সমাজপতিকে পেতে ময়দানে গোপন অভিযান, শেষমেশ বাজিমাত ইস্টবেঙ্গলের!

Story by  Shanti Roy Chowdhury | Posted by  Aparna Das • 3 h ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী

একটা সময় ছিল, যখন কলকাতা ময়দানের দলবদল মানেই শুধু ফুটবলার বদল নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকত আবেগ, সম্মান, ক্লাবের মর্যাদা আর রুদ্ধশ্বাস কৌশল। আজ বদলে গিয়েছে ভারতীয় ফুটবল। বদলে গিয়েছে কলকাতা ময়দানের চরিত্রও। এককালের ৬০ পয়সার গ্যালারি এখন ইতিহাস। কিন্তু সেই গ্যালারির গর্জন, সেই দলবদলের নাটক আর তার নেপথ্যের গল্প আজও বেঁচে আছে স্মৃতিতে।  হারিয়ে যাওয়া সময়েরই একটি বিস্ময়কর অধ্যায় সুকুমার সমাজপতিকে ঘিরে।

১৯৬০ সালে এরিয়ান থেকে মোহনবাগানে আসা এক তরুণ ফুটবলার কীভাবে পরের বছর ইস্টবেঙ্গলের লাল-হলুদ জার্সিতে চলে গেলেন, তার গল্পে আছে অভিমান, কৌশল, গোপন যোগাযোগ এবং শেষ পর্যন্ত এক রুদ্ধশ্বাস ‘উধাও’ হয়ে যাওয়ার ঘটনা।বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক ও ধারাভাষ্যকার বিপ্লব দাশগুপ্তের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে সেই সময়ের ময়দানের অন্দরমহলের গল্প। 
 
কলকাতা ময়দানের বিখ্যাত সেন্টার ফরওয়ার্ড সুকুমার সমাজপতি
 
এরিয়ান থেকে মোহনবাগান, নজর কেড়েছিলেন প্রথম দিনেই। ১৯৬০ সালে এরিয়ান থেকে মোহনবাগানে যোগ দেন সুকুমার সমাজপতি। মোহনবাগানের কিংবদন্তি কর্মকর্তা শৈলেন মান্নার নজর কেড়েছিলেন তিনি। এরিয়ানের হয়ে কয়েকটি প্রদর্শনী ম্যাচে তাঁর খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন মান্না। তাঁর সুপারিশেই সবুজ-মেরুন শিবিরে জায়গা হয় তরুণ সমাজপতির। এরিয়ানে সেন্টার-ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলতেন সুকুমার। মোহনবাগানেও প্রথম পাঁচটি ম্যাচে সেই জায়গাতেই খেলেছিলেন। কিন্তু লিগের প্রথম পর্বে ইস্টার্ন রেলের কাছে হারের পর তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হল রাইট উইংয়ে।আর সেখানেই যেন খুলে গেল তাঁর আসল দরজা।
 
নতুন পজিশনে প্রথম ম্যাচ থেকেই দুরন্ত সুকুমার। গতি, বল নিয়ে ছুটে যাওয়া এবং মুহূর্তে আক্রমণ তৈরি করার ক্ষমতায় বিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত করে তুলতেন। এক ম্যাচে তাঁর জোরালো শট ক্রসবারে লেগে ফিরে এসেছিল। চুনি গোস্বামীদের পাশে তখন নিজের জায়গা তৈরি করে নিচ্ছেন সমাজপতি। কিন্তু ফুটবল কখনও কখনও নির্মম। লিগের দ্বিতীয় পর্বে ইস্টার্ন রেলের বিরুদ্ধে ম্যাচে হাঁটুতে চোট পেলেন সুকুমার। গোটা লিগে আর সুযোগ পেলেন না।
 
‘প্রথম কুড়ি মিনিট’, অভিমান জমতে শুরু। চোট সারিয়ে নিয়মিত অনুশীলন করছিলেন তিনি। আশা ছিল, আইএফএ শিল্ডে আবার প্রথম দলে ফিরবেন। কিন্তু সেমিফাইনালে এরিয়ানের বিরুদ্ধে তাঁকে প্রথম কুড়ি মিনিট খেলানোর প্রস্তাব দেওয়া হল।
 
