স্বাধীনতার পর ভারতীয় ক্রীড়া ক্ষেত্রের কিছু মুসলিম ক্রীড়াবিদের সাফল্যের কাহিনী
"আওয়াজ: দ্যা ভয়েস আসাম ব্যুরো"
দেশ বিভাজন ও স্বাধীনতার পর ভারতের ক্রীড়াক্ষেত্রে মুসলিম ব্যক্তিদের সাফল্যের যাত্রাপথ এক মনোমুগ্ধকর গল্প হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে এটা স্পষ্ট হয় যে, দেশের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পরেও ভারতে মুসলিমদের জন্য সব পথ খোলা রয়েছে এবং দেশ সবসময় প্রতিভাকে সুযোগ দিয়েছে ধর্মকে নয়। ক্রীড়াক্ষেত্রে মুসলিমদের অবদান একটি বিশাল গ্রন্থের বিষয় হতে পারে। এই লেখায় আমরা বিভিন্ন খেলার কিছু জনপ্রিয় ও সফল মুসলিম ব্যক্তিত্বকে উপস্থাপন করছি।
দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেট দিয়েই আমরা শুরু করতে চাই। ভারতে মুসলিম ক্রিকেটারদের একটি দীর্ঘ তালিকা রয়েছে। এই তালিকায় আছেন—গুলাম আহমেদ, সেলিম দুরানি, আব্বাস আলী বাইগ, মনসুর আলী খান পাতৌদি, ফারুক ইঞ্জিনিয়ার, সৈয়দ আবিদ আলি, সৈয়দ মুস্তাফা হুসেইন, সৈয়দ কিরমানি, গুলাম আহমেদ হাসান, মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন, আরশাদ আয়ুব, জহির খান, সৈয়দ সাবা করিম, মোহাম্মদ কাইফ, ইরফান পাঠান, মুনাফ প্যাটেল, ওয়াসিম জাফর, ইউসুফ পাঠান, মোহাম্মদ শামি, মোহাম্মদ সিরাজ এবং সরফরাজ খান।
ভারতীয় ক্রিকেটে এক কিংবদন্তি নাম হলেন "টাইগার পাতৌদি" নামে পরিচিত নবাব মনসুর আলী খান। তিনি ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে গণ্য হন। তিনি ৪৬টি টেস্ট ম্যাচে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে মোট ২৭৯৩ রান সংগ্রহ করেন। ১৯৬২ সালের মার্চ মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ২১ বছর ৭৭ দিন বয়সে তিনি সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট অধিনায়ক হন।
মনসুর আলি খান পতৌদি
তাঁর উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বগুলির মধ্যে অন্যতম হলো ভারতকে ১৯৬৮ সালে বিদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় (নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে) উপহার দেওয়া। এটি ছিল ভারতের জন্য বিদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়ও। ১৯৬১ সালে ইংল্যান্ডে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরেও পাতৌদি এক চোখে খেলেই ক্রিকেটের মাঠে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দিয়েছিলেন।
ক্রিকেটের আরেকটি উজ্জ্বল নাম হলেন “ওয়ান্ডার বয়” মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন। তিনি টেস্ট ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুতেই, ১৯৮৪ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম তিনটি টেস্ট ম্যাচে টানা তিনটি শতরান করেছিলেন। কলকাতার ইডেন গার্ডেনেই তার টেস্ট অভিষেক হয়েছিল। আজহারউদ্দিনের এই অভূতপূর্ব কৃতিত্ব প্রথম তিনটি টেস্টেই শতরান করার রেকর্ড আজও অটুট রয়েছে।
মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন
ভারতের হয়ে আজহারউদ্দিন ৯৯টি টেস্ট এবং ৩৩৪টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। অধিনায়ক হিসেবে তিনি ১৯৯০-৯১ এবং ১৯৯৫ সালের এশিয়া কাপে ভারতকে চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই ভারত ১৯৯৬ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে সেমি-ফাইনালে পৌঁছায়। নব্বইয়ের দশকে অনুষ্ঠিত তিনটি ক্রিকেট বিশ্বকাপে তিনি ভারতকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা আজও একটি রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত।
ফুটবলের কথা বলতে গেলে, একটা সময় ছিল যখন ভারত বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকের প্রতিযোগী ছিল। যদিও এখন সেই অবস্থার অবনতি ঘটেছে, তবুও ভারতকে গৌরবান্বিত করা মুসলিম ফুটবলারদের তালিকায় সর্বপ্রথম উল্লেখ করতে হবে ভারতীয় ফুটবলের পিতৃতুল্য সৈয়দ আব্দুল রহিমের নাম।
