আরিফুল ইসলাম / গুয়াহাটি
সম্প্রতি কামরূপ জেলার রঙিয়ার বাসিন্দা আরিয়ান জিশান আহমেদ মহাকাশে দুটি নতুন গ্রহাণু আবিষ্কার করে আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় মহাকাশ অনুসন্ধান সংস্থা ‘নাসা’র কাছ থেকে বিশেষ স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর এই বড় সাফল্য সমগ্র অসম তথা রঙিয়াবাসীর জন্য এক অভূতপূর্ব গৌরব বয়ে এনেছে। মহাকাশ গবেষণার এই যাত্রায় আরিয়ান শুধু গ্রহাণু আবিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। বর্তমানে তিনি সূর্যের চক্র (Helio-Cycle) এবং সৌরঝড়ের (Helio-Solar Storm) অধ্যয়নের জন্য মেশিন লার্নিং (Machine Learning) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মডেল প্রয়োগের বিষয়ে গভীরভাবে কাজ করছেন।
এটি একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র গবেষণা, যা আরিয়ান তাঁর সতীর্থ তথা বান্ধবী তানফা ইয়াকিন নুরের সঙ্গে মিলে পরিচালনা করছেন। আরিয়ানের মতে, “এই প্রকল্পে সূর্য এবং পৃথিবীর উপর তার প্রভাব সম্পর্কে জানার জন্য আধুনিক কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হল ভারতীয় সৌর মানমন্দিরগুলির তথ্য ব্যবহার করে সৌর আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে সক্ষম একটি উন্নত ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।”
টেলিস্কোপ দিয়ে মহাকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা মুহূর্তে আরিয়ান
এর আগে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসন্ধান সংস্থার একটি বিশেষ প্রকল্পের অধীনে আরিয়ান একটি গ্রহাণুর অনুসন্ধান ও গবেষণা চালিয়েছিলেন। তাঁর এই নিরন্তর প্রচেষ্টাকে নাসা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমানে আইএএসসি এই নতুন দুটি গ্রহাণুর অস্থায়ী নামকরণ করেছে ‘২০২৪ ভিই ৮’ (2024 VE8) এবং ‘২০২৪ ভিসি ২৩’ (2024 VC23)।
গত ১৭ ডিসেম্বর নাসা আরিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর এই আবিষ্কারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে নাসা গ্রহাণু দুটির বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা চালাচ্ছে, যে প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে ন্যূনতম এক বছর বা তারও বেশি সময় প্রয়োজন হবে। এই গবেষণা শেষ হওয়ার পর আরিয়ান নিজেই গ্রহাণু দুটির চূড়ান্ত নামকরণ করার বিরল সম্মান লাভ করবেন।
রঙিয়ার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আরিয়ান জয়ন্তীপুর যোগেশ্বর বিদ্যাপীঠ উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মিরাজুল ইসলাম এবং রুমা নাজরিনের জ্যেষ্ঠ পুত্র। আরিয়ান তাঁর প্রাথমিক ও উচ্চতর মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা রঙিয়ার ফাতিমা কনভেন্ট স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি মেঘালয়ে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (USTM)-তে বি-টেক কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রথম সেমেস্টারে অধ্যয়নরত।
‘আওয়াজ - দ্য ভয়েস’-এর সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে আরিয়ান তাঁর এই যাত্রা সম্পর্কে বলেন, “ছোটবেলা থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং মহাকাশের গতিবিধির প্রতি আমার আকর্ষণ ছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি এক অপার আনন্দ পেতাম এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে অনেক বই পড়তাম।” অষ্টম শ্রেণি থেকেই মহাকাশ বিজ্ঞানকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা শুরু করা আরিয়ান একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় নিজের প্রথম টেলিস্কোপ কেনেন।
টেলিস্কোপ দিয়ে মহাকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা মুহূর্তে আরিয়ান
বর্তমানে তাঁর সংগ্রহে দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী টেলিস্কোপ রয়েছে, যার সাহায্যে তিনি বাড়ির ছাদ থেকেই রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করেন। ২০২৪ সালে নাসা তরুণ গবেষকদের জন্য যে বিশেষ সুযোগ দিয়েছিল, তা গ্রহণ করে আরিয়ান নিজের গবেষণাপত্র জমা দিয়েছিলেন। এক বছর ধরে পর্যবেক্ষণের পর নাসা তাঁকে এই বিরল স্বীকৃতি দেয়।
আরিয়ানের ভবিষ্যতের স্বপ্ন হল ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO)-তে যোগ দিয়ে দেশের জন্য সেবা করা। এর জন্য তিনি ইতিমধ্যেই প্রস্তুতিও শুরু করেছেন। ছেলের এই অসাধারণ সাফল্যে আবেগাপ্লুত হয়ে বাবা মিরাজুল ইসলাম বলেন, “রঙিয়ার মতো একটি ছোট জায়গা থেকে আমাদের মতো একটি সাধারণ পরিবারের ছেলে এমন একটি বড় সাফল্য অর্জন করেছে, এটি সত্যিই গর্বের বিষয়। মানুষ ওকে আশীর্বাদ করবেন, যাতে ভবিষ্যতে সে একজন সফল জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।”