সুকুমারের কাছে বিষয়টি ছিল অপমানজনক

প্রথম কুড়ি মিনিট খেলবেন, ভালো খেললেও তারপর উঠে বসতে হবে, এই সিদ্ধান্ত তাঁর মনে গভীর আঘাত করে। মাঠে ফেরার বদলে তিনি চলে গেলেন গোরক্ষপুরে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় দলের সঙ্গে। সেই দলের সঙ্গেই ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের অবনী বসু ও চিত্ত চন্দ। তাঁরা বুঝতে পারলেন, সুকুমারের মনে মোহনবাগান নিয়ে অভিমান তৈরি হয়েছে। পরামর্শ দিলেন, ইস্টবেঙ্গলে আসুন। সেখান থেকেই শুরু হল লাল-হলুদের আসল অভিযান। ময়দানে তখন শুরু হয়ে গিয়েছে ‘অপারেশন সমাজপতি’। 
 
ইস্টবেঙ্গল কর্মকর্তারা আর সময় নষ্ট করলেন না। শিল্ড শেষ হওয়ার পর ডুরান্ড ও রোভার্স কাপে মোহনবাগানে ফিরলেন সুকুমার। কিন্তু এবার তাঁকে খেলতে হল লেফট উইংয়ে।পজিশন বদলালেও তাঁর দাপট কমেনি। কিন্তু তখনও ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি নেননি তিনি। শেষ ধাক্কাটা এল সন্তোষ ট্রফির আগে।ডুরান্ড ও রোভার্স কাপে তাঁর পারফরম্যান্স দেখে বাংলা দলে জায়গা করে দিয়েছিলেন তৎকালীন আইএফএ সচিব এম. দত্ত রায়। মোহনবাগানের আরও কয়েকজন ফুটবলারও ছিলেন সেই দলে।
 
বাংলা দলকে বিমানে পাঠানোর ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু সুকুমারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল ট্রেনের টিকিট, কালিকট যাওয়ার জন্য। কেন এই বৈষম্য, প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। পরে তাঁকেও বিমানে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে অভিমানের জায়গায় সিদ্ধান্ত তৈরি হয়ে গিয়েছে, মোহনবাগানে আর নয়।
 
মুসা, মজিদকে নিয়ে এক সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে সুকুমার সমাজপতি
 
কালিকটে গোপন বৈঠক
 
সন্তোষ ট্রফির সময় দুই প্রধানের রিক্রুটারদের নজর থাকত ভবিষ্যতের দল গঠনের দিকে। কালিকটে ইস্টবেঙ্গলের হয়ে ছিলেন সুজন ব্যানার্জি। কলকাতা থেকেই মন্টু বসু ট্রাঙ্ক কলে সুকুমারের সঙ্গে কথাবার্তা প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেছিলেন। পরিকল্পনা ছিল পরিষ্কার, সন্তোষ ট্রফি শেষ হবে, কিন্তু সুকুমার আর মোহনবাগান দলের সঙ্গে কলকাতায় ফিরবেন না।
 
মোহনবাগান যাতে আঁচ না পায়, সেজন্য সুজনের গতিবিধিও ছিল অত্যন্ত সতর্ক। কখনও দিপু দাসের সঙ্গে কথা বলতে বলতে কয়েক মাইল হেঁটে চলে যেতেন তিনি। অন্যদিকে অবনী বসু ও চিত্ত চন্দও সুকুমারের সঙ্গে আড়ালে যোগাযোগ রাখছিলেন। তবে একটি বাধা ছিল, বাবার অনুমতি। সুজন কলকাতায় মন্টু বসুকে বিষয়টি জানান। সুকুমারের বাবার সম্মতি নেওয়ার জন্য তাঁকে বসুশ্রীতে নিয়ে আসা হয়। রাতে খাবারের টেবিলে বসে সবাই। ঠিক তখনই বাজল ফোন।
 
অরুণ ঘোষ ইশারা করলেন সুকুমারকে ফোন ধরতে।ওপারে ছিলেন মন্টু বসু। ফোনটি সুকুমারের বাবার হাতে তুলে দেওয়া হল। প্রথমে তিনি রাজি ছিলেন না। কিন্তু সব শুনে শেষ পর্যন্ত সম্মতি দিলেন।অপারেশন সমাজপতি তখন প্রায় সম্পূর্ণ।
 
‘কিডন্যাপড’ সমাজপতি!
 
বাংলা দল সন্তোষ ট্রফির সেমিফাইনালে হেরে গেল। মোহনবাগান ফুটবলাররা রওনা দিলেন চেন্নাইয়ের উদ্দেশে। পরিকল্পনা ছিল, দশপ্রকাশ হোটেলে কিছুক্ষণ থেকে সেখান থেকে বিমানে কলকাতায় ফেরা।কিন্তু সুকুমার আর সেই পথে গেলেন না। মাঝপথেই তাঁকে তুলে নিলেন সুজন ব্যানার্জি।
 
