শান্তি প্রিয় রায়চৌধুরী
ঐতিহ্য আর স্থাপত্যে অনন্য অসাধারণ ভারতের প্রধান মসজিদ গুলির মধ্যে অন্যতম নাখোদা মসজিদ। যা সেন্ট্রাল কলকাতার বড় বাজারের চিৎপুর রোডে দাড়িয়ে আছে এই মসজিদ। মহাত্মা গান্ধী রোড থেকে রবীন্দ্র সরণি ধরে দক্ষিণমুখী জাকারিয়া স্ট্রীটের সংযোগস্থলে রয়েছে এই নাখোদা মসজিদ।
সুন্নি মুসলিম সম্প্রদায়ের এক সমাহার নাখোদা। প্রায় ১০ হাজার লোক এই মসজিদে একত্রে নামাজ আদায় করে। যে কোনো ধর্মের লোক ইচ্ছা করলেই এই মসজিদ দেখতে আসতে পারেন। প্রতিদিনই অনেক অসহায় মুসলিম এই মসজিদে রাত্রি যাপন করে। পবিত্র রমজান মাসে লোকেদের জন্য এখানে থাকে ইফতারি আর সেহেরির ব্যবস্থা। রমজান মাসের শেষ দশ দিনে মসজিদে বসে ইতিকাফ।
শতবর্ষী নাখোদা মসজিদ
মুঘল সম্রাট আকবরের সমাধির অনুকরণে নির্মিত এই নাখোদা মসজিদ। নাখোদা মসজিদ আজ যেখানে সেখানে আগে একটা ছোট মসজিদ ছিল। সেই জায়গাতেই গুজরাটের কচ্ছ অঞ্চলের বাসিন্দা আব্দুর রহিম ওসমান নামক একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি এই মসজিদ গড়ে তোলেন। ১৯২৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নাখোদা মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তৎকালীন সময় মসজিদটি তৈরি করতে মোট খরচ হয়েছিল ১,৫০০,০০০ টাকা। যার আজকের বাজার মূল্য কয়েকশ’ কোটি টাকা।
নাখোদা মসজিদ আল্লাহর উপাসনার ঘর। পূর্বে এ মসজিদকে “বঢ়ি মসজিদ”বলা হতো।পরবর্তীতে মসজিদটির নামকরণ হয় নাখোদা মসজিদ। নাখোদ শব্দের সমার্থক শব্দ “নাবিক”। এই মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুর রহিম ওসমান একজন সামুদ্রিক নাবিক ছিলেন। তার কর্ম এবং আল্লাহর ঘর নির্মাণে তার আগমনকে সম্মান জানিয়ে এই মসজিদের নাম করা হয় “নাখোদা মসজিদ।"
নাখোদা মসজিদকে দূর থেকে দেখলে মনে হবে ঠিক যেন মুঘল সম্রাট আকবর এর সমাধি স্থাপনা এই মসজিদ। মুঘল সম্রাট আকবরের সমাধির আদলে অনেকটা তৈরী এই ধর্মীয় স্থাপনা। এই মসজিদের বহির্ভাগে রয়েছে লাল বেলে পাথরের আস্তরণ, যা সিকান্দার এ অবস্থিত আকবর এর সমাধিতেও প্রতীয়মান। আবার এই মসজিদের অন্দরমহল শ্বেতপাথরে নির্মিত যার অনেকটাই দেখতে আগ্রায় অবস্থিত তাজমহলের অন্দরমহলের মতো।
না খোদা মসজিদের প্রবেশদ্বারের একটি ছবি
স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন নাখোদা মসজিদ। মুঘল স্থাপত্য রীতিতে তৈরী এই মসজিদ। এটি ইন্দো-শারাসেনিক স্থাপত্যের অংশও বলা হয়। মসজিদটিতে তিনটি গম্বুজ, দুই টি মিনার রয়েছে যেগুলোর উচ্চতা ১৫১ ফুট। এছাড়াও ছোট বড় আরো ২৫ টি উঁচু স্তম্ভ রয়েছে, যেগুলোর উচ্চতা ১০০ ফুট থেকে ১১৭ ফুট। সব মিলিয়ে মসজিদে সর্বমোট মিনারের সংখ্যা ২৭। মসজিদের বহি বিভাগের দৈত্যাকার আকার। সাদা মার্বেল পাথরের মেঝে, ঝাড়বাতি, বিশাল নমাজ পড়ার স্থান, প্রাচীন কাঠের ঘড়ি,বেলজিয়াম কাচ ও সূক্ষ্ম অলংকরণ এবং শৈল্পিক কল্পনার একটি অনন্য সাধারণ নিদর্শন।
নাখোদা মসজিদের প্রধান ফটকটি আগ্রার “ফতেহপুর সিক্রির” বুলন্দ দরওয়াজার আদলে তৈরি। এর গ্রানাইট পাথর গুলো বিহারের টলিপুর থেকে আনা হয়েছিল। তৈরি করেছিল ম্যাকিনটোস বার্ণ কোম্পানি।নাখোদা মসজিদের বাইরের অংশটা লাল বেলেপাথরে তৈরি আর অন্দরমহল আগ্রার তাজমহলের আদলে শ্বেত পাথরে তৈরী। মসজিদের ভিতরকার নিখুঁত অলংকরণ আর শৈল্পিক চিত্তাকর্ষক এক চমৎকার আবহ তৈরী করে।