তিনি স্বাধীনতার পূর্বে একজন খেলোয়াড় হিসেবে এবং পরে প্রশিক্ষক হিসেবে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছিলেন। ভারতীয় ফুটবল দলের হয়ে খেলা অন্যান্য কিছু বিশিষ্ট মুসলিম খেলোয়াড় হলেন,তাজ মহম্মদ, আহমেদ খান, ইউসুফ খান, বি. পি. সালেহ, সৈয়দ নইমুদ্দিন, নূর মহম্মদ, রহমত, টি. আব্দুর রহমান, মহম্মদ হাবিব, মহম্মদ আকবর এবং লতিফুদ্দিন।
স্বাধীনোত্তর ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল নাম হলেন সৈয়দ আব্দুল রহিমের পুত্র সৈয়দ শাহিদ হাকিম। ভারতীয় বায়ুসেনার প্রাক্তন স্কোয়াড্রন লিডার এস. এস. হাকিমের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় ছিল ১৯৬০ সালের রোম অলিম্পিকে খেলা। সেসময় তাঁর পিতা দলের প্রধান কোচ ছিলেন। যদিও ভারত গ্রুপ পর্যায় থেকে এগিয়ে যেতে পারেনি, তথাপি ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ১-১ গোলে ড্র করা ম্যাচটি কোনো অংশেই কম কৃতিত্বের ছিল না।
রাষ্ট্রপতির থেকে পুরস্কার গ্রহণের সময় হাকিম
পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে হাকিম কোচিংয়ের দিকেই অগ্রসর হন এবং পরে ভারতীয় জাতীয় দলের সহকারী কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফিফা স্বীকৃত রেফারি হিসেবে তিনি ১৯৮৮ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত এএফসি এশিয়ান কাপে রেফারির দায়িত্ব পালন করেন।
এক সময় ভারতের আধিপত্য থাকা খেলা হকির কথা বলতে গেলে উল্লেখ করতে হবে আখতার হুসেন, আসলাম শের খান, মোহাম্মদ শাহিদ, জাফর ইকবালসহ একাধিক মুসলিম খেলোয়াড়ের নাম। এর মধ্যে বারাণসী থেকে উঠে আসা মোহাম্মদ শাহিদ সবচেয়ে বেশি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ১৯৭০ ও ৮০-র দশকে তাঁর পায়ের জাদু, দ্রুততা ও দুর্দান্ত ড্রিবলিংয়ের সাহায্যে তিনি অতি অল্প বয়সেই তারকাখ্যাতি লাভ করেন।
মোহাম্মদ শাহিদ ছিলেন ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিকে স্বর্ণপদকজয়ী, ১৯৮২ সালের এশিয়ান গেমসে রৌপ্য এবং ১৯৮৬ সালের এশিয়ান গেমসে ব্রোঞ্জপদকজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তিনি ১৯৮১-৮২ সালের বিশ্বকাপে, ১৯৮৪ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে এবং ১৯৮৮ সালের সিওল গেমসেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৮৫-৮৬ সালের সময়কালে তিনি ভারতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৮৯ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি আন্তর্জাতিক হকি থেকে অবসর গ্রহণের ঘোষণা করেন।
মোহাম্মদ শাহিল
টেনিসের কথা এলে যেসব মুসলিম ব্যক্তিত্বদের নাম মনে পড়ে, তাদের মধ্যে রয়েছেন আখতার আলী, জীশান আলী এবং সানিয়া মির্জা। ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত আখতার আলী ছিলেন ইন্ডিয়ান ডেভিস কাপ দলের সদস্য এবং পরে প্রশিক্ষকের ভূমিকা পালন করেন। তাঁর পুত্র জীশান আলী পিতার পথ অনুসরণ করেছিলেন। তবে ভারতীয় টেনিসকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনার কৃতিত্ব সানিয়া মির্জারই।
সানিয়া মির্জা একমাত্র ভারতীয় মহিলা যিনি সিঙ্গলসে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ খেলোয়াড়ের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছিলেন এবং পরে ডাবলসে বিশ্বের ১ নম্বর র্যাঙ্কিং অর্জন করতে সক্ষম হন। তিনি ছয়টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা জয় করেন—মহিলাদের ডাবলসে তিনটি এবং মিক্সড ডাবলসে তিনটি। ২০০৩ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে তিনি ৪৩টি সিঙ্গলস খেতাব জিতেছেন এবং পাশাপাশি ডাবলসে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় খেলোয়াড় হিসেবে ৯১ সপ্তাহ কাটিয়েছেন।
সানিয়া মির্জাসানিয়া মির্জা

সানিয়া মির্জা
এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমস এবং আফ্রো-এশিয়ান গেমসেও সানিয়া মোট ১৪টি পদক (এর মধ্যে ৬টি স্বর্ণপদক) অর্জন করেন। ২০০৭ সালে তিনি ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ একক র্যাঙ্কিং ২৭ অর্জন করেন, যা কোনো ভারতীয় মহিলার জন্য এখনো পর্যন্ত সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিং। ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে তিনি WTA ডাবলস র্যাঙ্কিং-এ বিশ্বের ১ নম্বরে পৌঁছান এবং শীর্ষ স্থানে ওঠা প্রথম ভারতীয় খেলোয়াড় হন।
