE-র বড় সম্পদ। বাঁহাতি স্পিনার সিমরনজিৎ টি-২০ আন্তর্জাতিক ম্যাচে উজ্জ্বল গড় নিয়ে উইকেট পেয়েছেন। তার এক ম্যাচে চার উইকেট নেওয়া প্রমাণ করে, ম্যাচের গতি বদলানোর ক্ষমতা তার আছে। বড় টুর্নামেন্টে অভিজ্ঞতা বিশেষ অর্থবহ, তাই তার ভূমিকা এইবার আরও গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়াও মহম্মদ ফরিদ, মহম্মদ জোহাইব, আলিসান শরফু এবং অন্যান্য খেলোয়াড়রাও দলের অংশ। তবে ভারতীয় মূলের ক্রিকেটারদের উপস্থিতি দলটিকে বিশেষভাবে সুষম ও সমৃদ্ধ করেছে। ব্যাটিং, অলরাউন্ডার ও বোলিং, সব বিভাগেই তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। যদি তারা সবাই মিলে নিজেদের সেরাটা দিতে পারেন, তাহলে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও UAE যে লড়াইয়ে সক্ষম, তা বলাই যায়।
তবে এটাও সত্য যে ভারতের মতো, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া কিংবা নিউজিল্যান্ডের মতো বড় দলগুলোর মুখোমুখি হলে UAE-কে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। অভিজ্ঞতা, সম্পদ, প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট, এই ক্ষেত্রগুলোতে UAE এখনও উন্নয়নের পর্যায়ে। কিন্তু টি-২০ ফরম্যাটের বৈশিষ্ট্যই এমন, একটি ভালো দিনে যে কেউ ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে। তাই বহুসাংস্কৃতিক এই দলটি টুর্নামেন্টের “সারপ্রাইজ প্যাকেজ” হয়ে উঠতে পারে।
UAE ক্রিকেট দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী ক্রিকেটারদের ওপরই গড়ে উঠেছে। দেশের জনসংখ্যার বড় অংশই প্রবাসী, যার মধ্যে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি। ফলে ঘরোয়া ক্রিকেটে ভারতীয় মূলের খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই বেশি। এটাই এখন UAE ক্রিকেটের পরিচয় হয়ে উঠেছে। দল বাছাই হয় প্রতিভার ভিত্তিতে, জাতীয়তা বা শেকড়ের ভিত্তিতে নয়, এবং ফলস্বরূপ বিভিন্ন পটভূমির ক্রিকেটাররা একসঙ্গে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
খেলার মাঠে ধর্ম বা জন্মপরিচয়ের চেয়ে পারফরম্যান্সই মুখ্য, UAE দল সেই কথারই সেরা উদাহরণ। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই খেলোয়াড়দের কাছে দায়িত্ব তাই দ্বিমুখী, একদিকে তারা নিজেদের দক্ষতা দিয়ে UAE-কে গর্বিত করতে চান, অন্যদিকে ভারতীয় ক্রিকেট-সংস্কৃতির সঙ্গে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাদের খেলায় বিশেষ পরিপক্বতা এনে দেয়।
২০২৬ টি-২০ বিশ্বকাপে UAE-র প্রকৃত পরীক্ষা হবে যখন তারা বড় দলগুলোর মুখোমুখি দাঁড়াবে। টপ অর্ডার কি স্থির সূচনা দিতে পারবে? অলরাউন্ডাররা কি ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে? বোলাররা কি ডেথ ওভারে নিয়ন্ত্রিত বোলিং করতে পারবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে টুর্নামেন্ট চলাকালেই। তবে এটা নিশ্চিত যে ভারতীয় মূলের খেলোয়াড়দের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি UAE প্রধান খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সেরাটা আদায় করতে পারে, তাহলে তারা কয়েকটি ম্যাচে চমক দেখাতে বাধ্য। বিশেষ করে স্পিন ও অলরাউন্ড শক্তি তাদের প্রধান অস্ত্র হতে পারে। টি-২০ ক্রিকেটে সাফল্যের চাবিকাঠি হলো, সামষ্টিক পারফরম্যান্স।
সর্বোপরি, ২০২৬ টি-২০ বিশ্বকাপের জন্য UAE দলটি কেবল একটি ক্রিকেট স্কোয়াড নয়, বরং বিশ্ব ক্রিকেটের পরিবর্তনশীল চেহারার প্রতীক। এই দল দেখিয়ে দিয়েছে, খেলা সীমারেখার ঊর্ধ্বে, আর প্রতিভা কোনো নির্দিষ্ট পরিচয়ে বদ্ধ নয়। এখন অপেক্ষা, এই বৈচিত্র্যময় দল মাঠে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে এবং বিশ্বমঞ্চে নতুন কোনো গল্প লিখতে পারে কি না।