আগ্রার ফতেপুর সিক্রিতে অবস্থিত দৃষ্টি নন্দন স্থাপনা “বুলান্দ দরওয়াজা ” এর মতো এই নাখোদা মসজিদের প্রধান ত্বোরণ দ্বার।
নাখোদা মসজিদের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন হল এই মসজিদের ওজুখানা। ওজুখানার স্থানটি মসজিদ প্রবেশের পথেই। ওজুখানাটি এক তলা একটি ভবন। প্লাজা থেকে আটটি সুদৃশ্য ধাপ বিশিষ্ট।
মসজিদের ভেতরের দৃশ্য
ওজুখানার অভ্যন্তরে ওজু করার জন্যে কূপের ব্যবস্থা রয়েছে। যার চারিপার্শ্বে মুসল্লীদের বসে ওজু করার জন্যে উঁচু ধাপ রয়েছে। কূপের জলেতে রং বেরঙের বহু মাছ রয়েছে। মুসল্লীরা ওজু করার সময়ে এই রঙ্গিন মাছের সাথে খেলা করে। কূপের দেয়ালের এক পার্শ্বে চতুরখিলান দেখা যায়। অপর পার্শ্বে দুটো খিলান দেখা যায়। কূপের উপরিভাগ উন্মুক্ত পরিসর। এই উন্মুক্ত স্থানের সাথে খোলা আকাশের একটি সম্পর্ক রয়েছে। ওজুখানা থেকে উন্মুক্ত আকাশ দেখা যায়। বৃষ্টির দিনে বৃষ্টির জল সরাসরি এই কূপে প্রবেশ করতে পারে। তখন এক অন্য রকম রূপ সৃষ্ট হয় এখানে। প্লাজা থেকে কূপ হয়ে উপরিভাগে উঠবার জন্যে একটি টানা সিঁড়ি রয়েছে। এই সিঁড়ি দিয়ে সোজা উপরে উঠা যায়। ছাদের অংশ বিভিন্ন উৎসব বা পর্বের সময় ব্যবহার করা যায়।
উৎসব” বা “পরবের” সময় নাখোদা মসজিদটিকে চমৎকার ভাবে সুসজ্জিত করা হয়। “উৎসব” বা “পরবের” দিন আনন্দ মুখর হয়ে ওঠে নাখোদা মসজিদ। ঈদের সময় মসজিদকে কেন্দ্র করে ১ লক্ষ ২৫ হাজারের বেশী মানুষের জামাত হয়। শুধু ঈদের দিন নয়, প্রতি জুম্মাবারে ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ এখানে একত্রে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করে থাকেন।
মহরমের সময় জমকালো উৎসবে মুখর হয়ে উঠে নাখোদা মসজিদ। এই সময় মসজিদ থেকে বের হয় তাজিয়া মিছিল। মিছিলের সাথে চলে লাঠি খেলা ও অস্ত্র খেলার প্রদর্শনী। নাখোদা মসজিদ ঘিরে থাকে নানা রকম সুশোভিত দোকানপাট। নানা রকম বর্ণিল কেনাকাটার মাঝ দিয়ে আরেকটি মিষ্টি সাধ গ্রহণ করতে হয়। তা হলো “ফিরনি”।
শহরের আলোয় ঝলসানো নাখোদা মসজিদ
সকল ধর্মের লোকের মিলনমেলা ও সম্প্রীতি কলকাতার নাখোদা মসজিদ পরিদর্শনে কোন বিধি-নিষেধ নেই। নেই কোনো টিকিটের ব্যবস্থা। যে কেউ এই মসজিদে ঘুরে দেখবার জন্যেও প্রবেশ করতে পারে। প্রতিদিন স্থানীয় লোকজন ছাড়াও বহু বিদেশী ও অন্য ধর্মের লোকেদের আগমন ও ঘটে এই মসজিদে। ভোর ৬.০০ টা থেকে রাত ৮.০০ টা পর্যন্ত যখন খুশি মসজিদ ঘুরে দেখা যেতে পারে। মসজিদের ভিতরে ছবি তুললেও কারো কোনো আপত্তি নেই। তবে মসজিদ আল্লাহর ঘর। কায়মনোবাক্যে, পবিত্র চিত্তে- ওযু সহকারে মসজিদে প্রবেশ করা উচিত।
সব ঐতিহাসিক স্থাপনা নিয়ে কিছু মিথ প্রচলিত আছে। নাখোদা মসজিদ তার ব্যতিক্রম নয়। ভারতীয়দের প্রজন্মবাহিত গৌরব এই নাখোদা মসজিদ থেকে পবিত্র রমজান মাসে যে ঈদের চাঁদ মসজিদের উপরে নেমে আসে সেই চাঁদ বিশেষ কোন সম্প্রদায় বা ধর্মের নয় বরঞ্চ সেই চাঁদ ভারত উপমহাদেশের সকল লোকের, সকল মানুষের।
তাই তো ইতিহাসের পাতার সব ধর্ম নির্বিশেষে নাখোদা মসজিদ অনন্য অসাধারণ।