আজাদ হিন্দ ফৌজের ভ্রাতৃত্ববোধ নেতাজির উত্তরাধিকারকে জাগ্রত রেখেছে

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 8 h ago
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু
 
রত্নজ্যোতি দত্ত

সুভাষ চন্দ্র বসুর বিষয়ে লেখা, যাঁকে শ্রদ্ধাসহকারে আমরা নেতাজি বলে সম্বোধন করি, আমার কাছে একাধারে গৌরবজনক এবং কঠিন কাজ। ইতিহাসে তাঁর উত্তরাধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত, যা নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে পুনরায় তুলে ধরা সত্যিই এক দুরূহ কাজ। তবুও তাঁর সামগ্রিক ব্যাক্তিত্বের আমাদের জাতীয় জীবনে প্রভাবের কথা মনে রেখে ও বিশেষ করে বর্তমানের যুব প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার কথা মাথায় রেখে এ লেখাটি লেখার প্রয়াস করছি। 
 
নেতাজির যাত্রাপথ, অস্ট্রিয়া থেকে বার্লিন, লন্ডন থেকে সিঙ্গাপুর এবং কাবুল থেকে মস্কো, তাঁকে প্রকৃত অর্থে একজন আন্তর্জাতিকতাবাদী হিসেবে উপস্থাপন করে। তাঁর এই বিশ্বজনীন অবস্থান সত্ত্বেও, তিনি স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। একজন বিপ্লবী, রাজনীতিক, কৌশলী ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে অসামান্য কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন।
 
 বিসরখ গ্রাম 
 
উত্তর ভারতে, আমার নিজস্ব পূর্বোত্তর ভারতের ভৌগলিক শিকড় থেকে দূরে বসবাস করতে গিয়ে, আমি বহু অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প শুনেছি। তেমনি একটি গল্প আজও আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। তা হলো উত্তর প্রদেশের গৌতম বুদ্ধ নগর জিলার অন্তর্গত  বিসরখ গ্রামের ভিন্নধর্মী এক কাহিনি।
 
প্রচলিত ধারণনায় বিসরখ রাবণের পিতার জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত। এই জায়গাটি পৌরাণিক বিশ্বাসে ঘেরা অনন্য সাংস্কৃতিক এক ঐতিহ্য বহন করে। গ্রামের মানুষ মনে করেন তারা রাবনের পিতার উত্তরাধিকারী। রাবনের পিতা ছিলেন ভগবান শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত। গ্রামবাসীরা উত্তরাধিকারের সূত্রে রাবন বধের বার্ষিক উৎসব পালন থেকে বিরত থাকে। তবে এই পৌরাণিক বিশ্বাসের পাশাপাশি, গ্রামের মানুষ আরও এক গৌরবগাথাকে একাত্মক করে নিয়েছেন, নেতাজি এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ (আই এন এ)-এর সঙ্গে থাকা তাদের এক আত্মিক সম্পর্ক।
 
এই গ্রামটি গর্ব সহকারে  স্মরণ করে তার এক সন্তানকে যিনি একসময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিল। কিন্তু নেতাজির ঐতিহাসাসিক "চলো দিল্লি" আহ্বানে সাড়া দিয়ে ব্রিটিশ সেনার পদমর্যাদা ত্যাগ করে আজাদ হিন্দ ফৌজে (INA) যোগদেন করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদানকারী এই সৈনিকের সাহসিকতা বিসরখ গ্রামের সামগ্রিক পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে, একটি উত্তরাধিকার, যাকে প্রতিদিন গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন গ্রামবাসীরা।
 
আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনানীর সাথে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু 
 
নেতাজির অদম্য চেতনার পালন করতে গ্রামবাসীরা একটি অনন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তারা বর্তমানে একটি বিশাল প্রবেশদ্বার নির্মাণ করছেন  এবং সাথে নেতাজির একটি বৃহৎ মূর্তি স্থাপন করতে উদ্যোগী হয়েছেন। এই মূর্তিটি শুধুমাত্র ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের একজন মহান ব্যক্তিত্বকেই স্মরণ করবে না, সাথে এটি হয়ে থাকবে গ্রামবাসীদের নেতাজির প্রতি থাকা চিরন্তন শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার প্রতীক। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও হয়ে থাকবে এক অনুপ্রেরণার স্রোত। 
 
আমার কাছে বিশেষভাবে এ কথাটি অনুপ্রেরণাদায়ক মনে হয়েছে যখন জানতে পারি যে INA সৈনিকদের বংশধরেরা সেই পূর্বপুরুষ বীরদের একটি বিশদ তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ করে চলেছেন। তারা কলকাতায় নেতাজির পরিবারের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন, যা স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় গড়ে ওঠা গভীর এবং চিরস্থায়ী সম্পর্কেরই এক জাগ্রত প্রতিফলন। বহু দশক পেরিয়ে গেলেও নেতাজির নেতৃত্ব আজও দেশে ঐক্য এবং নিঃস্বার্থ সেবার প্রেরণা জোগায়।
 
নেতাজির উত্তরাধিকারের অনন্য দিকগুলি
 
 জাট ও গুজ্জর সম্প্রদায়ের মধ্যে নেতাজির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা বিদ্যমান 
 
