মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারি চিকিৎসক ত্রিপুরায় নজির মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ জাকারিয়ার

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 11 h ago
ডাক্তার আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ জাকারিয়া
ডাক্তার আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ জাকারিয়া

নুরুল হক,আগরতলা

মাদ্রাসায় পড়া মানেই উগ্র মৌলবাদী শিক্ষার মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদী কিংবা আলেম মৌলানা হয়ে ধর্মীয় জ্ঞান বিতরণ! ভারতবর্ষের মাটিতে মাদ্রাসা নিয়ে একাংশের এই ধরনের গতানুগতিক সাধারণ চিন্তাধারার ঊর্ধ্বে উঠে এবারের সরকারি ডাক্তার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরলেন একমাত্র মাদ্রাসার ছাত্র। শুধু তাই নয় মাদ্রাসা শিক্ষকের তিন ছেলে মেয়ের মধ্যে দুজন ডাক্তার এবং একজনকে ইঞ্জিনিয়ার বানিয়েছেন একজন আরবি শিক্ষিত মাদ্রাসা শিক্ষক। এই ঘটনা দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের প্রান্তিক রাজ্য ত্রিপুরায়।
 
গত কয়েক বছর যাবতই ত্রিপুরার একাধিক মাদ্রাসা শিক্ষিত ছাত্রছাত্রীরা কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের মধ্য দিয়ে নিজেদের সমাজের সামনে তুলে ধরে নজির তৈরি করছেন। এবার ত্রিপুরা পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরিচালিত জেনারেল ডিউটি মেডিকেল অফিসার পদে চাকরি পরীক্ষায় প্রথম ৩০ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে রীতিমতো তাক লাগিয়েছেন এক মাদ্রাসা ছাত্র।  সেই কৃতি সন্তানের নাম ডাক্তার আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ জাকারিয়া।
 
আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ জাকারিয়ার বাড়ি ত্রিপুরার সিপাহীজলা জেলার সোনামুড়া মহকুমার দুর্লভ নারায়ন গ্রামে। অতি সম্প্রতি ত্রিপুরা পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরিচালিত স্বাস্থ্য দপ্তরের জেনারেল ডিউটি মেডিকেল অফিসার  পদে চাকরি পরীক্ষায় যোগ্যতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন। গত ১৩ আগস্ট জেনারেল ডিউটি মেডিকেল  অফিসার পদে উত্তীর্ণ ২১৬ জনের নামের তালিকা প্রকাশিত হয়েছে।  সেই তালিকায় প্রথম ৩০ নম্বরে রয়েছেন আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ জাকারিয়া। ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় মোহাম্মদ জাকারিয়ার প্রাপ্ত নম্বর ৬৮ দশমিক ৮। এই তালিকা প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জাকারিয়া বিশেষ চর্চায় রয়েছেন। মেডিকেল অফিসার পদে উত্তীর্ণদের এই তালিকায় আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জাকারিয়া ছাড়াও সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের আরো চারজন কৃতি সন্তানের নাম রয়েছে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে সর্বাধিক চর্চিত হয়েছেন আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ জাকারিয়া। এই চর্চার কারণ হলো মোহাম্মদ জাকারিয়া নিজের প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা নিয়েছেন একটি মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তাই মাদ্রাসার ছাত্র ডাক্তার হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিশেষ চর্চা শুরু হয়েছে।
 
এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে "আওয়াজ বাংলা" থেকে আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ জাকারিয়াকে ফোন করা হলে তিনি মাদ্রাসায় শিক্ষা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। মোহাম্মদ জাকারিয়া অত্যন্ত গর্বের সাথে বলেন তিনি প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা নিয়েছেন ত্রিপুরা রাজ্যের সিপাহীজলা জেলার সোনামুড়া স্থিত দাউদারানী সিদ্দিকিয়া এইচএস ফাজিল মাদ্রাসা থেকে। ত্রিপুরা সরকারের অনুদান প্রাপ্ত মাদ্রাসাগুলির মধ্যে অন্যতম প্রাচীন এবং স্বনামধন্য এই মাদ্রাসায় আরবি শিক্ষার সাথে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন মোহাম্মদের জাকারিয়া।
 
ডাক্তার জাকারিয়ার বাবা নুরুল ইসলাম দাউদারানী সিদ্দিকিয়া এইচ এস ফাজিল মাদ্রাসার একজন স্নাতকোত্তর এরাবিক শিক্ষক। ডাক্তার জাকারিয়া আরো বলেন তিনি দাউদারানী সিদ্দিকিয়া এইচএস ফাজিল মাদ্রাসা থেকেই মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেছিলেন এবং সেই পরীক্ষায় সমস্ত বিষয়ে লেটার মার্ক নিয়ে তিনি প্রথম বিভাগে পাশ করেছিলেন। মাধ্যমিক পাস করার পর যেহেতু এই মাদ্রাসায় সাইন্স বিভাগ ছিল না তাই তিনি আগরতলার স্বনামধন্য উমাকান্ত উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশোনা করেন এবং সেখানেও সমস্ত বিষয়ে লেটার মার্ক নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন।
 
