নারীর কণ্ঠস্বরকেই গবেষণার ভাষা করেছিলেন শাহিদা মুর্তজা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 7 h ago
 শাহিদা মুর্তজা
শাহিদা মুর্তজা
 
শ্রীলতা এম 

কল্যাণমূলক প্রকল্পের ঘোষণা আমরা প্রায়ই শুনি, ‘বেটি বাঁচাও’, অঙ্গনওয়াড়ি, গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা, আশা কর্মসূচি, সংখ্যালঘু বৃত্তি। কিন্তু এই প্রকল্পগুলির পেছনে যে বছরের পর বছর মাঠপর্যায়ে গবেষণা, মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ এবং নীতিনির্ধারণের জন্য রিপোর্ট তৈরির কাজ চলে, তা খুব কমই সামনে আসে। অধ্যাপিকা শাহিদা মুর্তজা সেইসব গবেষকদের অন্যতম, যিনি দীর্ঘ তিন দশক ধরে সমাজের প্রান্তিক নারীদের জীবনকে কাছ থেকে দেখেছেন, শুনেছেন এবং নথিবদ্ধ করেছেন।
 
নৃতত্ত্ববিদ ও মৌলানা আজাদ ন্যাশনাল উর্দু ইউনিভার্সিটি-এর সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন ডিন এবং নারী অধ্যয়নের প্রাক্তন অধ্যাপক শাহিদা মুর্তজা তাঁর কর্মজীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন তেলেঙ্গানা ও কর্ণাটকের মুসলিম অধ্যুষিত এবং পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলিতে গবেষণা করে। শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি মাঠসমীক্ষাকে সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল দারিদ্র্য, বৈষম্য, নারীর অধিকারহীনতা এবং সামাজিক বঞ্চনা।
 
 
মেহবুব নগরের এক তরুণী ছাত্রী হিসেবে শাহিদা মুর্তজার প্রথম আগ্রহ ছিল বিশুদ্ধ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার। কিন্তু গুলবার্গায় স্নাতকোত্তর ভর্তি প্রক্রিয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে তাঁকে নৃতত্ত্ব বিভাগে পাঠানো হয়। সেই ঘটনাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, সমাজের নীরব যন্ত্রণা ও দারিদ্র্যকে বোঝার জন্য এই বিষয়ই তাঁর উপযুক্ত ক্ষেত্র। তাঁর কথায়, “এখন আমি দারিদ্র্যকে কাছ থেকে অধ্যয়নের সুযোগ পেলাম।”
 
 
শাহিদা মুর্তজা
 
গুলবার্গার লাম্বাড়ি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁর প্রথম ক্ষেত্রসমীক্ষাই তাঁকে বাস্তব দারিদ্র্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বইয়ের পাতায় নয়, মানুষের জীবনের মধ্যেই তিনি দেখেন বঞ্চনার নির্মম চিত্র। এরপর বহু বছর ধরে তিনি ঘুরেছেন শহরের বস্তি, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা, আদিবাসী বসতি ও পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়গুলির মধ্যে।
 
এই দীর্ঘ গবেষণা-জীবনে তিনি এমন অসংখ্য পরিবার দেখেছেন, যেখানে একটি ছোট ঘরে বারো-তেরো জন মানুষ একসঙ্গে বাস করছেন। তিনি এমন নারীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, যাদের গর্ভনিরোধক বা পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না। তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া বহু কিশোরীকে তিনি দেখেছেন, যারা নতুন পরিবেশে এসে আর্থিক ও সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। একের পর এক সন্তান জন্ম দেওয়া তাদের কাছে কোনও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাধ্যতা। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তাঁর মন্তব্য, স্বাধীনতার এত দশক পরেও দেশের বহু প্রান্তিক নারীর জীবনে বড় কোনও পরিবর্তন আসেনি।
 
পিএইচডি গবেষণার সময় তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, মুসলিম সমাজ কি প্রকৃতিগতভাবে বেশি সন্তান জন্মদানে উৎসাহী? পরে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে একাধিক সমীক্ষা চালিয়ে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছন যে ধর্ম নয়, সামাজিক ও আর্থিক পরিস্থিতিই মানুষের জীবন নির্ধারণ করে। তাঁর মতে, “একই পরিস্থিতিতে যাকেই রাখা হোক, ফল একই হবে।”
 
তিনি মনে করেন, নারীদের অধিকাংশ সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে ‘এজেন্সি’ বা নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার অভাব। শিক্ষা, সরকারি প্রকল্প সম্পর্কে সচেতনতা এবং দেরিতে বিয়ে, এই তিনটি বিষয় নারীর ক্ষমতায়নের মূল ভিত্তি বলে তিনি মনে করেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দরিদ্র মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে নারীরা অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ার ফলে নিজেদের শরীর বা জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। অশিক্ষা ও সচেতনতার অভাবে তারা জানতেই পারেন না, তাদের জন্য কী ধরনের সরকারি সহায়তা বা আইনি সুরক্ষা রয়েছে।
 