ব্যাডমিন্টনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল ও জনপ্রিয় মুসলিম খেলোয়াড় হলেন সৈয়দ মোদী। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত টানা আটবার জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে সৈয়দ মোদীকে ভারতীয় ব্যাডমিন্টনের অন্যতম সফল খেলোয়াড় হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯৮২ সালের ব্রিসবেন কমনওয়েলথ গেমসে পুরুষ এককে তিনি স্বর্ণপদক জিতেছিলেন। এছাড়াও তিনি অস্ট্রিয়া ইন্টারন্যাশনাল (১৯৮৩ ও ১৯৮৪) এবং ইউএসএসআর ইন্টারন্যাশনাল (১৯৮৫)-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়ও খেতাব জয় করেন। ১৯৮৮ সালে লক্ষ্ণৌতে সৈয়দ মোদীকে করুণভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।
সৈয়দ মোদী
বক্সিংয়ের জগতে নিখাত জারিনের নামটি উজ্জ্বলভাবে আলো ছড়ায়। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক জিতে বক্সিং জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করা নিখাত প্রথমবার ২০১১ সালের মহিলা জুনিয়র ও যুব বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক অর্জন করেছিলেন। এরপর নিখাত জারিন ২০১৯ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে রৌপ্যপদক, ২০২২ সালে ইস্তানবুলে অনুষ্ঠিত বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক এবং বার্মিংহাম কমনওয়েলথ গেমসে স্বর্ণপদক জয় করেন।
২০২৩ সালে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত IBA মহিলা বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে আরও একটি স্বর্ণপদক জিতে তিনি এই কৃতিত্ব দু’বার অর্জনকারী মাত্র দ্বিতীয় ভারতীয় মহিলা হিসেবে বিবেচিত হন। একই বছরে হাংঝৌতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে তিনি ব্রোঞ্জপদক লাভ করেন এবং প্যারিস অলিম্পিকের শেষ ১৬-রাউন্ডে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করেন।
নিখাত জারিন
কাবাডিতে পুরুষ ও মহিলা উভয় শাখাতেই দীর্ঘদিন ধরে ভারত আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। মুসলিম মহিলাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম হলেন বিহারের শামা পারভীন। তিনি ২০০৮ সালে কাবাডি খেলতে শুরু করেন এবং বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক সম্মান অর্জন করেন। ২০১৭ সালের এশিয়ান কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদকজয়ী ভারতীয় দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন শামা পারভীন।
শামা পারভিন
দিল্লির নাসরিন শেখ ভারতীয় মহিলা খো-খো দলের নেতৃত্ব দিয়ে অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত দ্বিতীয় খো-খো খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে ভারত দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে স্বর্ণপদক অর্জন করতে সক্ষম হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী খো-খো বিশ্বকাপে জয়ী ভারতীয় দলেরও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।
ভারতে মহিলা মোটরস্পোর্টসের কথা উঠলে বিশেষভাবে মনে পড়ে আলিশা আবদুল্লার নাম। ভারতের দ্রুততম মহিলা কার রেসার এবং দেশের প্রথম মহিলা বাইক রেসিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরিচিত আলিশার জন্ম ১৯৮৯ সালে চেন্নাইয়ে। ছোটবেলা থেকেই তিনি রেসিংয়ের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন।
আলিশা আব্দুল্লা

আলিশা আব্দুল্লা
আলিশা আবদুল্লাহ ২০০৪ সালে জে কে টায়ার ন্যাশনাল রেসিং চ্যাম্পিয়নশিপে শীর্ষ পাঁচজনের মধ্যে জায়গা করে নিয়ে শুধু নয়, রেসিং জগতেও নিজের অবস্থান সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। পিতার নির্দেশনায় তিনি গাড়ি থেকে বাইক রেসিংয়ের জগতে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু ২০১০ সালে বাইক চালানোর সময় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর তিনি পুনরায় কার রেসিংয়ে ফিরে আসেন। তিনি রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত দেশের প্রথম মহিলা মোটরস্পোর্টস তারকা।