এহসান ফাজিলি / শ্রীনগর
কাশ্মীরের শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল নাম প্রফেসর নীলোফার খান। দীর্ঘ চার দশকের একাডেমিক অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং শিক্ষার প্রতি গভীর অঙ্গীকার তাঁকে এনে দিয়েছে বিশেষ সম্মান। কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম মহিলা উপাচার্য হিসেবে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং সমগ্র সমাজে নারীদের অগ্রগতির এক শক্তিশালী প্রতীক। শিক্ষা, গবেষণা ও নেতৃত্ব, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখে চলেছেন অনন্য ছাপ।
“আমার যাত্রাপথ কখনও হঠাৎ করে তৈরি হয়নি, বরং ধীরে ধীরে শিক্ষা, দায়িত্ববোধ এবং পরিবারের সমর্থনের মধ্য দিয়েই তা গড়ে উঠেছে। আমি এমন এক সময়ের কাশ্মীরের অংশ ছিলাম, যখন নারীরা উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে আসছিলেন ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক জীবন বা নেতৃত্বের পদে তাঁদের উপস্থিতি তখনও খুব সীমিত ছিল। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে নিজের অবস্থান তৈরি করতে গেলে দৃঢ় সংকল্প, কঠোর পরিশ্রম এবং সমাজের জন্য কিছু করার স্পষ্ট লক্ষ্য থাকা জরুরি ছিল,” আওয়াজ-দ্য ভয়েসকে জানিয়েছেন কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা উপাচার্য প্রফেসর নীলোফার খান।
প্রফেসর নীলোফার খান
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও প্রশাসক প্রফেসর নীলোফার খান প্রায় ৪০ বছর ধরে রাজ্যের ঐতিহাসিক ও প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি প্রথমবার ২০ মে ২০২২ সালে তিন বছরের মেয়াদের জন্য উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দ্বিতীয়বার ১৯ মে ২০২৫ সালে পুনরায় সেই পদে আসীন হন। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। হজরতবালের মনোরম ক্যাম্পাস, ডাল লেক ও জাবারওয়ান পাহাড়ঘেরা পরিবেশে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন তিনি। ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যনির্বাহী উপাচার্য হিসেবেও কাজ করেছেন।
তিনি তাঁর অসাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত। যে কোনও দায়িত্বেই তিনি অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি নেলসন ম্যান্ডেলার একটি উক্তি থেকে অনুপ্রাণিত, “শিক্ষাই বিশ্বের পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র, আর যখন আপনি একজন নারীকে শিক্ষিত করেন, তখন আপনি প্রজন্মকে বদলে দেন।”
“আজ কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শুধুমাত্র প্রশাসনিক কাজ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্বও। এটি আমাদের সমাজের পরিবর্তিত আকাঙ্ক্ষা এবং নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নারীদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির প্রতিফলন,” আওয়াজ-দ্য ভয়েসকে বলেন প্রফেসর নীলোফার খান। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে তাঁর এই পথচলা তরুণীদের এই বিশ্বাস দেবে যে, দৃঢ় মনোভাব ও সহায়ক পরিবেশ থাকলে পারিবারিক জীবন বজায় রেখেও একাডেমিক স্বপ্নপূরণ সম্ভব।
নিজের অনুপ্রেরণার উৎস সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রফেসর খান জানান, তিনি বহু দিক থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন তাঁর সহকর্মীরা, যারা প্রতিষ্ঠানগত উন্নতির জন্য একযোগে কাজ করেছেন, এবং সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছে কাশ্মীরের তরুণ ছাত্রছাত্রীদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা। “তাদের স্বপ্নই আমাকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় কেন শিক্ষাক্ষেত্রে নেতৃত্ব এত গুরুত্বপূর্ণ,” তিনি বলেন।
প্রফেসর খান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রথম দিকের সময়গুলোই তাঁর বৌদ্ধিক ভিত্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাদান ও গবেষণা তাঁর পরিচয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রশাসনিক দায়িত্বও ধীরে ধীরে স্বাভাবিকভাবেই আসে, কারণ “প্রতিটি পদ আমাকে বুঝতে সাহায্য করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে বিকশিত হয় এবং সিদ্ধান্তগুলি কীভাবে ছাত্র ও শিক্ষকদের উপর প্রভাব ফেলে,” বলেন তিনি।
প্রফেসর নীলোফার খান একটি অনুষ্ঠানে
একাডেমিক ক্ষেত্রে নারী হিসেবে বিশেষত কর্মজীবনের শুরুর দিকে যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, “কখনও কখনও নারীদের উচ্চপদে দেখতে অনীহার মতো সূক্ষ্ম বাধা ছিল।” তবে প্রতিরক্ষামূলক ভঙ্গি না নিয়ে তিনি বিশ্বাস করতেন, “কাজই নিজের পরিচয় দিক।” তাঁর মতে, “পেশাগত ধারাবাহিকতা নিজের ও অন্যদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে।”
“পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি পারিবারিক জীবনও সবসময় সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমাদের সমাজে নারীদের কাছ থেকে প্রায়ই আশা করা হয়, তারা যেন দুই দিকই সমান দক্ষতায় সামলান,” বলেন তিনি। একাডেমিক কাজ, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সময় ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী সমর্থনব্যবস্থার গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন প্রফেসর নীলোফার খান। তিনি জানান, সৌভাগ্যবশত তিনি তাঁর পরিবারের পূর্ণ সমর্থন ও বোঝাপড়া পেয়েছেন, যার ফলে কোনও একটি দায়িত্বের ক্ষতি না করেই তিনি অন্যটিতে মনোনিবেশ করতে পেরেছেন।
প্রফেসর নীলোফার খানের গতিশীল নেতৃত্বে কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় একাধিক উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি NAAC-এর A++ স্বীকৃতি লাভ করেছে, যা তাদের একাডেমিক উৎকর্ষ, উদ্ভাবন ও মানোন্নয়নের প্রতিফলন। এছাড়াও NIRF র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি ৩৪তম স্থান অর্জন করেছে এবং দেশের রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে অষ্টম স্থানে রয়েছে। “আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রফেসর নীলোফার খান কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা, বহু-বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা, উদ্ভাবন ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের উৎকর্ষকেন্দ্রে পরিণত করার মিশনে কাজ করছেন,” বলা হয়েছে।
একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়ার মুহূর্তে প্রফেসর নীলোফার খান
প্রফেসর নীলোফার খান দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষাবিদদের সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত। নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সম্মাননাও পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক ভিজিটর প্রোগ্রামের আওতায় তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সফর করেছেন এবং অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, সুদান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ও স্পেনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজও পরিদর্শন করেছেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সিল, সিন্ডিকেট, অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল এবং ইউজিসির মতো জাতীয় সংস্থার সদস্য হিসেবে নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
১৯৮৬ সালে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে তিনি ১৯৯২ সালে সহযোগী অধ্যাপক এবং ২০০১ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। হোম সায়েন্সের অধীনে এক্সটেনশন ও কমিউনিকেশন তাঁর বিশেষায়িত বিষয়। তাঁর একাডেমিক অবদানের মধ্যে রয়েছে পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, উইমেন্স স্টাডিজে এমএ কোর্স চালু, ৩৬ জনেরও বেশি পিএইচডি ও এমফিল গবেষকের তত্ত্বাবধান, পাঁচটি বই রচনা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে শতাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশ। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্রগুলির মধ্যে রয়েছে কমিউনিটি নিউট্রিশন, জেন্ডার স্টাডিজ, জেরিয়াট্রিক হেলথ এবং মানব বিকাশ। এছাড়াও তিনি ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ ও উইমেন্স স্টাডিজ বিভাগের মতো নতুন একাডেমিক ক্ষেত্র গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
হোম সায়েন্সে পিএইচডি ডিগ্রিধারী প্রফেসর নীলোফার খান প্রথমে বিভাগে শিক্ষাবিদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং বিভাগীয় প্রধান হিসেবেও কাজ করেন। পরে তিনি ডিন, কলেজেস ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল; রেজিস্ট্রার; ডিন, ফ্যাকাল্টি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি; ডিরেক্টর, ইনস্টিটিউট অব হোম সায়েন্সেস; ডিন, স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার এবং সেন্টার ফর উইমেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ-এর প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টরসহ একাধিক প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।