সম্প্রতি হায়দরাবাদের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় এক সমীক্ষায় শাহিদা মুর্তজা দেখেছেন, নারীদের জন্য ঘোষিত একাধিক সরকারি প্রকল্প বাস্তবে কার্যকর নয়। গার্হস্থ্য হিংসার শিকার নারীদের জন্য নির্ধারিত ‘ওয়ান স্টপ সেন্টার’-এর কোনও কার্যকর উপস্থিতি তিনি খুঁজে পাননি। জীবিকাভিত্তিক প্রকল্প বা সরকারি সচেতনতা কর্মসূচিরও প্রায় অস্তিত্ব ছিল না। তাঁর বক্তব্য, “এই প্রকল্পগুলির অধিকাংশই এখন শুধু কাগজে রয়েছে।”
 
শাহিদা মুর্তজা
 
হায়দ্রাবাদের জামা মসজিদের পিছনের ঘিঞ্জি এলাকাগুলিতে তিনি এমন পরিবার দেখেছেন, যেখানে এক ঘরে এক ডজনের বেশি মানুষ বাস করছে। নারীদের ব্যক্তিগত পরিসর নেই, ঋতুস্রাবের সময় কাপড় শুকানোর জায়গা নেই, এমনকি অনেকের পুরনো কাপড় পর্যন্ত জোগাড় হয় না। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, এই অবস্থার সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই; এটি দারিদ্র্য ও বঞ্চনার ফল।
 
অন্ধ্রপ্রদেশ বিভাজনের আগেই তিনি হায়দ্রাবাদের বিভিন্ন অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। সেখানে তিনি দেখতে পান, উর্দুভাষী শিশুদের তেলুগু ভাষার শিক্ষাসামগ্রী দিয়ে পড়ানো হচ্ছে। বিষয়টি তিনি প্রশাসনের নজরে আনেন এবং বই অনুবাদ করিয়েও দেন। কিন্তু সেই বই কখনও ব্যবহার করা হয়নি। কোথাও কোথাও নথিতে শিশুদের নাম থাকলেও বাস্তবে তাদের উপস্থিতি ছিল না। তাঁর বহু গবেষণা রিপোর্টই শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক স্তরে থেমে গেছে বলে তিনি জানান।
 
দীর্ঘ কর্মজীবনে বিভিন্ন সরকারি দফতরের জন্য তিনি বহু গবেষণা রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে তাঁকে কিছু জানানো হয়নি। এই অভিজ্ঞতাকে তিনি হতাশাজনক বলেই মনে করেন। সংখ্যালঘু শিক্ষার ক্ষেত্রেও তিনি গত এক দশকে বড় পরিবর্তন দেখেছেন। তাঁর মতে, আগে সংখ্যালঘু পড়ুয়াদের জন্য যে গবেষণা বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা ছিল, তার অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে। ‘মনা’-র মতো সংস্থাগুলিও এখন আর আগের মতো ছাত্রছাত্রীদের সহায়তা করতে পারে না।
 
তবুও সমাজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ২০০৪ সালে তিনি এমন একটি মডেল প্রস্তাব করেন, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি গ্রামে সচেতনতা ছড়ানো, ডিজিটাল পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া এবং সরকারি প্রকল্প সম্পর্কে মানুষকে জানাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। প্রথমে আংশিক অর্থ বরাদ্দ হলেও পরে ইউজিসি পিছিয়ে গেলে সেই প্রকল্প মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যায়।
 
কর্ণাটকে শিক্ষকতার শুরুতে তিনি ‘কাথ্যায়িনী মহিলা মণ্ডল’ নামে একটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীও তৈরি করেছিলেন, যা পরে রাজ্যের প্রথম ডিডব্লিউসিআরএ প্রকল্পে পরিণত হয়। তিনি নিজে মহিলাদের প্রশিক্ষণ দিতেন, আটা পেষার মেশিন কিনে দিয়েছিলেন এবং তাদের তৈরি আটা ও মশলার গুঁড়ো বিক্রির ব্যবস্থাও করেছিলেন। এর মাধ্যমে বহু নারী প্রথমবার নিজেদের উপার্জনের সুযোগ পান।
 

শাহিদা মুর্তজার কাছে শিক্ষকতা কখনও শুধু পেশা ছিল না। তিনি বলেন, “আমি কখনও বই নিয়ে ক্লাসে যেতাম না। নারীদের জীবনই ছিল আমার পাঠ্যপুস্তক।” তাঁর মতে, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র জীবিকা অর্জন নয়, সমাজকে সংবেদনশীল করে তোলা। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মাঠপর্যায়ে কাজ করার পর তাঁর উপলব্ধি, অঞ্চল বদলালেও সমস্যার ধরন বদলায় না। বাল্যবিবাহ, অশিক্ষা, আর্থিক নির্ভরতা, অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং নারীর উপর নিয়ন্ত্রণ, এই একই চিত্র তিনি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখেছেন।
 
তাঁর মতে, বিভিন্ন সরকার বহু প্রকল্প চালু করলেও প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে সেই সুবিধা এখনও পৌঁছয় না। নীতিনির্ধারণ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে, সেটিই সবচেয়ে বড় সমস্যা। আর সেই কারণেই, তাঁর সমগ্র গবেষণা ও অভিজ্ঞতার শেষে তিনি ফিরে আসেন একটি শব্দেই, ‘এজেন্সি’। তাঁর বিশ্বাস, নারীদের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে সমাজের অনেক সমস্যারই সমাধান সম্ভব।