মৃত আওয়াল মিয়ার পাশে শাহ আলম; দীর্ঘ ২৭ দিন পর হয় মৃতদেহের জানাজা

Story by  Nurul Haque | Posted by  Aparna Das • 4 h ago
মৃত আওয়াল মিয়ার পাশে শাহ আলম; দীর্ঘ ২৭ দিন পর হয় মৃতদেহের জানাজা
মৃত আওয়াল মিয়ার পাশে শাহ আলম; দীর্ঘ ২৭ দিন পর হয় মৃতদেহের জানাজা
 
নূরুল হক / আগরতলা

নিজের বাইসাইকেল চালিয়ে টানা ৩০ বছর যাবত ৪০০০ এর বেশি বেওয়ারিশ মৃতদেহকে তাঁর নিজস্ব ধর্ম মতে সৎকার এবং কবরস্থ করে দেশখ্যাত হয়েছেন উত্তরপ্রদেশ অযোধ্যার বাসিন্দা মোহাম্মদ শরীফ। সামাজিক কাজের জন্য মোহাম্মদ শরীফ পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন "শরিফ চাচা" হিসাবে। মানবিক কাজের জন্য ২০২০ সালে ভারত সরকার পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করেছিল শরীফ চাচাকে। এবার সেই শরীফ চাচার মতই ত্রিপুরায় অসহায় এবং বেওয়ারিশ মৃতদেহ সৎকার এবং কবরস্থ করার ব্যবস্থা করে মানবিকতার নজীর গড়ছেন "শাহ আলম ভাই"।
 
রাজনৈতিকভাবে একটি নির্দিষ্ট দলের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও শাহ আলম অনেক আগে থেকেই একজন উদ্যমী যুবক, সমাজসেবী এবং মানবপ্রেমী হিসেবে পরিচিত। আগরতলা শহরের রামনগর এলাকায় হিন্দু মুসলিম সহ রাজ্যের জাতি জনজাতির মানুষের কাছে নিজের সহযোগী মনোভাবের মধ্য দিয়ে "শাহ আলম ভাই" হিসেবে পরিচয় গড়ে তুলেছেন শাহ আলম। এবার এই শাহ আলম ভাইয়ের দীর্ঘ ২৭ দিনের আইনি লড়াইয়ের পর জানাজা এবং মাটি নসিব হল ৭০ বছরের আওয়াল মিয়ার বেওয়ারিশ মৃতদেহের।
 
আওয়াল মিয়ার মৃতদেহটি 'দাবিহীন পুরুষ'-র মৃতদেহ হিসেবে দীর্ঘ ২৭ দিন জিবি হাসপাতালের মর্গে পড়ে ছিল। দুই থানার পুলিশ খোঁজখবর করে চেষ্টা করেছিল আওয়াল মিয়ার কোন নিকট আত্মীয়কে বের করে মৃতদেহ হস্তান্তর করার। সামাজিক মাধ্যমের পাশাপাশি জেলা পুলিশ সুপারের তরফে বিভিন্ন পত্রিকায় মৃত আওয়াল মিয়ার ছবি সহ বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। খোঁজ করা হয় মৃত আওয়াল মিয়ার পরিবার পরিজনদের। কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি।
 

স্থানীয়ভাবে জানা যায় বছর কয়েক যাবত আউয়াল মিয়া ভাটিয়াবনগর মসজিদ এলাকায় ঘোরাফেরা করতেন। দিনের অধিকাংশ সময় তিনি কারো সাথে তেমন কথাবার্তা না বললেও মসজিদে গিয়ে বসে নিরবে কুরআন তেলাওয়াত (পাঠ) করতেন। ঠান্ডা প্রকৃতির এই বয়স্ক লোকটিকে এলাকার সবাই পছন্দ করতেন এবং মাঝেমধ্যে ডেকে নিয়ে খাবার খাওয়াতেন। এর মধ্যেই লোকটি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
 
পুলিশের কাছ থেকে জানা যায় গত ১৯ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে খুব অসুস্থ অবস্থায় আওয়াল মিয়াকে আগরতলার ভাটিয়াবনগর এলাকার কয়েকজনের সহযোগিতায় জিবি হাসপাতালে ভর্তি করেছিল দমকল কর্মীরা। ২০ এপ্রিল হাসপাতালে মৃত্যু হয় আওয়াল মিয়ার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে খবর পেয়ে পশ্চিম থানার পুলিশ আওয়াল মিয়ার পরিবারের খোঁজ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তার পরিবার খোঁজে পাওয়া যায়নি।
 