ভাইজাগ, কন্যাকুমারী হয়ে সাত দিন পর কলকাতায় ফিরলেন সুকুমার। কলকাতায় তখন তাঁর কোনও খোঁজ নেই। সাত দিন ধরে খবর না পেয়ে একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত হল চাঞ্চল্যকর খবর, ‘Samajpati kidnapped’।আসলে অপহরণ নয়, ছিল এক পরিকল্পিত দলবদল।
 
ইস্টবেঙ্গল চেয়েছিল, সুকুমারকে কিছুদিন গোপন জায়গায় রাখা হোক। প্রথমে তিনি রাজি ছিলেন না। কিন্তু মোহনবাগানের শৈলেন মান্না ও চুনি গোস্বামীর অনুরোধও উপেক্ষা করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত গোপন ডেরাতেই থাকলেন। সেই সময় মোহনবাগান তাঁকে ধরে রাখার শেষ চেষ্টা করেছিল। পূর্ব আফ্রিকা সফরের হাতছানি ছিল বড় প্রলোভন। কিন্তু ততক্ষণে সুকুমার নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।
 
সমাজপতির সঙ্গে চুনি গোস্বামী
 
দলবদলের পরও থামেনি সমাজপতির দৌড়
 
১৯৬১ সালে ইস্টবেঙ্গলে সই করলেন সুকুমার সমাজপতি। পরে লাল-হলুদ জার্সিতে তিনি দীর্ঘ সময় খেলেন এবং ক্লাবের অধিনায়কও হন। প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে সমাজপতি নিজেই জানিয়েছেন, সন্তোষ ট্রফি চলাকালীন কোঝিকোড়ের এক হোটেলে ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়েছিল। ইস্টবেঙ্গলের হয়ে তাঁর সময়কাল শুধু দলবদলের গল্পে আটকে থাকেনি। ১৯৬১ সালের আইএফএ শিল্ড ফাইনালে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ইস্টবেঙ্গলের জার্সিতে মাঠে নেমেছিলেন তিনি; ম্যাচটি প্রথমে গোলশূন্য ড্র হয় এবং রিপ্লেতেও সুকুমার গোলের সুযোগ পেয়েছিলেন। আর জাতীয় মঞ্চে তাঁর পরিচয় আরও বড়। 
 
১৯৬৪ সালের এশিয়ান কাপে ফাইনালে ওঠা ভারতীয় দলের আক্রমণভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন সমাজপতি। সেই টুর্নামেন্টে হংকংয়ের বিরুদ্ধে ৩-১ জয়ে গোলও করেছিলেন তিনি। পরিবারকে দেওয়া কথা রাখার গল্পটাও তাই এই কাহিনির শেষ অধ্যায় নয়, বরং আরেকটি স্মৃতি। মোহনবাগানের পূর্ব আফ্রিকা সফরের প্রলোভন তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এই বলে যে, পরের বছর ভারতের হয়ে বিদেশে খেলবেন। কথাটা রেখেছিলেন, ভারতের হয়ে মারডেকা টুর্নামেন্টে খেলেছিলেন।
 
এক দলবদল, এক যুগের প্রতিচ্ছবি
 
আজকের ফুটবলে দলবদল অনেক বেশি পেশাদার, প্রাতিষ্ঠানিক এবং নিয়মের মধ্যে বাঁধা। কিন্তু ষাটের দশকের কলকাতা ময়দানে একটি বড় দলবদল মানেই ছিল যেন ছোটখাটো অভিযান। কখনও ফুটবলারকে নিয়ে রীতিমতো টানাটানি, কখনও গোপন বৈঠক, কখনও রাতের ট্রাঙ্ক কল, কখনও আবার সাত দিন নিখোঁজ থাকার পর সংবাদপত্রে ‘কিডন্যাপড’ শিরোনাম!সুকুমার সমাজপতির দলবদলের গল্প সেই সময়ের কলকাতা ফুটবলের চরিত্রটাকেই যেন চোখের সামনে তুলে ধরে। তিনি শুধু মোহনবাগান থেকে ইস্টবেঙ্গলে যাওয়া এক তারকা ছিলেন না, তাঁর দলবদল হয়ে উঠেছিল ময়দানের এক কিংবদন্তি কাহিনি।
 
আর সেই কাহিনির সবচেয়ে স্মরণীয় দৃশ্য?
 
কালিকট থেকে ফেরার পথে এক ফুটবলার হঠাৎ নিজের পুরনো দলের সঙ্গে আর ফিরলেন না। তাঁকে নিয়ে শুরু হয়ে গেল খোঁজ। সংবাদপত্রে বেরোল ‘কিডন্যাপড’। আর কলকাতা ময়দানে তখন সবাই বুঝে গিয়েছে, সুকুমার সমাজপতিকে ছিনিয়ে নিয়েছে ইস্টবেঙ্গল।