 সিঙ্গাপুরের মহিন্দ্রু পরিবারের সঙ্গে নেতাজির আত্মিক সম্পর্ক 
 
 দেরাদুনের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে নেতাজির নামাঙ্কিত রাস্তা
 
উত্তর ভারতের জাট এবং গুজ্জর সম্প্রদায় নেতাজিকে ততটাই শ্রদ্ধা করে যতটা করেন  বাঙালিরা। এই শক্তিশালী জাতিগুলোর বহু বয়োজ্যেষ্ঠরা নেতাজির নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রামে শরিক হয়েছেন।
 
INA স্মৃতি বিজড়িত গ্রাম
 
জাতীয় ঐক্য ও মাতৃভূমির প্রতি আত্মবলিদানের আদর্শকেও তাঁরা পূর্ণরূপে গ্রহণ করেছিলেন। নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নেতাজি এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অতুলনীয় অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার বীজ বপন করা। এক আমাদের সবার এক জাতীয় কর্তব্য। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে নেতাজির দেশপ্রেম চিরকাল ভারতীয় যুবসমাজের হৃদয়ে উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলবে, যেমনটা হয়েছিল দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়।
 
চায়ের আড্ডা
 
যখনই সুযোগ পাই, আমি আমার দেশের ধুলোমাখা অঞ্চলগুলোতে ঘুরে বেড়ানোর চেষ্টা করি, মানুষের সঙ্গে দেখা করতে, কথা বলতে চাওয়া যেন একরকম “চায়ের আড্ডা” হয়ে ওঠে সেই মুহূর্তগুলি। আমি জানতে চাই, মানুষ কী করে, কীভাবে করে, কী ভাবছে, কী অনুভব করছে আদির মতো অতি সাধারণ কথাগুলো। সত্যি বলতে গেলে সাধারণ মানুষের মন বোঝার এ এক বিনম্র প্রচেষ্টা মাত্র।
 
পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ সফরকালে, আমি সাহারানপুরে স্টেট ব্যাংকের এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে দেখা হয়। লাহোরে জন্ম নেওয়া এক পাঞ্জাবি, যিনি বঙ্গদেশ থেকে ১,৭০০ কিমি দূরে ছিলেন, তার বাবা-মা তার নাম রেখেছিলেন সুভাষ চন্দ্র মহিন্দ্রু। এ নামকরণের যোগসূত্র ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যিনি তখন বিদেশে থেকে ভারতের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছিলেন।
 
এই যোগসূত্রতা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, নেতাজির প্রভাব ভাষা, অঞ্চল ও ধর্মের ত্রিসীমানা ছাড়িয়ে কতদূর প্রসারিত ছিল। আর, এই উত্তরাধিকার বহন করছে মহিন্দ্রু পরিবারের আন্তর্জাতিক সাংবাদিক পুত্র সমীর এবং ৯ বছরের নাতি বিহান। সমীর আর তার পুত্র ২০২৩ সালে সিঙ্গাপুর থেকে কলকাতায় আসেন নেতাজির এলগিন রোডের বাড়িটি দর্শন করতে এবং সাথে ১৯৪১ সালে সেখান থেকে তাঁর সাহসিকতার সঙ্গে পালানোর কাহিনিটির কথাও জানতে। আজও, মহিন্দ্রু পরিবার সিঙ্গাপুরে বাড়ির ড্রইংরুমে টাঙানো নেতাজির প্রতিচ্ছবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তারা দিন শুরু করেন। আর, সমকালীন সময়ে নেতাজির আন্তর্জাতিক আকর্ষণ এখানেই প্রতিফলিত হয়।আমরা সবাই জানি, সিঙ্গাপুর নেতাজির জীবনের স্মৃতিবিজড়িত একটি ঐতিহাসিক দেশ।
 
ঐতিহাসিক ইন্ডিয়া গেট প্রাঙ্গণে নেতাজির প্রতিমূর্তি 
 
জনতা দর্শন 
 
আপনিও যদি আমার মতো সড়কপথে দেশ ঘুরে বেড়ান আর জনতা দর্শন শুরু করেন, তবে হয়তোবা এমন অসংখ্য অনুপ্রেরণায়দায়ক গল্প শুনতে পাবেন। সম্প্রতি দেরাদুন সফরের সময়ও  লক্ষ্য করলাম, শহরের এক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নামকরণ হয়েছে সুভাষ রোড, যেখানে রাজ্যের পুলিশ সদর দপ্তর এবং পুলিশ মহাপরিদর্শকের কার্য্যালয়ের ঠিকানা। নেতাজির নামাঙ্কিত বহু কিছুই, রাস্তার নাম, বিমানবন্দর, স্টেডিয়াম, লোকালয়, সারা দেশে বিদ্যমান আছে। 
 
দুর্ভাগ্যবশত, স্বাধীন ভারতের প্রারম্ভের শাসকরা নেতাজির অবদানের যথোচিত মূল্যায়ন করেননি। কিন্তু, ঐতিহাসিক ইন্ডিয়া গেট প্রাঙ্গণে নেতাজির যে প্রতিমূর্তি স্থাপন করা হয়েছে, তা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক নতুন ব্যাখ্যা নিয়ে এসেছে, যা আগামী প্রজন্মকে বুঝতে ও আবিষ্কার করতে হবে।
 
[লেখক দিল্লিস্থিত একজন বরিষ্ঠ সাংবাদিক।]