পুলিশের দাবি আওয়াল মিয়ার সঙ্গে একটি ব্যাগের ভেতর অস্পষ্ট একটি আধার কার্ড পাওয়া গিয়েছিল। যার মধ্যে তার নাম আওয়াল মিয়া এবং বাবার নাম কবির উদ্দিন লেখা ছিল। ঠিকানা স্পষ্ট করে কিছু বুঝা যাচ্ছিল না। পরবর্তীকালে পুলিশ খোঁজ নিয়ে জানতে পারে তিন বছর আগে লোকটি ত্রিপুরার সিপাহীজলা জেলার বিশ্রামগঞ্জে থাকতেন। সেই মতো তদন্ত শুরু করে বিশ্রামগঞ্জ থানার পুলিশ। কিন্তু সেখানেও তাঁর পরিবার কিংবা সঠিক ঠিকানা পাওয়া যায়নি।
 
পুলিশ তদন্তে উঠে আসে বিশ্রামগঞ্জের একটি ব্যাংকে আউয়াল মিয়ার নামে সরকারি ভাতার কিছু টাকা পড়ে আছে। এই টাকারও কোন ওয়ারিশ কিংবা দাবিদার নেই। এই সমস্ত তদন্তের পর পুলিশ আউয়াল মিয়ার মৃতদেহকে 'দাবীহীন মৃতদেহ'  ঘোষণা করে সামাজিক মাধ্যমে এবং পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়। এরপর ২৭ দিন অতিবাহিত হয় কিন্তু আউয়াল মিয়ার মৃতদেহ দাবী করেতে কেউ আসেনি।
 
স্বাভাবিকভাবেই একটি নির্দিষ্ট সময় পর বেওয়ারিশ মৃতদেহ হিসাবে আওয়াল মিয়ার দেহ মহকুমা শাসক সরকারি দায়িত্ব নিয়ে ধ্বংস (সরকারি নিয়ম অনুযায়ী শেষকৃত্য) করে দিতেন। কিন্তু মানবিকতার পরিচয় দিয়ে আউয়াল মিয়ার মৃতদেহ নিজ দায়িত্বে গ্রহণ করেন শাহ আলম। শাহ আলম মৃত দেহটি উদ্ধারের পর থেকেই পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে চেষ্টা করছিলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই বেওয়ারিশ মৃতদেহের যাতে ধর্মীয় রীতি মেনে মাটি নসিব হয়। কারণ ইসলামী নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুর পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মৃতদেহ কবরস্থ করতে হয়। ধর্মীয় মতে কোন লোকের মৃত্যুর পর মৃতদেহ যতক্ষণ পর্যন্ত মাটির উপরে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তার ওপর 'আজাব' অর্থাৎ তাঁর কৃতকর্মের শাস্তি বাড়তে থাকে।
 
শাহ আলম চেয়েছিলেন একদিন পরেই যাতে মৃতদেহটি কবরস্থ করার ব্যবস্থা করা যায়। কিন্তু পুলিশি প্রক্রিয়ায় তা সম্ভব হয়নি। পুলিশের নিয়ম তান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি আউয়াল মিয়ার মৃতদেহ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দায়িত্ব নিয়ে কবরস্থ করার জন্য সংগ্রাম চলতে থাকে শাহ আলমের।
 
অবশেষে ২৭ দিনের আইনি প্রক্রিয়ার পর শুক্রবার ভাটি অভয়নগর কবরস্থানে আওয়াল মিয়ার বেওয়ারিশ মৃতদেহ মুসলিম নিয়ম মেনে কবর দেওয়া হয়। স্থানীয় মসজিদের ইমাম সহ উদ্যমী যুবকরা শাহ আলমের এই মহতী কাজে অংশগ্রহণ করেন। কবরস্থানে সবাই মরহুম আওয়াল মিয়ার জানাজায় তার বেহেস্তের জন্য দু হাত তুলে দোয়া করেন ।