আরিফুল ইসলাম / রঙ্গিয়া
মায়ের কোলে গুটি গুটি বয়সেই অনেকের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে একটি শিশু। মাত্র পাঁচ বছরের এই বিশেষভাবে সক্ষম কিশোরটি নিজের দুর্বলতাকেই শক্তিতে রূপান্তর করতে পেরেছে। জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক, সব মঞ্চেই সে আলো ছড়িয়েছে টাইকোয়ানডো খেলায়। উমর ফারুক অর্জন করেছে সোনা ও রুপোর বহু পদক। তার বাড়ি নলবাড়ি জেলাবাসীর বিলপার নারিকুছিতে।
২০২০ সালে জন্ম নেওয়া উমর ফারুকের জন্মের সময় দুই পা-ই ছিল নব্বই শতাংশ বাঁকা। গ্রামের মানুষ থেকে শুরু করে মা–বাবা, সবাই ভেবেছিল, উমর হয়তো কখনো হাঁটতেই পারবে না। অথচ আজ যখন উমর টাইকোয়ানডো খেলায় অংশ নেয়, তখন তাকে একেবারেই সাধারণ শিশুর মতো লাগে। মা–বাবার অসীম পরিশ্রম, একাগ্রতা আর বিশ্বাসের জোরে আজ উমর রাজ্য, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক, সব স্তরে পদক জিতে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
উমর ফারুককে ব্ল্যাক বেল্ট পরিয়ে দিচ্ছেন কোচ সুজল গুহ
আওয়াজ–দ্য ভয়েসের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে উমরের বাবা জুলু আলি জানান, “উমরের জন্ম ২০২০ সালে। জন্ম থেকেই তার দুই পা নব্বই শতাংশ বেঁকা ছিল। আমরা খুবই দুঃখ পেয়েছিলাম, ভাবতাম, হয়তো সে কোনোদিন হাঁটতেই পারবে না। আমরা চিকিৎসা শুরু করলাম। প্রথমে গুয়াহাটিতে দেখানো হলো, পরে নলবাড়ির একটি হাসপাতালে তার অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারের পর পা দুটি সম্পূর্ণ শক্তিহীন হয়ে পড়ে। দীর্ঘসময় প্লাস্টার ও বিশেষ জুতো পড়িয়ে রাখতে হয়েছিল। এগুলো খুলে দেওয়ার পরও শক্তি ফিরছিল না। ডাক্তার পরামর্শ দিলেন শারীরিক ব্যায়াম বা কোনো উপযুক্ত খেলাধুলায় তাকে যুক্ত করার। তখনই ২ বছর ৭ মাস বয়সে তাকে টাইকোয়ানডোতে ভর্তি করে দেওয়া হয়।”
বর্তমানে উমর রঙিয়ার আল-হিদায়াহ ইন্টারন্যাশনাল পাবলিক স্কুলের UKG শ্রেণির ছাত্র। অতি দরিদ্র পরিবারে জন্মানো উমরকে নিয়ে মা–বাবা গত পাঁচ বছর ধরে অবিশ্বাস্য রকম কষ্ট করে চলেছেন। ভর্তি হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন উমরের বাবা তাকে প্রশিক্ষণে নিয়ে যান। তাদের বাড়ি থেকে জাতীয় সড়ক পর্যন্ত কাঁচা রাস্তা, বর্ষাকালে যেখানে গাড়ি তো দূরের কথা, সাইকেলও ঠিকমতো চলতে পারে না। সেসব দিনে বাবা উমরকে কাঁধে তুলে পথ পাড়ি দিয়ে সড়কে এনে গাড়িতে তোলে, তারপর নিয়ে যায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে।
আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে অন্যান্য ভারতীয় সতীর্থদের সাথে উমর ফারুক
রঙিয়া টাইকোয়ানডো কোচিং সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রশিক্ষক সুজল গুহ বলেন, “যখন ওর বাবা তাকে আড়াই বছরের বয়সে আমার কাছে নিয়ে আসে, তখন তার পায়ে রড লাগানো ছিল। ঠিকমতো হাঁটতেও পারত না। প্রথমে শুধু ব্যায়াম, দৌড় আর শরীরচর্চা করালাম। ধীরে ধীরে মৌলিক টাইকোয়ানডো শেখানো শুরু হলো। মনোযোগ, আগ্রহ আর কঠোর অনুশীলনের জোরে আজ সে খুব সুন্দরভাবে খেলতে পারে। রাজ্য পর্যায়, জাতীয় পর্যায় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়, সব জায়গায় সোনা-রুপো জিতেছে।”
তিনি আরও বলেন, “আজ উমরকে দেখে বোঝাই যায় না যে জন্মে তার পা এতটাই বেঁকা ছিল। আমার কোচিং সেন্টারে আড়াই বছর ধরে অনুশীলন করছে। এই অল্প বয়সেই ব্ল্যাক বেল্ট অর্জন করেছে। যদি সে দু’মাস আগে ব্ল্যাক বেল্ট পেত, তবে সবচেয়ে কম বয়সে ব্ল্যাক বেল্ট অর্জনের জন্য তার নাম গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে উঠত। এখন সে অসমে সবচেয়ে কম বয়সী ব্ল্যাক বেল্টধারীদের মধ্যে দ্বিতীয়। তার প্রতিভা দেখে মনে হয়, ১৮–১৯ বছর বয়সেই সে গ্র্যান্ডমাস্টার হতে পারবে। ভবিষ্যতে হয়তো অলিম্পিকেও প্রতিনিধিত্ব করবে, আমরা সেই লক্ষ্যেই তাকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।”
একটি টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উমর ফারুক
উল্লেখ্য, আগামী জুলাই মাসে উমর আবার দিল্লিতে জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাবে। এ বছর কোরিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য জুনিয়র টাইকোয়ানডো অলিম্পিকেও সে অংশগ্রহণ করবে বলে কোচ জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মহম্মদ রেজেক আলির কথায়, “আমি প্রায়ই তাদের বাড়িতে যাই। জন্মের সময় উমরের পায়ের অবস্থা দেখে ভাবিনি যে সে কোনোদিন হাঁটতেও পারবে। অথচ এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে পদক জিতে ফিরছে। মা–বাবার অক্লান্ত শ্রম আর ছেলেটার সাহস, এই দুয়ের ফলেই আজ এত দূর এসেছে। আমরা গ্রামবাসী সবাই গর্বিত, তার আরও উন্নতি কামনা করি।”