ডাক্তার আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ জাকারিয়া পাঠগ্রহণ করা মাদ্রাসার ছবি 
 
মাদ্রাসায় শিক্ষার শিক্ষার ধরন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন ত্রিপুরার সমস্ত সরকারি মাদ্রাসা গুলিতে সরকারি এস সি ই আর টি পরিচালিত পাঠ্যক্রম অনুযায়ী সাধারণ বিষয়ে অত্যন্ত উন্নত মানের শিক্ষা দেওয়া হয়। সাধারণ বিষয়গুলির সঙ্গে কুরআন, হাদিস এবং এরাবিকের উপর অতিরিক্ত কিছু বিষয় যুক্ত থাকে। মাদ্রাসা ছাত্ররা সাধারণ বিষয়গুলির পাশাপাশি কোরআন, হাদিস এবং এরাবিকের উপর অতিরিক্ত জ্ঞান নিয়ে থাকে।
 
তিনি আরো বলেন তৎকালীন সময়ে(২০১৫সালে) সাধারণ স্কুলের ছাত্ররা যখন মাধ্যমিকে ৭০০ নাম্বারে পরীক্ষা দিয়েছিল তখন মাদ্রাসার ছাত্রদের কুরআন, হাদিস এবং এরাবিকের অতিরিক্ত বিষয় সহ মোট ১০০০ নম্বরে পরীক্ষা দিতে হতো। মাদ্রাসায় সাধারণ এবং এরাবিক সমস্ত বিষয়গুলিতে যোগ্যতার সাথে শিক্ষা নেওয়ার পরেই একজন ছাত্রকে পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হয়। তাই মাদ্রাসায় শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা কিংবা অন্য কোন ধরনের বিচ্ছিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে এই ধরনের গতানুগতিক চিন্তাধারা সঠিক নয়। ডাক্তার জাকারিয়া বলেন মাদ্রাসায় অত্যন্ত উন্নত মানের শিক্ষা পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে যা কোন অংশ এই সরকারি সাধারণ স্কুল থেকে কম নয়। মাদ্রাসায় পুঁথিগত জ্ঞানের পাশাপাশি ছাত্রদের চরিত্র গঠন এবং শিষ্টাচারে বিশেষ লক্ষ্য রাখা হয়। 
 
এস ফাজিল মাদ্রাসা থেকে মাধ্যমিক এবং উমাকান্ত স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হওয়ার পর ২০১৮ সালে সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় মাধ্যমে আগরতলা সরকারি মেডিকেল কলেজ তথা এজিএমসিতে এম বি বি এস এ ভর্তি হন এবং ডাক্তারি শিক্ষা শেষ করেন। চলতি বছরে ত্রিপুরা সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের অধীন জেনারেল ডিউটি মেডিকেল অফিসার পদে পরীক্ষা দেন এবং যোগ্যতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এখনো পর্যন্ত সরকারিভাবে তিনি অফার পাননি । তবে খুব শীঘ্রই তিনি ত্রিপুরা সরকারের অধীনে ডাক্তার হিসেবে কাজ শুরু করবেন।
 
প্রসঙ্গত আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ জাকারিয়ার পরিবারে ওনার বাবা-মা সহ তিন ভাইবোন রয়েছেন। আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জাকারিয়ার বড় বোন ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বর্তমানে ত্রিপুরা সরকারের অধীনে জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি করছেন। একইভাবে তার ছোট বোন আগরতলা সরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে এম বি বি এস শেষ করেছেন এবং চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মোহাম্মদ জাকারিয়া এবং তার বোন দুজনই আগামী দিনে ডাক্তারিতে উচ্চ শিক্ষা নিতে এমডি কোর্স করবেন। মোহাম্মদ জাকারিয়া ইতিমধ্যেই প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ডাক্তারিতে মাস্টার ডিগ্রী করার স্বীকৃতি পেয়েছেন।
 
তিনি আগামীদিনে একজন শিশু বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করতে চাইছেন। মাদ্রাসা ছাত্র-ছাত্রীদের দেশাত্মবোধ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন এই দেশ আমার মাতৃভূমি। তবে দেশাত্ববোধ শুধুমাত্র কোন স্লোগান কিংবা বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলেন দেশের মানুষের সেবা এবং সমাজের উন্নতির সাথে কাজ করার মধ্য দিয়েই প্রকৃত দেশপ্রেমের পরিচয়। সাধারণ স্কুলের মতই মাদ্রাসা ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাথমিক স্তর থেকেই সেই দেশপ্রেমের ভাবনা গড়ে তোলা হয়।
 
ডাক্তার আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জাকারিয়া আগামী দিনে একজন শিশু বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেশের মানুষের কল্যানে কাজ করতে চান। মোহাম্মদ জাকারিয়ার এই সাফল্য তার ব্যক্তিগত যোগ্যতার পাশাপাশি ত্রিপুরার মাদ্রাসার উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থাকেও ফের একবার সামনে তুলে এনেছে বলেই তথ্যবিজ্ঞ মহলের অভিমত।